প্রভাষক চিত্তরঞ্জন তালুকদার।
[০৬/০১/২০১৩ তারিখে ভবিষ্যতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সমীপে উপস্থাপন করতে এলজিইডি ইঞ্জিনিয়ার বিপুল চন্দ্র বণিকের অনুরোধে তাঁর ই-মেইলে প্রেরিত।]
দেশের সাতটি জেলায় কালিদহের লক্ষ বছরের সাগরের চিত্র এখনও নানাভাবে লক্ষণীয়। কালক্রমে জনবসতি গড়ে উঠলেও জীবন প্রণালী ভিন্নতর। নিকট অতীতের চিত্র-উপাত্ত গুলির সাথে তুলনা করলে বেশ কিছু উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু স্থলভাগের জীবন-মানের সাথে হাওরবাসীর জীবন-মানের সামঞ্জস্য বিধান করা যাচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে দূরূহ হয়েই আছে। তবু কিছু কিছু দিকে একটু যতœশীল নজর দিলে অনেকটা জীবনমূখী উন্নতি করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে সৃষ্ট উন্নতিও দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং কোথাও বিশ বছর, কোথাও পঁচিশ বছর স্থায়ী হবে। তারপর আবার নতুন পরিকল্পনা করতে হবে এবং নতুন ভাবে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। তবু পুরো ভাটি এলাকা সমভাবে সমতল ভূমিতে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত বার বারই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও ব্যয় করতে হবে। বর্তমান অবস্থাতেও প্রধান প্রধান যে কাজগুলি সমাধা করতে হবে নিম্নে তা তুলে ধরছিÑÑ
এ এলাকার নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন-মান উন্নত করতে হলেও সমভাবে সর্বস্তরের মানুষের উন্নতি হলেই সকল শ্রেণীর মানুষ কিছু উপকৃত হবে। তাতে জীবন-মান সমভাবে লাভবান না হলেও এ কাজগুলি করতে হবেÑÑযেমন :
নদীখনন : হাওর এলাকার ৫/৬ মাস ভরা বর্ষা থাকলেও বাকি সময় নদীপথে ঘুরিয়ে যাতায়াত করতে হয়। আর ডুবো এলাকায় উঁচু রাস্তা করা সম্ভব নয় বিধায় লঞ্চই ছিল একমাত্র বাহন। গত ত্রিশ বছর আগেও লঞ্চে সুনামগঞ্জ থেকে ধর্মপাশা, মধ্যনগর হয়ে সুমেশ্বরী নদী বেয়ে নেত্রকোণার কলমাকান্দা যেত। অন্য পথে মধ্যনগর হয়ে গোমাই-কংস নদী বেয়ে ঠাকুরাকোণা যেত। এখন শুধু মধ্যনগর নামে আস্তে আস্তে পেছাতে পেছাতে সানবাড়ি পর্যন্ত লঞ্চ যায়। কিন্তু ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সুরমা থেকে বৌলাই বা সুখাইড় নদী বেয়ে একমাত্র স্রোতস্বিনী নদী পাটলীতে পড়ে সুমেশ্বরী হয়ে মধ্যনগর যায়, বাকি ৩/৪ মাস সুখদেবপুর হয়ে সানবাড়ি পর্যন্ত লঞ্চ যেতে পারে। কিন্তু গজারিয়া থেকে সুমেশ্বরীর মুখ সুকদেবপুর-দৌলতপুর ভরাট হয়ে যাওয়ায় বেশিদিন চলতে পারবে না। স্বাধীনতা উত্তর ’৭২/’৭৩ পর্যন্ত তাহিরপুর. দিরাই, শাল্লায় লঞ্চ যাতায়াত করতো তারও আগে জগন্নাথপুরেও হয়তো চলতো। এখন ছাতক, ধর্মপাশা -দৌলতপুর, মধ্যনগর-সানবাড়ি সামান্য রাস্তা ৮/৯ ঘণ্টায় পাড়ি দেয়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কম-বেশি ১০/১৫ বছর আগে এমন হয়েছে ‘না না’ না পা’ অর্থ্যাৎ লঞ্চ-নৌকাও চলে না হাঁটা পথও সৃষ্টি হয় নাই। ফলে কয়েক বছর আগে জগন্নাথপুর, দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর লঞ্চ-নৌকা চলার কোন উপায় না থাকায় দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে মাটি-ভরাট ইত্যাদিতে অনেকগুণ বেশি ব্যয় করে রাস্তা তৈরি হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
বর্তমানে অবস্থা এমন হয়েছে যে সব এলাকায় এখনও রাস্তা তৈরি সম্ভব হচ্ছে না, আরও ১০/১৫ বছর পানি পথেই চলাচল করতে হবে। সে সব এলাকার জন-জীবন সচল রাখতে নদীপথই একমাত্র ভরসা অথবা রাস্তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেও দ্বিতীয় উপায় হিসেবে নদীপথকে সচল রাখতে নদী খনন অত্যাবশ্যক। অবশ্য এসব সংস্কারে অবস্থাপন্নদের বেশি উপকার হলেও সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনেও এ ব্যবস্থা সার্বিকভাবে কাজ করবে, তাই নদী খনন হাওর এলাকার চাষাবাদ, যোগাযোগ, পরিবেশ ইত্যাদির জন্য অপরিহার্য। খননের অত্যাবশ্যকীয় স্থানগুলিÑ ১। গোলকপুর থেকে গজারিয়ার বা সুমেশ্বরীর মুখ পর্যন্ত Ñ৫কি:মি:, ২। সুমেশ্বরীর মুখ থেকে পশ্চিমেÑ৫কি:মি:, ৩। জয়শ্রীর কাছেÑ৩/৪ কি:মি:, ৪। বৌলাই-সুরমার মুখ থেকে পাশুয়া বিলের সামনে পর্যন্ত ১০ কি:মি:, ৫। সুমেশ্বরীতে আবিদনগর থেকে মধ্যনগর পর্যন্ত ৬/৭ কি:মি:, ৬। মধ্যনগর থেকে গোমাই নদীর বনগাঁও- যাত্রাবাড়িতে কংস নদীর মুখ পর্যন্ত ১০/১২কি:মি:, ৭। সুনামগঞ্জের কাছে পুরান সুরমার বা পৈইন্দা নদীর মুখে ৫/৭ কি:মি: খনন করলে পরবর্তী অবস্থা বুঝা যাবে। যতদূর শুনেছি এক নাগারে খনন করতে হয় না, ফাঁক ফাঁক দিয়ে খনন কাজ চলে। তবুও এক নাগারে হিসেব করলে মোট কম-বেশি ৪৫/৫০ কি:মি: নদী খনন, ১৩৪ টি বিল-ডোবা-খাল একটি মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে খনন করে দিলে, জেলার মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, জল-ধারণ ক্ষমতা বাড়বে, আর সোনলী ধান আরও ২০/২৫ বছর নিরাপদে কৃষক ঘরে তুলতে পারবে। অন্য একটি প্রস্তাবে বলা যায়Ñ এই খননকৃত মাটি পরিকল্পিতভাবে ভরাট করলে অনেক অকেজো বিল ভরাট হয়ে প্রচুর ফসলি জমিসহ বিরাট ক’টি বস্তি হতে পারে, যা ভিটাহীন গরিব মানুষকে সাক-সব্জি চাষের সুবিধাসহ পুনর্বাসিত করা যাবে। তবে এজন্য একটি জেলা ভিত্তিক ‘নদী খনন কমিশন’ বা তত্ত্বাবধায়ক টীম থাকতে হবে। যারা সারা শুকনো বা হেমন্ত মৌশুমে হাওরে হাওরে ঘুরে ঢালু এলাকায় বাঁধ তৈরি করিয়ে লম্বা খুঁটি গেরে সীমানা নির্ধারণ করবে, বর্ষায় ড্রেজার এই চিহ্ন দেখে মাটি ফেলবে।
হাওর রক্ষা, ফসলের নিরাপত্তা ও বাঁধ রক্ষা প্রকল্প :
