সুনামগঞ্জ শহরে বেড়ে উঠা বয়স্ক ব্যক্তিরা যদি স্মৃতিকে একটু ঝালিয়ে নিজেদের কৈশোর কিংবা শৈশবে নিয়ে যান তাহলে সকলেই মনে করতে পারবেন, এই শহরে একটি গাড়ি দেখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। সুনসান নিরবতার শান্তির জনপদ ছিলো তখন এই শহর। এরকম বয়সীদের কেউ যদি কৈশোরে শহর ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়ে থাকেন তাহলে তারা এই সময়ে এসে নিজের শহরকে মোটেই চিনতে পারবেন না। শহর দেখে তারা অবাক বিস্ময়ে ভাববেনÑ এই ঘিঞ্জি এই জনাকীর্ণ এই কোলাহলের শহর আমার নয়। একসময় আদর করে সুনামগঞ্জ শহরকে বলা হতো ভিলেজ টাউন। মনের পর্দায় ছবির মতো টানানো সেই আগের শহর আর নেই। এর গায়ে লেগেছে কসমপলিটনের হাওয়া। একজন আরেকজনকে চিনে না। রাস্তায় বের হলে কেউ বলে না, আরে.. তুমি কবে এলে? অনেক শুকিয়ে গেছো দেখছি। অচেনা এই শহরে নিঃশ্বাসে বিষ টেনে হৃদয়ে ভালো না লাগার অতৃপ্তি নিয়ে তবু কত মানুষ দিন কাটিয়ে দিচ্ছে ¯্রফে বেঁচে থাকার একটুখানি ইচ্ছা পূরণের জন্য। একটু নির্মল বাতাসের জন্য এখন ঘর থেকে কেউ বেরোতে চান না। কোথাও প্রান্তর নেই, নেই নিরিবিলি পথের রেখা। বরং রাস্তায় বেরোলেই ফুসফুস ভরে উঠে ধুলোয়, কান ফেটে যায় অসহনীয় শব্দে, প্রতিটি পদক্ষেপ আটকে যায় তীব্র যানজটে।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শহরের অসহনীয় যানজট পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শহরের প্রায় সর্বত্র তৈরি হওয়া যানজটের বর্ণনাসহ এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু বাজার এলাকা নয় পাড়া-মহল্লায়ও তীব্র যানজট। পাড়ার আবাসিক রাস্তা দিয়ে তীব্র গতি ও শব্দে ছুটে চলা মোটরসাইকল কিংবা গা ঘেষাঘেষি করে চলা ইজিবাইক-সিএনজির আগ্রাসনে বাসাবাড়ির মানুষও এখন ঘরবন্দিই থাকেন। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বেরোতে চান না। প্রতিবেদনে শহরের যানজটের যে ক’টি কারণকে সামনে আনা হয়েছে সেগুলোর মধ্যেÑ অপরিসর সড়ক, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা ও সিএনজি চালিত অটোরিক্সার মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য, ট্রাফিক আইন না মানা, রাস্তার যত্রতত্র ব্রেক ধরে যাত্রী উঠানো নামানো, শহরের পাশে অস্থায়ী ও ভাসমান দোকানের ব্যাপকতা, রাস্তার তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক ব্যাটারিচালিত গাড়ির অনুমোদন দান ইত্যাদি অন্যতম। উপরের কারণগুলো তো আছেই। তবে সবচাইতে বড় কারণ আমরা মনে করি, শহরে যে হারে মানুষ বেড়েছে সেই তুলনায় বাড়েনি সড়কের প্রস্ত ও নুতন সড়ক বা বাইপাস। ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা অনুরোধ জানিয়েছেন আর নতুন করে কোনো ব্যাটারিচালিত অটোরিকসার অনুমোদন না দিতে।
সড়কে দাঁড়ালে দেশের উন্নয়ন বুঝা যায়। অন্তত তিন দশক আগের চাইতে এখন যে অনেক বেশি উন্নতি হয়েছে সেটি সহজেই বুঝা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। শহরে মানুষের ভিড় বেড়েছে। তাই বেড়েছে যাত্রীবাহী নানা ধরনের যানবাহনের সংখ্যা। গ্রামে পেশা হারিয়ে দলে দলে শহরে আসছে প্রান্তিক মানুষ। এরা শহরের সড়কে সড়কে বসে পড়ে কিছু একটা পণ্য নিয়ে। এই করে তারা অন্তত জীবন ধারণের নিশ্চয়তা পায়। কিন্তু সড়ক বাড়ার প্রত্যাশিত মাত্রা থেমে আছে। সড়কের মলিন ও রুগ্ন অবস্থাও বেশ চোখে লাগার মতো। এই অবস্থায় উন্নতি আর শান্তি দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। আমরা দুটিই চাই। চাই বলেই প্রত্যাশা করি সহনীয় ও শান্তির শহর-জনপদ বিনির্মাণের। শহরের নির্বাচিত অভিভাবক আছেন, আছেন সড়কে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সরকারি কর্তৃপক্ষ। সকলে মিলে আমাদের একটি শান্তির শহর উপহার দিন। ঠিক আগের মতো ছবির শহর হয়তো হবে না। কিন্তু পথ চলতে নিরাপত্তা আর স্বস্তি চাইতেই তো পারি। তাই দিন।


