‘পরিবেশ ও উন্নয়ন প্রতিপক্ষ নয়। পরিবেশ বজায় রেখেই হাওরের উন্নয়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হাওরের সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। অকাল বন্যায় ফসল হানি হচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।’ উদ্ধৃতাংশটুকু দেশের একজন নীতিনির্ধারকের, আইনপ্রণেতার। তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। আর কথাগুলো তিনি বলেছেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা নামক একটি বেসরকারি সংগঠনের আয়োজনে ছাতকে অনুষ্ঠিত এক সংলাপে । আয়োজকরা এই সংলাপকে ‘তারুণ্যের মুখোমুখি নীতিনির্ধারক’ নামের চমৎকার শব্দবন্ধে আখ্যায়িত করেছেন। কার্যত আমাদের দেশে এখন জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তিরোহিত। এমন অবস্থায় একটি অনুষ্ঠানে একজন আইনপ্রণেতাকে তরুণদের মুখোমুখি করার মধ্যে কিছুটা বিশেষত্ব আছে। এবং চমৎকারভাবে সংসদ সদস্য হাওরের বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন।
আমাদের দেশে কথা আর কাজের মধ্যে ফারাক বিস্তর। আমরা যা বিশ^াস করি তা করি না, আর যা করি তা বিশ^াস করি না। তাই মুখে মুখে পরিবেশ বজায় রেখে জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করে হাওরের উন্নয়নের কথা বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে তার তেমন কোন উপস্থিতির দেখা মিলে না। হাওরের পরিবেশ একটা বিস্তৃত বিষয়। প্রাকৃতিকভাবে এই পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এবং হাওরের এই প্রাকৃতিক পরিবেশ হাওরাঞ্চলের মানুষকে শস্য ও মৎসের প্রাচুর্য দিয়েছে। মানুষ গহীন নির্জন ও প্রত্যন্ত হাওরপাড়ে জনবসতি গড়ে তুলেছিল প্রকৃতির বিপুল সম্ভাবনায় আকৃষ্ট হয়ে। হাওরাঞ্চলের প্রাণ ও প্রকৃতি এক সুতোয় বাঁধা পড়েছিল। আজ এই সুতো ছিন্ন হতে চলেছে। হাওর তার আবহমান কালের রূপ হারাতে বসেছে। উন্নয়নের ঢেউয়ে নিরব হাওর আজ বিপর্যস্ত। হাওরে মাছ নেই, বৃক্ষ-লতা-গুল্ম নেই, পাখি নেই, সরিসৃপ নেই, নেই জীববৈচিত্র। সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে তথাকথিত উন্নয়নের ডামাডোলে। অথচ নীতিবাক্য আমরা বলেই চলেছিÑ পরিবেশ বজায় রেখেই হাওরের উন্নয়ন করতে হবে।
হাওরের যত্রতত্র আমরা শব্দ ও কম্পন উৎপাদনকারী ইঞ্জিন নৌকা অবাধে চলতে দিচ্ছি, ধানের ফলন বাড়ানোর জন্য যথেচ্ছ পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছি, হাওরের বুক চিঁরে সড়ক তৈরি করি, যেখানে সেখানে বাঁধ দিয়ে ফেলি, ঘন বুননের জাল দিয়ে পোনা সমেত মাছ নিধন করি। এসবকিছুর পিছনেই আমরা সাময়িক উন্নয়নের ধ্বনি শুনি। কিন্তু চূড়ান্তভাবে এইসব অবিমৃষ্যকারি কর্মকা- যে হাওরের পরিবেশের কী ভয়াবহ ক্ষতি করে চলেছে তার হিসাব করি না। হাওর হয়ে উঠেছে সর্বগ্রাসী লোভ মেটানোর উপাদান বিশেষ। একে বাঁচিয়ে রাখার চাইতে এর পেট কেটে একসাথে সবগুলো ডিম বের করে নেয়ার সর্বনাশা প্রক্রিয়াই মুখ্য হয়ে উঠেছে বলে আমরা দেখতে পাই। এখন হাওরের দেশে দেশি প্রজাতির মাছের আকাল লেগেছে এ কারণে। অধিক পরিমাণে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অচিরেই আমাদের জমির উৎপাদনশীলতা কমতে থাকবে। হাওরে তথাকথিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার অন্তরালে অকাল বন্যা, জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আত্মবিনাশী ভবিষ্যৎ অপেক্ষমাণ।
এমন অবস্থায় যারা হাওর নিয়ে চিন্তা করেন. এই বিশাল ভূখ–জলাশয়ের উন্নয়নের কথা বলেন; তারা শুধু সমস্যার কথাই বলেন। কিন্তু সমাধানের সঠিক পথ নির্দেশ দেন না। সমাধানের যা পথ নির্দেশ করেন তা ভাসা ভাসা অনেকটা অন্যের শিখানো বুলি আওড়ানোর মত। অনেকে হাওরের নাম করে কিছু ফন্দি ফিকিরের তাল্লাসি করেন। এরকম ফন্দি কবলিত হয়ে টাঙুয়ার হাওর ধ্বংস হতে দেখেছি আমরা। দেশের পুরো হাওরাঞ্চল ঘিরে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা তৈরি করা যায়। এর অসীম সম্ভাবনা থেকে পরিকল্পিত উপায়ে বহু কিছু পাওয়ার পথ রয়েছে। কিন্তু কোথায় এর রূপরেখা? এসবের অনুপস্থিতিতে হাওরের পরিবেশ রক্ষা করার কথা কিংবা এ নিয়ে সংলাপ; সবকিছুই হয়ে যাবে এককথায় অর্থহীন।