মাছ, পাথর, ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ। এক সময় ছিল শুধুই মাছ, কালক্রমে মানুষ ধান আবাদ করে, সস্তা মাছে-ভাতে মানুষ সুখেই ছিল। অবস্থা এমন হয়েছে হাওরে পানি ঢুকতে দিতেও হয়, আবার ফসল রক্ষার্থে বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতেও হয়। এই উভয় সংকটে হাওরবাসি আস্তে আস্তে দিশেহারা হয়ে গেছে। আজ বাঁধগুলির যে দৈর্ঘ হয়েছে তা আদিতে ছিল না, এখন তো একেবারেই আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে। এ অবস্থায় এলজিইডি বাঁধের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনায় ‘রাবার ড্যাম’ নির্মাণ করে বাকি বাঁধটুকু কান্দা বা আফর স্থায়ী ভাবে ভরাট ও গাছ লাগিয়ে, কোন ত্রি বা চতুর্বাষিক পরিকল্পনায় সম্পন্ন করলে বাঁধের নামে টাকা হরিলুট থেকে দেশ রক্ষা পেত। আর কৃষক হাঁফ ছেড়ে বাঁচত, দেশবাসি উপকৃত হতো। সেইসাথে সুনামগঞ্জের ১৩২ টি বিল, প্রয়োজনীয় খাল, নদীর কিয়দংশ খনন করলে এলাকা আবার অন্তত ১৫ বছর অতীতে চলে যেত। অকাল বন্যায় নদীতে পানি কিন্তু আগের চেয়ে বেশি হয় না। নদী খাল বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ফসলহানি হচ্ছে বেশি, নাব্যতা কমে যাওয়ায় নদী সমপরিমাণ পানিই এখন বহন করতে পারে না। ফলে অকাল বন্যার পানি কোথাও ঠাঁই না পেয়ে পাকা ধানের হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে অবস্থান নেয়।
সারকথা : হাওরের নিচু এলাকাগুলি একদিন পলি পরে পরে উঁচু হবে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর এলাকাও হয়তো ১০০/১৫০ বছর আগে এমনই ছিল, তার প্রমাণ সমতল ক্ষেতের উপর নদীর রেখা বহুদূর পর্যন্ত চেনা যায়। কালে কালে হাওর ভরাট হয়ে সমতল ক্ষেত এবং নদী ভরাট হয়ে রেখা হয়েছে। সুনামগঞ্জের ভাটি এলাকাও এমন হবে, তবে যতদিন জলময় ও দু’টানা অবস্থায় থাকবে ততদিন একটি নির্দিষ্ট সময় পরে পরে জীবনোপযোগী সংস্কার পুন:সংস্কার করতে হবে।
উঁচু-পাকা রাস্তা : সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর রাস্তা সুরমাতে একটি ব্রিজের পরিকলপনায় আছে। যা ২৫/৩০ বছর আগে কল্পনাও করা যেত না। অন্যদিকে ধর্মপাশা থেকে মহেষখলা রাস্তা সুমেশ্বরীতে দু’টি ব্রিজর জন্য এখনও অসম্পূর্ণ। তারপরও এ ডুবো এলাকার মানুষেরা ধর্মপাশা-মোহনগঞ্জ থেকে বাসযোগে চিটাগং এবং দূরবর্তী এলাকায় কাজ করতে যেতে পারে। সুতরাং রাস্তা দু’টি অতিসত্বর সম্পূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাতে সব শ্রেণির মানুষ যার যার কর্মস্থলে পৌঁছতে পারবে, জীবন-মান কিছুটা হলেও উন্নতির আওতায় আসবে। শ্রমজীবী মানুষেরা ছাতক ভোলাগঞ্জে কাজ থাকা সত্বেও জামালগঞ্জ মধ্যনগর ধর্মপাশা মোহনগঞ্জ কলমাকান্দায় যাতায়াত করতে পারে না। কিন্তু ছাতক থেকে গারো পাহাড়ের পাশ দিয়ে কলমাকান্দা পর্যন্ত (৫০ কি;মি;) রাস্তাটি মাটির কাজ হয়ে আছে। এ রাস্তাটি সম্পূর্ণ হলে সুনামগঞ্জ থেকে কলমাকান্দা নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ হয়ে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টায় ঢাকা যাওয়া যাবে। ছাতক থেকে কলমাকান্দা ৫০ কি:মি: বড় রাস্তা হলে জেলার পশ্চিম-উত্তর এলাকা ও সুনামগঞ্জ ছাতক সিলেট ঢাকার যোগাযোগ অনেকটাই সহজতর হবে। অন্য দু’টি রাস্তা গোলকপুর হয়ে মোহনঞ্জ হয়ে ঢাকা। সুনামগঞ্জ থেকে দিরাই শ্যামারচর হয়ে কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ ভৈরব হয়ে ঢাকা। দু’টি রাস্তাতেই ১০/১৫ কি;মি; ব্রিজের দরকার, তা সম্ভব নয় তবে টিভি’তে দেখিয়েছে আফগানিস্তানে খাইবার গিরিপথ থেকে পাহাড়ের ফাঁক বেয়ে ২৫ কি;মি; স্টিলের সেতু হয়েছে দেড়শত বছর আগে। কোন জেলার আর্থিক রাজস্বের দিক বিবেচনা করে সরকার কী করবে তা সংসদীয় সিদ্ধন্তের ব্যাপার তবে সুনামগঞ্জ বছরে ১২০০ শত কোটি টাকা রাজস্ব দেয়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ও খনিজ সম্পদকে সততা ও যতেœর সাথে হিসাবে নিলে রাজস্ব হবে ২৫০০/৩০০০ কোটি টাকা। দেশের অন্য কোন জেলা এত রাজস্ব দিতে পারে কিনা সন্দেহ।
জলমগ্ন বা সাব-মার্জিবল রোড় :
ভাটি এলাকার অবস্থাপন্ন এক ফসলী জমির কৃষক জন-জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও ফসল-হানি, ফসলের আনুপাতিক মূল্য না পাওয়ায় জমি হারিয়ে বর্তমানে বড় গৃহস্থ আছে মাত্র অনুমান এক পঞ্চমাংশ। বাকি সব খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষে পরিণত হয়েছে। অর্থ্যাৎ জেলায় ২৫ লাখ জনসংখ্যা হলে ২০ লাখই দিনমজুর মানুষ, ছাতক-জগন্নাথপুর কিছুটা প্রবাসী প্রবণতা ছাড়া বাকি প্রত্যেক উপজেলায় আনুপাতিক হার প্রায় একই হবে। তুলনামূলক পরিমিত কাজ নেই, কৃষক পরিমিত মজুরি দিতে পারে না বলেই দারিদ্রের হাহাকার চরমে। তবু এখন পর্যন্ত এটাই সত্য কৃষক ভাল থাকলে অন্যেরাও ভাল থাকবে। তাই কৃষকের সুবিধার্থে করণীয় কাজগুলি হলোÑ
বড় রাস্তার পাশাপাশি ভাটি এলাকায় কার্তিক মাসের প্রথম, অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি প্রত্যেক এলাকায় উঁচু কান্দা ভেসে যায়, এবং জ্যৈষ্ঠের প্রথম, মে’র শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ভাসা থাকে। এই উচ্চতায় জলমগ্ন রাস্তা বা সাব-মার্জিবল রোড় করলে নিকটবর্তী এলাকার সাথে পাশের এলাকার যোগাযোগ, ক্ষেতের ধান পরিবহন, বাজারজাতকরণ সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। অনেক ব্যয় কমবে প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের প্রকৃত আয় বাড়বে।
