সাদিয়া চৌধুরী পরাগ
তাঁকে কখনো দেখিনি। এমন কী নামটি শুনেছি বলে মনে হয়নি। অথচ, তিনি ছিলেন মেঘে ঢাকা তারার মত নিরলস ও প্রজ্জ্বলিত এক দ্বীপ- প্রদীপশিখা।
কিন্তু এখন দুই বাংলার ভাবুক প্রাণগুলো, অন্তর্দহনে বিদগ্ধ ইচ্ছে…….। সত্যিই উদয়-গিরির আড়াল থেকে উদিত উষ্ণ রশ্মিটি কে তা তো কারো তেমন জানা হয়নি।
তিনি সদ্য প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য্য। পশ্চিমবঙ্গ, ভারতের টিভি চ্যানেল জি বাংলার শীর্ষতম সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম সা.রে.গা.মা.পা.-এ তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষ। বিশেষ করে এই উপমহাদেশীয় গ্রামীণ জনজীবনের অথবা অবহেলিত জনগণের কথা ও সুরের শেকড় সন্ধানী মানুষ। অন্যরকম ভাবে বলা যায়, তিনি সেই সব লোকের প্রতিনিধি হয়ে নিরলস ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নিজেদের ধ্যান ধারণা প্রকাশ করেছেন অত্যন্ত সহজ সরল কথায় ও সুরে। এক্ষেত্রে কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য্য তুলে এনেছেন সনাতনী ও অসনাতনী প্রায় সকলকেই একই সমতলে। বাউল, বৈষ্ণব, সুফি কেউ বাদ যায়নি।
তাঁর সম্পর্কে ধারণা করা যায়, তাঁর জ্ঞান প্রজ্ঞা বোধ বুদ্ধির ভীড়ে ছিল এরাই……যারা বাউল বৈরাগী সুফি পরিচিতির মাধ্যমে সৃষ্টি ও স্রষ্টার যোগাযোগ খুঁজেছেন, আয়ূ কালের প্রতিটি ক্ষণে।
বলা বাহুল্য হয় না, পারস্য কবি রুমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলেছেন, যেদিন বাঁশ থেকে বাঁশীর কর্তন ঘটে, সেদিন থেকে সুরে সুরে বাঁশী কাঁদে। বিচ্ছেদেও রাগ শোনা যায়, মন যারে চায় বন্ধুরে……। ও বন্ধু। প্রাণ যারে চায় …..। খুঁজিয়া খুঁজিয়া তারে জনমও যায়রে…..।
কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য্য বস্তুত: তাঁর সন্ধানী সেই সব মানুষের দলভূক্ত একজন ছিলেন। এবং এ কারণেই তিনি ছুটে গিয়েছেন বাংলাদেশ ও ভারতের সেই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন গ্রাম-গ্রামান্তরে। গিয়েছেন সুনামগঞ্জের উজান ধল গ্রামের ফকির আব্দুল করিমের কাছে। অনুধাবন করতে চেয়েছেন, কি বলতে চায় প্রায় অক্ষর জ্ঞানহীন এই মানুষটি। তাকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। একই সমতলের এইসব আত্মো-উৎস ও সন্ধানীদের মতই একজন। যারা জাত ধর্মের বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে নিজেদের নিরন্তর ব্যস্ত রাখে শেকড়ের টানেÑ কবি রুমির বর্ণিত সেই বাঁশের কাছে মিলনের প্রত্যাশায়। ফকির লালন শাহর কন্ঠে সে জন্য ধ্বনিত হয় মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের মনে…….।
বেশ আশ্চর্য বোধ হয়, এই সন্ধানী মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় হঠাৎ করেই। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ২০০৮ সালে। অথচ তখনও তাঁকে চেনা-জানা হয়নি। ভার্সিটির আমন্ত্রণে সিলেটি নাগরি লিপির উপরে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে হয়েছিল তিন দিনের জন্য। সেই সুবাদে।
আমার অচেনা মানুষ, কালিকা প্রসাদ আমার পাশে বসেছিলেনÑসেমিনারে ক্ষণিক বিরতির প্রাক্কালে অনাড়ম্বর অতি সাধারণ মানুষটির চোখে গাঢ় ও গভীর দৃষ্টি। যেন, নিমিষে তিনি তার শিল্পীসুলভ আচরণ ও অনুসন্ধান দ্বারা অপর মানুষের হৃদয় আবিস্কার করার আলোকিত অভিপ্রায়ে।
