কমরেড শ্রীকান্ত দাশ : সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার এক আজীবন বিপ্লবী

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল
“কাউয়ায় ধান খাইলরে, খেদানির মানুষ নাই কামের বেলা আছে মানুষ, খাইবার বেলা নাই।” ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি আর স্বাধীন বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রীয় ও গরীবের সম্পদ আত্মসাৎ করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে যাওয়া ও স্বৈরাচার এবং মৌলবাদ বিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে এসব গণসঙ্গীত ছিল প্রতিবাদের ভাষা। আর এসব গণসঙ্গীত নিয়ে বাংলাদেশ তথা পশ্চিমবঙ্গে যাদের বিচরণ ছিল তাদের একজন হলেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। ১৯২৪ সালের ৫ জুলাই বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার প্রত্যন্ত আঙ্গারুয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামী, রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, গণসংগীত শিল্পী, অনেক কালজয়ী গানের রচয়িতা। প্রত্যন্ত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিন আমলেই শ্রীকান্ত দাশের আঙ্গারুয়ার বাড়িটি ছিল রাজনীতিবিদ, কর্মী ও সংগঠকদের জেল জুলুম হুলিয়া থেকে বাচঁতে আত্মগোপনে যাওয়ার নিরাপদ ভূমি। একটি প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জন্ম নিয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে সাম্যবাদী ধ্যান ধারনায় আঁকড়ে ছিলেন আমৃত্যু।
শাল্লার নোয়াগাওয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা পরবর্তী ক্ষত দেখতে ও নির্যাতিতদের প্রতি সংহতি জানাতে ‘দুঃষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’র ব্যানারে গিয়েছিলাম সেই প্রত্যন্ত এলাকায়। ঘটনাস্থলের ৪ কিলোমিটারের মধ্যে আঙ্গারুয়া গ্রামে কমরেড শ্রীকান্ত দাশের জন্মভিটা। তাই আমরা পুরো টিম সেখানে যাই। আঙ্গারুয়া গ্রামের এই ঘরটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের শত শত কমরেডের পদচারণা হয়েছে। কমরেডের জীবদ্দশায় কত শত রাজনীতিবিদ ও কমরেড এ বাড়িটিতে এসেছেন তার গল্প করছিলেন ৮০ বছর বয়স্ক কমরেড শ্রীকান্ত দাশের স্ত্রী ছায়া রাণী দাশ। মৌলভীবাজার সদরের ঘাগটিয়া গ্রামের ধনাঢ্য প্রভাত তালুকদারের কন্যা ছায়া রাণী তালুকদার কমরেডকে বিয়ে করে হয়ে যান ছায়া রাণী দাশ। জানালেন তাঁর জীবনের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা। বিয়ের পর থেকে বেশির ভাগ সময়ই তাঁর স্বামী কমরেডকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। বাড়ীতে থাকতো কমরেডদের আনাগোনা। তাদের জন্য রান্না বান্না। থাকার জায়গার সংস্থান করা। পুলিশি তল্লাশী ও তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জবাব দেয়া। অজানা স্থান থেকে স্বামী কমরেডের চিঠি। ৭ সন্তানকে মানুষ করার জীবন সংগ্রাম। আজ থেকে এক যুগ পূর্বে কমরেডের এ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া। তার মরণোত্তর দেহ ওসমানী মেডিক্যালে দান করা। ৭ সন্তান তথা আল্পনা তালুকদার (৬০ বছর), দুরন্ত দাশ (৫৮ বছর), জল্পনা রাণী সরকার (৫৫বছর), কল্পনা রাণী তালুকদার (৫২ বছর), সুকান্ত দাশ (৫০ বছর), কবিতা রাণী দাশ (৪২ বছর), সুশান্ত দাশ (৪০ বছর) এর বেড়ে ওঠা। এসব নিয়ে আজ ৮০ তে পা রাখছেন কমরেড পতœী ছায়া রাণী দাশ। জীবন সয়াহ্নে অনেক গল্প