সাব-মার্জিবল রোডের পরিকল্পনা : তাহিরপুর থেকে পশ্চিমে সুলেমানপুর, পাটাবুকা, ভবানিপুর হয়ে একটি রাস্তা বিশারা-আবিদনগর-নগদাপাড়া হয়ে ধর্মপাশা। অন্য একটি রাস্তা নগদাপাড়া থেকে মনাঈ নদীর পাড়ে পাড়ে মজলিশ-সুলেমানপুর হয়ে গোবরিয়াখাল পার হয়ে মধ্যনগর বড় রাস্তায় যোগ হতে পারে। অপর ভাগে ভবানিপুর থেকে রাঙ্গামাটিয়া-কায়েতকান্দা হয়ে মধ্যনগর। অন্যটি লামাগাঁও থেকে শিশুয়া-আটপাডন হয়ে বংশীকুন্ডায় মহিষখলা-মোহনগঞ্জ বড় রাস্তায় যোগ হতে পারে এবং বংশীকুন্ডা থেকে কলমাকান্দা পর্যন্ত যেতে পারে। মধ্যনগর থেকে অন্য দু’টি জলমগ্ন রাস্তার একটি খালিসাকান্দা-কামাউড়া হয়ে বরইকুন্দ-যাত্রাবাড়ি- ঠাকুরাকোনা, অন্যটি মধ্যনগর জমশেরপুর-গলহা হয়ে কলমাকান্দা যেতে পারে। জামালগঞ্জের মন্নান ঘাটের দক্ষিণে গজারিয়ার কাছে সুরমা নদীর পশ্চিমপাড় থেকে রাজাপুরকে পূর্ব-দক্ষিণে বা বামে রেখে ঘুলুয়া-কান্দাপাড়া হয়ে ধর্মপাশা-জয়শ্রী বড় রাস্তায় সংযোগ হতে পারে। জামালগঞ্জের সাচনা বাজার থেকে বেহেলী হয়ে শনি হাওরের মাঝামাঝি দিয়ে তাহিরপুর পর্যন্ত রাস্তা হয়েছে। তদ্রƒপ তাহিরপুর থেকে মাটিয়াইন হাওরের মাঝামাঝি দিয়ে একটি রাস্তা টেকেরঘাট-চারাগাঁও এবং একটি শাখা রাস্তা ডানদিকে জামলাবাজ-টেকাটুকিয়া পর্যন্ত উঠলে ভাটির তিনটি উপজেলা সিংহভাগ মানুষের যাতায়াত ও জীবন-মানের নানা দিক উন্নত হবে। শাল্লা’র মূল রাস্তাটি আরও ১৫/২০ বছর সাব-মার্জিবল থাকাই ভাল, কিন্তু রাস্তাটি খালিয়াজুরির কৃষ্ণপুর হয়ে আটপাড়া উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত করে দিলে সহজে ঢাকা যাওয়া সম্ভব, অন্তত গরিব মানুষেরা কম খরচে চলাফেরা করতে পারতো। তাছাড়া সুনামগঞ্জের খরচার হাওরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে উমেদপুর-রঙ্গিয়ারচর হয়ে সাতগাঁও-সাহাপুর দিয়ে সাচনা-তাহিরপুর সাব-মার্জিবল রাস্তার সঙ্গে যোগ করা যায়। অন্য অংশটি হাওরের মাঝামাঝি থেকে পিরোজপুর হয়ে ‘আবুয়া’র ব্রিজ ক্রস করে চানপুর-ভরতপুরে সাচনার বড় রাস্তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। দেখার হাওরেও জাউয়া থেকে ছাতক একটি ফাড়ি রাস্তা দীর্ঘদিনের চাওয়া। অন্য একটি রাস্তা দোয়ারাবাজারের আমবাড়ি থেকে একটি শাখা জাউয়া-ছাতক রাস্তায় লাগানো যায়, অন্য একটি শাখা বিটগঞ্জ বাজার থেকে ইছাগড়ি হয়ে সুনামগঞ্জের ওয়েজখালিতে সংযুক্ত হতে পারে। দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা থেকে কনস্কাই হাওরের কোণাকোণি নূরপুর-বেটিরগাঁও সুরমা নদীর পাড়ে সংযোগ করলে সুনামগঞ্জ-দোয়ারার রাস্তা হবে এক ঘণ্টার। আলোচিত ও প্রস্তাবিত এমন কিছু সাব-মার্জিবল রাস্তা মূল রাস্তার সঙ্গে সংযোগ করলে হালকা যানবাহন চলাচলে যাত্রী সুবিধাসহ হাওরের ধান পরিবহনসহ সার্বিক জেলার কৃষি-কৃষিজাত পণ্য সরবরাহ ও বাজারজাত করার পথ সুগম হতো। তাতে সর্বমোট ২০০/২৫০কি:মি: জলমগ্ন বা সাব-মার্জিবল রোড় ত্রিবার্ষিক পরিকল্পনায় বর্ষাকালে নৌকায় মাটি কেটে যদি নির্মাণ করা যায় এবং ডিম্বেরের মাঝামাঝি মাটি শুকিয়ে বন গজিয়ে উঠার সময় জলজ গাছ ‘করচ’এর চারা লাগালো হলে এক বছরেই রাস্তা ও হাওরের সবুজ বনানী আবার ফিরে আসবে। ‘হিজল-বিয়াস-করচ’ ভাটির মাটির রক্ষাকবচ, এলাকাতেই চারা পাওয়াও যায় সস্তায়। কিন্তু আমার দেশের নিয়ম হলো উল্টো, মাটি কাটার কাজ শুরু হয় বৃষ্টি নামার আগে আগে, যেন ধূয়ে নিয়ে যায়, আবার যেন সস্তা টাকা উপার্জন করা যায়. উদ্দেশ্যটাই যেন এমন। তাতে শুধু টাকাই অপচয় হয়, অথচ নভেম্বর থেকে মানুষ কর্মহীন দিন কাটায়, এ সময়ে এ গরীব মানুষগুলি একটু মাটিকাটার কাজ পেলেও বেঁচে থাকতে পারে।
