সুব্রত দাশ
“কে লইবে মোর কার্য্, কহে সন্ধ্যারবি/ শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।/ মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী,/ আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণিকা কাব্যের কর্তব্য গ্রহণ কবিতার উদ্ধৃত চরণ ক’টি তিনি কখনও পাঠ করেছিলেন কি না জানি না। তবে জানি, তিনি মাটির প্রদীপের মতোই সাধ্যমত নিজ কর্তব্য সাধনে ছিলেন অবিচল। কখনও বিচ্যুত হননি। সাম্যের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন। সেই আদর্শের পথে হেঁটেছেন আজীবন। বিশ্বাসে ছিলেন স্থির, কর্মে নিষ্ঠ। তিনি কমরেড শ্রীকান্ত দাশ (১৯২৪-২০০৯)।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের ঢেউ সাড়া বিশ্বকে আন্দোলিত করে। সেই ঢেউ তৎকালিন ভারতবর্ষেও আছড়ে পড়েছিল। বৈষম্যহীন সাম্যের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন পূরণে লাল পতাকা হাতে এখানেও স্বপ্নবিভোর লক্ষ লক্ষ তরুণ তরুণী সেই কর্মযজ্ঞে সামিল হন। এরই ধারাবাহিকতায় স্বপ্নের পথে হাঁটা অসংখ্য মানুষের একজন শ্রীকান্ত দাশ। একজন অতি সাধারণ কর্মী।
অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা অনেকটা মুখ থুবরে পড়ে। কিন্তু চেতনার কি কখনও মৃত্যু হতে পারে! তা তো হবার নয়! তাই শ্রীকান্ত দাশেরা থেমে থাকেন না। গেয়ে যান তবুও, দিন বদলের গান।
লোক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ হাওরের সন্তান শ্রীকান্ত দাশ। যে মাটিতে জন্ম নিয়েছেন রাধারমন, হাসন রাজা, দূর্বিন শাহ, শাহ আব্দুল করিম এর মত মহাজনেরা। রাজনীতির অঙ্গনে কৃষকবন্ধু করুণাসিন্ধু রায় (যনি স্বেচ্ছায় নিজের জমিদারী প্রজাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিলেন। আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। তিনি বিখ্যাত শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ব আইন শিলং ব্যবস্থাপনা সভায় উপস্থাপন করেছিলেন।), বিপ্লবী রবি দাম (যিনি ১৯৪৯ সালের ২৬ মার্চ পুলিশের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে প্রাণ হারান।), কমরেড বরুণ রায় (পিতা- করুণাসিন্ধু রায়), আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এর মতো রাজনীতিবিদেরা বিখ্যাত হয়ে আছেন। এ মাটিতেই সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আঙ্গারুয়া গ্রামে তাঁর জন্ম।
জন্মের ৮ দিনের মাথায় মা জ্ঞানদায়িনি দাশের মৃত্যু হলে পিতা যোগেন্দ্র কুমার দাশ উপায়ান্তর না দেখে শিশুটিকে মামার বাড়ি নবীগঞ্জের বাল্লা জগন্নাথপুর রেখে লালন-পালনের ব্যবস্থা করেন। সেখানে মাতামহ ও মাতামহীর স্নেহের পরশে তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেন। মামার বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তার গান বাজনা তথা গণসংগীতে হাতেখড়ি হয়। মাতামহ সুরেশ চন্দ্র রায় কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাম্যবাদের পাঠ তিনি সেখানেই লাভ করেন।
শ্রীকান্ত দাশ কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি নিজে কৃষক পরিবারের সন্তান। কৃষক শ্রমিক প্রান্তিক মানুষের দুঃখ কষ্ট তিনি খুব কাছ খেকে দেখেছেন। তাই তিনি তাদের কথা ভেবেছেন,তাদের নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের জীবন- সংগ্রাম সংলগ্ন থেকেছেন জীবনভর।
তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বৃটিশদের শোষণের কথা জনমানুষের কাছে তুলে ধরতে গেয়ে বেরিয়েছেন, “ কাউয়ায় ধান খাইল রে, ডাকাউড়া মানুষ নাই/ কাজের বেলা আছে মানুষ, খাইবার বেলা নাই/ কাউয়ায় ধান খাইল রে …।”