শুনালেন। ৭ সন্তানের মধ্য কনিষ্ঠ সন্তান সুশান্ত দাশ (অনেকে তাকে প্রশান্ত দাশ নামে জানে) ও আমি লন্ডনে খুবই ক্লোজ ছিলাম। সেই সুবাদে তার মুখ থেকে তার বাবার অনেক গল্প শুনেছি। দেশে ফিরে আসলে প্রশান্ত বার বার আমাকে ফোন দিয়ে বলতো তাঁর মা অর্থাৎ কাকিমাকে দেখে আসতে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় যাওয়া হয়ে উঠেনি। কমরেড শ্রীকান্তের শয়ন কক্ষে তথা যে বিছানায় ঘুমাতেন ঠিক তার পাশেই কার্ল মার্কস ও লেনিনের ছবি সাঁটানো আছে। রয়েছে ডাস ক্যাপিটালও। একটি প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জন্ম নিয়ে এই ব্যক্তি কীভাবে এতোটা দৃঢ়তার সাথে সাম্যবাদী ধ্যান ধারণা আঁকড়ে ছিলেন তা অবিশ্বাস্য। সমাজতন্ত্রের মন্ত্র নিয়ে আজীবন সংগ্রামী প্রবীণ রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা, গণসংগীত শিল্পী কমরেড শ্রীকান্ত দাশকে নিয়ে আলোকপাতের প্রয়াস এ লেখাতে।
কমরেড করুনাসিন্ধু রায়ের (কমরেড বরুণ রায়ের বাবা) হাত ধরে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে আসা শ্রীকান্ত দাশ ১৯৪৩ সালে সুরমা উপত্যাকায় ৮ম কৃষক সম্মেলন, পরে বিভিন্ন এলাকায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গণসংগীত ও পথসভায় নেতৃত্ব দান, ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অল ইন্ডিয়া কৃষক সম্মেলনে যোগদান করেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির পর পাকিস্তান শাসন-শোষণ বিরোধী আন্দোলনে ভাটি অঞ্চল কাঁপিয়েছেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ও তার অনুসারীরা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ আর এর মধ্যবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রামে গণসঙ্গীত নিয়ে; সাম্যবাদের মন্ত্রণা নিয়ে; তরুণ-যুবকদের প্রতিবাদে উদ্দীপ্ত করতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাটি বাংলায় জনমত গড়েছেন। আবার গেরিলা হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের একজন ইস্পাত কঠিন সংগঠক হিসেবে পাকবাহিনীর হিট লিস্টে ছিলেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতে নিজ উদ্যোগে খুলেছেন লঙ্গরখানা। গণসঙ্গীত গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করেছেন। তাঁর গলায় ছিল ঃ
“ভুট্টো দেখরে চাহিয়া,নিক্সন দেখরে চাহিয়া;
বাংলার মানুষ ঘুমে নাইরে উঠছে জাগিয়া।
২৫শে মার্চ রাত্রিকালে ছিল বাঙ্গালীরা ঘুমের ঘোরে,
এমন সময় মিলিটারি দিলায় তোমরা লেলাইয়া।”
স্বাধীনতাত্তোর যুদ্ধবিধ্বস্ত, উপর্যুপরি বন্যা-ঘূর্নিঝড়ে ফসলহানি আর দাদন ও জোতদারদের নিপীড়নের শিকার দারিদ্রপীড়িত ভাটি এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ে কমরেড শ্রীকান্ত ছিলেন নিবেদিত প্রাণ কর্মী, তেজস্বি ও সাহসী। ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারী মেঘালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর কমরেড শ্রীকান্ত দাশের চোখের সামনেই বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে, অনেক কমরেড আদর্শবিচ্যুত হয়ে পুঁজিবাদদের সাথে হাত মিলিয়ে বিশাল অট্টালিকা ও শিল্পপতি হয়েছেন, নতুন নতুন জোটে যোগ দিয়েছেন বা নিজেরাই ফ্রন্ট গড়ে ক্ষমতার আশে-পাশে থেকেছেন, ক্ষমতার অংশীদারও হয়েছেন। কিন্তু কমরেড শ্রীকান্ত দাশ ছিলেন সেই ক্ষমতার রাজনীতিতে ব্যর্থ। তাই তিনি গেয়ে ওঠতেন ঃ
“আজ দিন এসেছে চাষীমজুর দেখরে চাহিয়া