সে সময় আমার দিকে চোখাচোখি হতেই বল্লেন, বান্নার খবর কী? বান্নাকে আগের মত দেখা যায় না…….। আমি অবাক হলাম। তিনি কী ভাবে জানতে পারলেন আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি…..? কিন্তু বান্নার সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে……। অন্য কোনও কথা না বলে জানালাম বান্নাকে আমাদের বাংলাদেশের সংগীত মঞ্চে দেখা যায় না। একবার শুনেছিলাম তিনি প্রায় অসুস্থ থাকেন। শোনে কালিকা প্রসাদ বললেন, হ্যাঁ। আামিও সে কথা জেনেছি…….।
তাঁর সাথে অল্পক্ষণ আলাপচারিতার অবকশে আমার একান্ত ভাবনায় তাঁর প্রকৃত ছবি উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। নীরবে পরিচয় মেলে তিনি একজন অকৃত্রিম কণ্ঠশিল্পী এবং শিল্পে নিবেদিত ব্যক্তিত্ব যার কণ্ঠে একদিন শোনা যায়, দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ..কাঁচা সোনা..।
পরে বাংলাদেশে ফিরে এসে তাঁকে খুঁজে পেয়েছি, উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম প্লাটফর্ম জি বাংলার সা.রে.গা.মা.পা-য়। অভিভূত হয়ে দেখেছি, গানের ভূবনে অনেক অসাধ্যকে সাধন করার কার্যক্রম। এবং এ সকল নিরলস কর্মের মাধ্যমে অনুধাবিত হয়েছেন তিনি বাংগাল…….সিলেটি বাংগাল।
রেডক্লিফ মিশনের কূটচক্রে যারা বাড়ি ঘর পূর্ব পুরুষের ভিটে মাটি হারিয়ে আসাম অঞ্চলে আছেন অথবা বঙ্গ ভঙ্গের সময়কাল থেকে এঁরা আসাম বেঙ্গল যাত্রীর পর্যায়ে আছেন।
তাঁকে দেখার পর থেকে আমার আগ্রহ বেড়ে গেলো। আমার ক্লাস ফ্রেন্ড বাগুইহাটির অজিত কুমার সাহার মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ করি। সিলেটের ধামাইল গান ও নাচের ব্যাপারে কিছু করার। অনেক আগে ধামাইল গান নাচ সম্পর্কে আমি অনেক লেখালেখি করেছি। বলতে গেলে বাংলাদেশের সিলেটের বাইরে অনেক সাংস্কৃতিক শিল্পীদের অবগত করিয়েছিলাম। মহামতি রাধারমনের অভূতপূর্ব সৃষ্টি সম্পর্কে, ও জলের ঘাটে গিয়া আমি কি দেখিলাম শ্যামও রায়…..শ্যামরায়Ñ বন্ধু যায় ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া গানও গায় …….।
পরে অনেকবার সা.রে.গা.মা.পা-য় দেখেছি কালিকা প্রসাদ শিলচর, করিমগঞ্জ অঞ্চলের সিলেটি বাংগালদের নিয়ে ধামাইল নাচ-গান তুলে ধরেছেন। শুধু তাই নয়, আব্দুল করিম, লালন ফকির, হাসনরাজা, দূর্ব্বিণ শাহ সহ বাংলাদেশের লেখক শিল্পীদের পরিচয় দানে তাঁর উদার হৃদয়ের প্রসার ঘটিয়েছেন। অনেকটা প্রতিভার আলো বিস্ফূরণের মাধ্যম।
এমন কী, সিলেটের বিয়ের গীতে কিছু কিছু অংশ জুড়ে দিয়ে সুর ছড়িয়ে অন্য গীতে বেঁধে গানটি জনপ্রিয় করেছেন। বলা বাহুল্য সিলেটি বিয়ের গীত বা মেয়েলি সংগীত নামে এই গানগুলো সম্পর্কে একমাত্র আমি দীর্ঘ দিন ‘বেগম’এ লেখালেখি করেছি। সদ্য প্রয়াত বেগম নূরজাহানের আগ্রহে।
অনেক আশা আগ্রহের ইতি দিয়ে কালিকা প্রসাদ হঠাৎ চলে গেলেন। বলতে গেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে। অথচ, তাঁর এই নিরুদ্দেশে যাওয়ার ২/৩ দিন আগে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কক্ষে চলছিল তিনদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সিলেটবাসী মহা সম্মেলন। সে এক অপূর্ব মিলনমেলা। কোলকাতা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, শিলং, শিলচর এ্যমেরিকা, বৃটেনবাসী সিলেটীদের জমজমাট আসর।
সেই মহামিলনে ব্যক্তিগত ভাবে কালিকা প্রসাদের অনুপস্থিতিতে দিয়েছিলাম কিছু উপহার উত্তরীয় পরিচয় পত্র ইত্যাদি। কিন্তু আমার সে উপঢৌকন তাঁর হাতে পৌঁছার পূর্বে তিনি ফিরে গেলেন না ফেরার দেশে………।
এমনও হয় ? মন মানছে না। নাহ ! এদের মৃত্যু নেই…….। মৃত্যুর পরে তার দান বিকশিত হয় চর্চার মাধ্যমে। কবিগুরুর ভাষায়, এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণের পরে তাই তুমি করে গেলে দান।
লেখক: বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তক।