১৯৪৫ সালের ৮-৯ এপ্রিল পাহাড় অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন। সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক প্রতিনিধিরা, প্রখ্যাত কৃষক নেতারা এ সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন পাঞ্জাবের বিখ্যাত বিপ্লবী বাবা কেশর সিং। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ বিপ্লবী সত্যেন সেন তাঁর নিজের কাছে এ সম্মেলনের বিশেষত্বের দিকটি কেমন ছিল তা বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর “বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম” বইয়ে লেখেন,“ এমন সম্মেলন তো বছর বছরই হয়ে থাকে। এই নেত্রকোনার সম্মেলনের বিশেষ গুরুত্ব আর তাৎপর্য কোথায়? যাঁরা এই সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন, তারা এই সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্যটা ভালভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমার নিজের চোখে যে বিশেষত্বটা সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছিল, আমি তার কথাই বলব। তা হচ্ছে এই যে, এই পাহাড় অঞ্চলের শোষিত ও নির্যাতিত সরলপ্রাণ হাজং কৃষকদের অদ্ভুত প্রাণশক্তি, জংগী মনোভাব ও তাদের দৃঢ়-সুশৃংখল সংগঠনের ছবিটা এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আমাদের সবার সামনে উদঘাটিত হয়েছিল। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সারা বাংলা তথা সারা ভারতের কৃষক-কর্মীদের কাছে এই সম্মেলন এক জীবন্ত শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম বলে আমি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি। হ্যাঁ, এমন সূযোগ কমই আসে। যারা সম্মেলনে এসেছিলেন তাঁদের অনেকের মুখেই এই কথাটা শুনেছি।” এই মহতি সম্মেলনে সেদিন শ্রীকান্ত দাশও উপস্থিত ছিলেন। শুধু তাই নয় করুণাসিন্ধু রায়ের মাধ্যমে তিনি সম্মেলনের মঞ্চে আসীন হওয়ার এবং গণসংগীত পরিবেশন করার সূযোগ লাভ করেন। কমরেড মনিসিংহ, সত্যেন সেন সহ অনেকেই তাঁর গানের প্রশংসা করেন।
১৯৬৮ সালের এপ্রিল অথবা মে মাসে সিলেট জেলা গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন হয় শ্রীকান্ত দাশের নিজ গ্রাম আঙ্গারুয়ার জগদীশ চন্দ্র দাশের বাড়িতে। সম্মেলন সফল করতে কমিউনিস্ট পার্টির নিবেদিত কর্মী মহিম দাশ, রামানন্দ দাশ, শ্রীকান্ত দাশ সকলেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। সেদিন সম্মেলনে অনিল মুখার্জি ও বারীণ দত্ত (ছদ্মনাম আব্দুস সালাম) উপস্থিত ছিলেন। দুজনেই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমন্ডলির সদস্য এবং প্রখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক।
১৯৭১ সাল। বাঙ্গালী জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেদিনও শ্রীকান্ত দাশ আপন কর্ম স্থির করতে বিলম্ব করেননি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়, তখন বর্ষা, হাওরে থৈ থৈ পানি। শাল্লা থানা (যেটি ঘুঙ্গিয়ারগাঁও অবস্থিত) অপারেশনের জন্য আগের রাত সালেহ চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দলটি আঙ্গারুয়া গ্রামেই অবস্থান নেয়। ঝড়-বৃষ্টির ঐ রাতে সালেহ চৌধুরী ঘুঙ্গিয়ারগাঁওয়ের একটা মানচিত্র শ্রীকান্ত দাশের সাহায্যে তৈরী করেন। পরদিন ভোরে থানা অপারেশনে তিনিও (শ্রীকান্ত দাশ) তাঁদের সাথে ছিলেন। চারদিকে তখন যুদ্ধের ভয়াবহতা। এলাকায় মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের দিকে ছুটছিল। ধান বিক্রির সমস্যা ও লুটপাটের ভয় ছিল তাদের। শ্রীকান্ত দাশ, ন্যাপ কর্মী রামানন্দ দাস, প্রভাশু চৌধুরী কৃষকদের ধান বিক্রিতে সাহায্য করেন। এলাকায় লুটতরাজ বন্ধেও তাঁরা তৎপর ছিলেন।
স্বাধীনতার পর শ্রীকান্ত দাশ নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য হিসেবে নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজে ছিলেন সমান সক্রিয়।
জাতীয় যেকোন দূর্যোগে শ্রীকান্ত দাশ তার সাধ্যমত সাড়া দিয়েছেন। কবি কুসুমকুমারী দাশ যেমনটা বলেছিলেন, “চেতনা রয়েছে যার, সে কি পড়ে রয়?” আসল কথা হচ্ছে, যার চেতনা রয়েছে সে কখনই পড়ে থাকতে পারে না। শ্রীকান্ত দাশও পারেননি। ১৯৭০ সালের ভয়াল ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের সাহায্যের আবেদন জানিয়ে নিজেই লেখেছেন গান “ ভিক্ষা দাও গো নগরবাসী/দাও গো ভিক্ষা দাও।”