গ্রামরক্ষা, গৃহায়ন, পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা :
ভাটির গ্রামগুলি বর্ষাকালে প্রতিনিয়ত ঢেউয়ের ভয়ে তটস্থ থাকে। দেখা গেছে অনেক অবস্থাপন্ন পরিবার প্রটেকশন ওয়াল করে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে। ভাটির গ্রামীণ বাড়িগুলি অন্তত ৬/৭ ফুট উঁচু থাকে, ফলে গরু-বাছুর ও ভারি জিনিসপত্র উঠা-নামা করানো কষ্টকর হয়ে যায়। ভাটির গ্রামে এটা পরীক্ষিত সত্য, ঢেউ শক্তি খাটানোর জায়গা পেলেই শক্তি খাটায়। দেখা গেছে পানির নিচে আল বা জাঙ্গাল ভাঙ্গে না, কিন্তু পানির সমান সমান হলেই ভেঙ্গে ফেলে। তাই প্রটেকশন ওয়াল দিলেও বাড়ি থেকে দূরে পালানে এমন উঁচু করে দিতে হবে যেন চূড়ান্ত পানিতে দু’ফুট নিচে চলে যায়, ওয়ালে মুখে ধাক্কা খেয়ে যাতে ঢেউয়ের কোমন ভেঙ্গে শক্তিটা দুর্বল হয়ে যায়। তাহলে বাড়ির কাছায় ঢেউ শক্তি খাটাতে পারবে না। অন্য একটি পদ্ধতির কথা চিন্তা করা যায়, তা হলো বাড়ি থেকে দূরে পালানে উঁচু আইল তৈরি এবং দু’পাশে জলজ গাছ ‘করচ’ লাগিয়ে দেয়া এবং ঝোপ তৈরি করার ব্যবস্থা করা। অবশ্য ওয়ালের দু’পাশে মাটি দিয়ে ‘করচ’ গাছ লাগানো যেতে পারে, তা ব্যয়বহুল দ্বিতীয পদ্ধতিই সস্তা।
পয়:নিষ্কাশন অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী। কেননা, গ্রামের খোলা পায়খানার কারণে সমস্ত জলময় এলাকা এক সাথে দূষিত হচ্ছে। ফলে রোগ-পীড়া থেকে গ্রামীণ জীবন কিছুতেই মুক্ত থাকতে পারে না। তাই রিং-এর মাধ্যমে স্বল্পব্যয়ে সেনেটারি পায়খানা বসানোর পদ্ধতির ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ পয়:নিষ্কাশন সুচারু করার জন্য প্রত্যেক গ্রামে ১/২টি গরীব পরিবার থেকে কোন লোককে ট্রেনিং দিয়ে রিং, সিমেন্টের পাইপ, কমোট তৈরি করার ব্যবস্থা করলে জীবিকা ও চাহিদা পূরণ হবে।
গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলির পক্ষে বাঁশ কিনে তিন বছরের জন্য একটি ঘর তৈরি করা বর্তমান বাজারে একেবারেই অসম্ভব। গরিব পরিবার গুলিকে ৬/১০ টি সিমেন্টের পিলার দেওয়ার ব্যবস্থা করা একান্ত জরুরী, যদি সম্ভব হয় অচিরেই স্টিলের টিন ছাড়া প্লাস্টিক জাতীয় টিন বা কমদামে অন্যকোন ছাউনির ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে।
জীবিকা/পেশা :
