সু.খবর ডেস্ক
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ১৮৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। গত বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) প্রতিবেদন-২০২০ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সোমবার সকালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এবার দুই ধাপ এগোলেও ‘আত্মতুষ্টিতে’ না ভুগে উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। সূচকে দুই ধাপ অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, মোটা দাগে আমরা ভালো করেছি, এটা নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ সংশয় নেই। তবে কিছু জায়গায় সেভাবে ভালো করতে পারি নাই, এটা দোষের কিছু না, সেক্ষেত্রে আমাদের উন্নতি করতে হবে। গত বছর এক ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ ছিলো ১৩৫তম স্থানে। এবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৮৫ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩ তম।
এসময় দেশে দারিদ্র্য সৃষ্টির পেছনে কিছু আইন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, এর পেছনে অভ্যন্তরীণ শক্তি রয়েছে। এসব প্রতিরোধ করা চেষ্টা করছে সরকার।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দারিদ্র দূরীকরণ একইসঙ্গে অন্যায় দূরীকরণ করতে হচ্ছে সরকারকে। কারণ, অসাম্য অগ্রহণযোগ্য। এটা মানুষের তৈরি অসাম্য বা বৈষম্য। যা আমাদের দেশে গেড়ে বসে আছে, এজন্য অনেক বড় একটা অংশ দারিদ্রে ভুগছে। মন্ত্রী বলেন, মজার ব্যাপার হলো, এই অন্যায়ের অনুকূলে আইন আছে। আমরা এগুলো সরাতে পারছি না। আমাদের সরকার এগুলো সরাতে চায় কিন্তু কোন এক প্রভাবশালী মহলের কারণে সরকার এটা সরাতে পারছে না। অভ্যন্তরীণ শক্তি আছে, তারা এই অন্যায়ের উপর টিকে আছে। তাদের জন্য এটা তাড়াতাড়ি সরানো যাচ্ছে না। এসব বেআইনিভাবে কিছু নিয়মের কারণে মানুষ দরিদ্র হচ্ছে, বৈষম্য বাড়ছে। এসব সরানোর জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চলবে।
তিনি বলেন, ইউএনডিপি প্রতি বছর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সার্বিকভাবে মোটাদাগে আমরা ভালো করেছি। তবে এটা নিয়ে কিছু মানুষের সংশয় থাকলেও তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। আরও উন্নয়নের খাত রয়েছে। গত ১০-১২ বছর দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী। তার অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। গত ১২ বছরে তার কৌশলে দেশ সোনার বাংলায় পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় সবসময় গুরুত্ব দিচ্ছে।
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান। বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে পাকিস্তান, নেপাল ও আফগানিস্তান। পাকিস্তান এক বছরের ব্যবধানে দুই ধাপ পিছিয়ে ১৫৪তম, নেপাল পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১৪২তম এবং আফগানিস্তান এক ধাপ এগিয়ে ১৬৯তম অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সম্পদের উৎস, বৈষম্য, লৈঙ্গিক সমতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আর্থিকপ্রবাহ, যোগাযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও জনমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে মানব উন্নয়ন সূচক তৈরি করে ইউএনডিপি।
এবারের মানব উন্নয়ন সূচকে আগের বছরের মতো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে নরওয়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে আয়ারল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড। এরপর রয়েছে হংকং, আইসল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক। আর সবার পেছনে আছে গায়ানা, লাইবেরিয়া, গিনি বিসাউ, কঙ্গো ও নাইজার।
ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদিপ্ত মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশে কভিড-১৯ মাহামারিতে এখনও পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও প্রাণহানির পাশাপাশি অতিমারি জনিত সামগ্রিক প্রভাব আরও অনেক বিস্তৃত ও প্রকট। বহু পরিবার জীবিকা হারিয়ে দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে। আয় অসমতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বেড়েছে। লেখাপড়া থেকে দীর্ঘ বিরতির কারণে ছাত্রছাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল নাগাত বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে ১৪.৪ বছর। গড় শিক্ষাকাল বেড়েছে ৩.৪ বছর এবং প্রত্যাশিত শিক্ষাকাল বেড়েছে ছয় বছর। এছাড়া এ সময়ে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় ২২০.১ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমীক্ষাটি প্রকাশের সময় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান আকিম স্টেইনার বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি দেশই পরিবেশেকে ধ্বংস করে মানব উন্নয়নে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। তবে প্রথম প্রজন্ম হিসেবে আমরা এই ভুল সংশোধনে এগিয়ে আসতে পারি। এটিই হওয়া উচিত মানব উন্নয়নের পরবর্তী পদক্ষেপ।
সূচকে অগ্রগতির সঙ্গে বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন মন্তব্য করে ইউএনডিপির জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বালাজ হোবার্থ বলেন, ২০১৯ সালের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বহুমুখী দারিদ্র্যের শিকার (মাল্টিডাইমেনশনাল পুওর)। ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বহুমুখী দারিদ্র্যের দিকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ দেয়া দরকার। তবে দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে এটিও গত কয়েক দশক থেকে অনেক অগ্রগতি।
রিপোর্ট উন্মোচনের পর প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সচিব সামসুল আলাম, আইসিসিএডির জলবায়ু বিজ্ঞানী অধ্যাপক সালিমুল হক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন প্রমুখ।
মানব উন্নয়ন সূচকে একটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাত্রার সামগ্রিক অবস্থা পরিমাপ করা হয়। তবে এবার মানব উন্নয়ন সমীক্ষা প্রবর্তনের ৩০তম বার্ষিকীতে দুটি বিষয় নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা ও মোট ব্যবহৃত সম্পদের পরিমাণ। এছাড়া এবারের রিপোর্টটির শিরোনাম ‘দ্য নেক্সট ফ্রন্টিয়ার: হিউম্যান ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড এনথ্রোপোসিন’।