আজ পুঁজিবাদের ভয়াল আগ্রাসনের মধ্যে আমাদের বসবাস। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পুঁজিবাদের উপরই ভর করে চলে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ হচ্ছে গনতান্ত্রিক সমাজ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের পথে মূল বাধা। প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যে মূলত কোন ব্যবধান নেই। মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের চিহ্নিত শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াইটা হতে হবে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দুদিক থেকেই। বিষয়টি শ্রীকান্ত দাশ নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি উদীচী’র সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথেও সম্পৃক্ত করেছিলেন নিজেকে। তিনি উদীচীর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। শাল্লা উপজেলায় তাঁর হাত ধরেই উদীচী যাত্রা শুরু করে এবং তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বিভিন্ন জনের লেখা ও স্মৃতিকথা হতে শ্রীকান্ত দাশের চরিত্রের কিছু দিক সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রজেন্দ্র কুমার দাস “ কমরেড শ্রীকান্ত দাশ তোমাকে লাল সালাম” শীর্ষক লেখায় ভাটি বাংলার কিংবদন্তি নেতা, সর্বজনশ্রদ্ধেয় কমরেড বরুন রায়ের ১৯৭৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে অনেক অনুসারীর তাঁর পাশ হতে সরে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “…এমন দুর্যোগ মুহূর্তেও কোন ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের হিসেব করেননি প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশ। লাল ঝান্ডা হাতে তখনো দুরন্ত সাহসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর আদর্শ কমরেড বরুণ রায়ের পাশে। সেদিনের সেই ভাঙ্গনের মুখে আদর্শ নিয়ে টিকে থাকা কিন্তু সহজ কাজটি নয়। বড়োই কঠিন। সেই কঠিনের সাথে ছিলেন বিপ্লবে বিশ্বাসী শ্রীকান্ত দাশ। সেদিন বরুণ রায় পাশ করবেন কি করবেন না সে প্রশ্ন প্রয়াত শ্রীকান্ত দাশের ধারে কাছে আসতে পারতো না।” বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক , উদীচীর কর্মী মাধব রায় “কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ছিলেন সমাজতন্ত্রের একনিষ্ট কর্মী” শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেন,“…হঠাৎ আসা বন্যার পানি নদীর তীর ছাপিয়ে উঠে এলে যেভাবে তীরে পুঁতে রাখা কোন শক্ত খুঁটি পানির স্রোতে নড়েচড়ে কিন্তু ভেসে যায় না বা উগড়ে স্রোতের টানে ভেসে যেতে পারে না, শ্রীকান্ত-দা তেমনি। কিভাবে কোন মন্ত্রবলে সমাজতন্ত্রটাকে মনের মাঝে গেঁথে নিয়েছিলেন যে এই মতবাদই শোষিত মানুষের মুক্তির সনদ সেই গাঁথা থেকে একচুল বিচ্যুত হননি।…।”- এ থেকে তাঁর নির্লোভ চরিত্র ও চারিত্রিক দৃঢ়তার বিষয়টি আমাদের সামনে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।
যারা গণমানুষের মুক্তির কথা বলেন, বামপন্থি হিসেবে যারা মানুষের আস্থা বিশ্বাস অর্জ্ন করার পর একসময় লোভের টানে বাজারে নিজেকে বিকিয়ে দেন, তাতে বামধারার আন্দোলনের যে ক্ষতি হয় তা কিছুতেই পূরণ হবার নয়।বাংলাদেশে এমন অনেক বর্ণচোরাদের রাজনৈতিক খেল দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে । ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুক্তির আন্দোলন। এমন অবস্থায় আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন শ্রীকান্ত দাশের মত সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীরা।
লেখক : আইনজীবী, সিলেট জজ কোর্ট্; কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, সিলেট জেলা শাখা।
- কমরেড শ্রীকান্ত দাশ : সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার এক আজীবন বিপ্লবী
- করোনায় কোটিপতি বেড়েছে ১৬ শতাংশ, দরিদ্র সোয়া ৩ কোটি