জেলার চার পঞ্চমাংশ শ্রমজীবী দিনমজুর মানুষ নিজ জেলায় কৃষিজমিতে কাজ করতে পারে মাত্র বছরের তিন মাস। বাকি নয় মাস কর্মহীন দিন যাপন করে। ফাজিলপুর বালু টানায় কাছাকাছি গ্রামের মেয়েরা কিছু কাজ করে, উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়ে গাজিপুর-সাভারে গার্মেন্টসের কাজে ইদানিং ব্যাপক হারে যাচ্ছে। এলাকার বাকি পুরুষ লোকেরা অনিশ্চিত কাজের সন্ধানে সিলেটের ভোলগঞ্জে পাথর টানা, চিটাগং যেয়ে ক্ষেতে জমির কাজ করতে পাড়ি জমায়। এসব কর্মজীবী মানুষের জন্য নিজ জেলায় কর্মসংস্থান গড়ে তোলা অতীব জরুরীÑÑ
ক. পানি এলাকার প্রধান সম্পদ। পানিকে কাজে লাগিয়ে যদি কিছু করা যায় তাহলে ভাল হয়। এমন কোন প্রযুক্তি এখনও উদ্ভাবন হচ্ছে না। পানিতে নেটের খাঁচা বা পুকুর সিস্টেমে যদি সরকারি সহযোগিতায় মাছ চাষ করার ব্যবস্থা করা যায় বেশ কিছু পরিবার বাঁচতে পারবে।
খ. পানির দেশে পানির অত্যাচারে বসবাস হুমকী স্বরূপ। বর্ষার অথৈ পানিতে পর্বত প্রমাণ ঢেউয়ের ভয় সারাক্ষণ তটস্থ রাখে, আবার চৈত্র-বৈশাখ মাসে পানির অভাবে একটু গোসলও করা যায় না। দেখা যায় প্রত্যেক গ্রামেই ঢেউয়ের আড়ালে কিছু না কিছু জায়গা আছে। সুতরাং পানির ও উপার্জনের দ্বৈত অভাব মেটাতে যদি এমন করা যায়Ñ একটি গ্রামে পুকুর দেওয়া হবে স্নান-গোসল ধূয়া-পাকলার জন্যে, পুকুরের পাড়ে জলজ গাছ লাগাবে, যতœ করবে, রক্ষা করবে গ্রামবাসি কিন্তু পুকুরে মাছ চাষ করবে, ভাগ করে নেবে গ্রামের ‘বিত্তহীন‘ পরিবারগুলি। তাতে বেশ পরিবার লাভবান হবে।
গ. পারিবারিক খাবার বাঙালির কাছে চিরদিনই প্রিয়। শুকনো খাবারের মধ্যে চিড়া-মুড়ি ছিল গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার। দুই আড়াই দশক ধরে এটাও কারখানার দখলে চলে গেছে। কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি প্রতিটি খাবারে নানা বিপজ্জনক কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। মুড়িতে ইউরিনিয়ামের মত বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করা হয়। এক্ষেত্রে গ্রামে হাতে ভাজা মুড়ি নিরাপদ ও সুস্বাদু অথচ এ মুড়িও মার খাচ্ছে। সরকারি কোন তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে গ্রামীণ গরীব পরিবারগুলিকে উৎসাহিত করা ও বাজারজাত করার ব্যবস্থা করলে অনেক পরিবার এসব কাজ করে উপকৃত হবে। এমন ব্যবস্থায় মুড়ি, মুড়িরমোয়া, চিড়ারমোয়া, তিলেরমোয়া ইত্যাদি তৈরিতে সকল ধরনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ঘ. শহরের কোন কারখানার ক্ষুদ্রাংশ তৈরি ও যোগান দিতে উৎসাহিত ও ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনেকে বলবেন নিরক্ষর মানুষেরা এসব পারবে না। আমি মানতে নারাজ, আমি মনে করি পদ্ধতি করলে ভাল পারবে, পেরে দেখিয়েছে আমার দেশের মূর্খ গার্মেন্টস কর্মীরা। আমার দেশের সহজ সরল বোকা মেয়েদের হাতে যে এত গুণ এত মধু তা বুঝেছে বিদেশীরা। আমরা ক্লাসে যে মেয়েদের শিক্ষিত বানাচ্ছি তাতে এ মেয়ে একটি সহজ সরল অর্ধশিক্ষিত ছেলেকে নাকে ‘নারী নামক রশি’ লাগিয়ে ঘুরানোর যোগ্যতা অর্জন করছে মাত্র, কেননা পদ্ধতিহীন শিক্ষায় শিক্ষিত বলে।