কে তোদের মুখের অন্ন নেয়রে কাড়িয়া
সাম্রাজ্য বাদের পা চাটারা দাঁড়ায়ে তোর দ্বারে
গদীর লোভে পরের হাতে তোদের বিক্রি করে,
আজ কর বিচার, দেওরে শাস্তি, সবে মিলিয়া
যারা ধোকা দিয়ে, ধান নিয়ে ভুখারে করে গুলি,
খাদ্যের দাবী করলে তারা বলে রাজদ্রোহী
আজ মার্কিনে দেশ বিক্রি করে করছে বাহাদুরি।
তারাই মোদের বিভীষণ ভাই লওরে চিনিয়া।।”
অথবা
“চাষাদের, মুটেদের, মজুরের ।।
গরিবের নিঃস্বের ফকিরের
আমার এ দেশ সব মানুষের, সব মানুষের।।
নেই ভেদাভেদ হেথা চাষা আর চামারে,
নেই ভেদাভেদ হেথা কুলি আর কামারে।।
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ।।
দেশ মাতা এক সকলের।
লাঙলের সাথে আজ চাকা ঘোরে এক তালে
এক হয়ে মিশে গেছি আমারা সে যে কোন কালে।।
মন্দির, মসজিদ, গীর্জার আবাহনে।।
বাণী শুনি একই সুরের।”
এভাবে আজীবন পরার্থপরতার রাজনীতি করেছেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ছিলেন। শাল্লার মতো উপজেলায় তাঁর নেতৃত্বে উদীচীর কমিটি হয়েছে। সংগীত, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে চিন্তা-চেতনায় ধারণ করে কাটিয়েছেন প্রত্যন্ত এলাকায়ই। জীবনের পড়ন্ত বিকেলে নিজ জন্মভিটায় গড়ে তুলেছিলেন “শুদ্ধ সংগীত বিদ্যালয়”। ২০০৪ সালের ৬ অক্টোবর সিলেট কোর্টে হলফনামার মাধ্যমে মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেন। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে তাও আবার সিলেটের মতো এলাকায় মরণোত্তর দেহদানের ঘোষণা দুঃসাহসই বটে। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর মৃত্যু হলে তার মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যালে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য দান করা হয়। তিনি হলেন সিলেটের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত সিলেটের কোনো মেডিক্যালে একমাত্র মরণোত্তর দেহদানকারী ব্যক্তি। এভাবে মানব ইতিহাসে কমরেড শ্রীকান্ত দাশ অমর ও অক্ষয়।
কমরেড শ্রীকান্ত দাশ আজীবন বিপ্লবী হয়ে জীবনের জয়গান গেয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তাঁর পাশের গ্রাম নয়াগাওঁয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা যখন ঘটে তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে এই বিবর্ণ বাংলাদেশের জন্য কি জীবনের স্বর্ণালী সময় বিসর্জন দিয়েছিলেন কমরেড শ্রীকান্ত দাশ? আমাদের ঘুনে ধরা সমাজে, ফেসবুক আর সোস্যাল মিডিয়ার নামে দিনে দিনে এক অসামাজিক যুগের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রজন্মকে সমাজ সংশ্লিষ্ট করতে, ভোগবাদী স্বার্থপর চিন্তা-চেতনায় বুদ হয়ে থাকা আমাদের রাষ্ট্রটিকে পরার্থপরতার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে কমরেড শ্রীকান্ত দাশের জীবন ও কর্মে ফিরে যেতে হবে। সেই কাজটির জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাগ্রে। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা ও প্রচার প্রয়োজন। পরার্থপর সমাজ বিনির্মাণে ব্যর্থ হলে প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুউচ্চ শিখরে উঠে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। যা থেকে উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি আমাদের থাকবে কি না তা দৃঢ়ভাবে বলা যাচ্ছে না।
লেখক : ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল, অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]