ঙ, অথৈ পানিতে ঘেরা গ্রামের আড়ালে ভাসমান সবজি চাষ এবং বাজারজাতের গ্যারান্টি দিতে পারলে কিছু মানুষ উৎসাহিত হবে। বর্ষাকালে গ্রামের বাড়িতে শসার ভাল উৎপাদন হয় বাজারজাত করার সমস্যায় তা ফলাতে চায় না। তা ছাড়া শীত মৌসুমের সবজি চাষেও উৎসাহিত করা যায় কিন্তু বাজারের কারণে যাতে মার না খায় সেটা দেখতে হবে।
চ, দুধ উৎপাদন গ্রামের চাষিদেরই কাজ ছিল কিন্তু ক্ষণজীবী এ পণ্য যথাযথ বাজার পায় না বলে তা আজ নিরুৎসাহিত হয়ে গেছে। নতুন কোন পদ্ধতির মাধ্যমে তা ফিরিয়ে আনতে পারলে মানুষ উৎসাহিত হবে।
ছ, নেত্রকোণা বিনোদ বিড়ির কারখানায় এক পরিবারের একটি মেয়ে চাকরি করে, বিড়ির মাল-মেটেরিয়্যাল দু’ ড্রাম বাড়ি নিয়ে পরিবারের সকলে বসে তৈরি করে দিনদিনে জমা দিয়ে ৫০০ টাকা আয় করতো। ভারতে দেখেছি এক পরিবারের একটি মেয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি করে ১০০ ব্লাউজ নিয়ে এসে বাড়ির সব মেয়েরা মিলে শুধু হাতের সেলাই সেরে দেবে দিনদিনে পরিবারের আয় ৫০০ টাকা। এনজিও’র ঋণ না দিয়ে ইত্যাকার কোন ব্যবস্থা করা যদি যায় তাহলে গরীব মানুষকে প্রকৃত অর্থেই সাহায্য করা হবে।
জ. গ্রামীণ পয়:নিষ্কাষণ সুচারু করার জন্য প্রত্যেক গ্রামে ১/২ দু’টি গরীব পরিবার থেকে কোন লোককে ট্রেনিং দিয়ে রিং , সিমেন্টের পাইপ, কমোট তৈরি করার ব্যবস্থা করলে জীবিকা ও চাহিদা পূরণ হবে।
ঝ. ভাটি এলাকায় বড় উঁচু রাস্তাগুলির দু’পাশে ভিটাহীন পরিবারের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ করার প্রয়াসে স্বাবলম্বী করে তুলা যায়। তাতে রাস্তাটির সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হবে।
ঞ. গরীব ছোট-খাটো পরিবারকে বিল ডোবায় সরকারি খাস ভূমিতে মৌশুমী পুকুরের মাধ্যমে মাছ চাষে উৎসাহিত করা যায়। যেহেতু মার্চ-এপ্রিলে এলাকায় এবং দেশের যেকোন স্থানে মাছের আকাল থাকে। বর্তমানে উন্নত প্রজননকৃত মাছÑতেলপিয়া, সরপুটি ইত্যাদি তিন মাসেই পরিপূর্ণ মাছ হয়ে যায়, ফলে ভাটি এলাকার ৬ মাস শুকনো মৌসুমেই দু’কিস্তি এ মাছ তুলতে পারবে।
ট. সরকারি খাসজমির বন্দোবস্ত দিয়ে সরকারি ঋণ ইত্যাদির সাহায্যে ৪/৫ জনে একটি সমবায় খামারের মাধ্যমে ধান চাষের ব্যবস্থা করলে অনেক গরীব পরিবার উৎসাহিত হবে। ভূমিহীন মানুষেরা ভূমি পায় ঠিকই কিন্তু চাষাবাদের যে খরচ হয় তা তার দ্বারা সঙ্কুলান সম্ভব হয় না বিধায়ই বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
তবে মাছ বা প্রস্তাবিত যে কোন ফসল ফলিয়ে কৃষক বা উৎপাদনকারি বাজারজাত করণে খুব অসুবিধায় পড়ে। তাই ধনী-গরীব সকলের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি সর্বক্ষেত্রেই অত্যাবশ্যকীয়।
লেখক : রাজনীতিক, শিক্ষক ও চিন্তক।


