চন্দ্রাহত শহরের মানুষেরা ভালো নেই

ইকবাল কাগজী
এক \ সুকান্তের স্বপ্ন
বাংলাদেশের একটি চন্দ্রাহত শহরে আমার বসতি। কিন্তু আমি চকোর নই। চকোর হলে বোধ করি বিপন্নতার অভিপ্ত জীবন নিয়েও প্রতিবেশী মানুষের চেয়ে কিঞ্চিতধিক ভালো থাকতে পারতাম। পুরো মানবিক পরিবেশটা, যে-পরিবেশে আমার যাপিত জীবন সচল আছে, প্রকৃতপ্রস্তাবে সেটা এমনভাবে ভারসাম্যহীন অবস্থায় পর্যবসিত হয়ে পড়েছে যে, মানবপ্রজাতির সদস্য হিসেবে আমি এখন এখানে ভালো নেই। এই প্রসঙ্গটি জানাতে চাই। কিন্তু ‘আপনি কি ভালো আছেন ?’ এবংবিধ প্রশ্নের কোনও উত্তর চাই না, কারও কাছ থেকে।
ব্যতিক্রম বাদে বোধ করি সকলেই কোনও না কোনওভাবে কিংবা কোনও না কোনও কারণে ভালো নেই। সামগ্রিকভাবে সমাজটা ভালো না হলে সমাজের সদস্য- একক ব্যক্তিমানুষ- কোনওভাবেই ভালো থাকতে পারেন না, স্থানকালপাত্র নির্বিশেষে। সকলে মিলে তবেই ভালো থাকতে হয়, যদিও নিরঙ্কুশ ভালো থাকার সে-সামগ্রিকতাটার স্বপ্নটা মানব ইতিহাসে, বোধ করি, স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু শান্তি ও সুখের মানবসৃষ্ট অন্তরায়গুলোকে তো নিরসন করা অবশ্যই সম্ভব। যেমন মানুষ কর্পোরেট বাণিজ্যনীতি ও অর্থনীতির সামরিকায়নকে প্ররিহার করতে পারে। এমনটি করতে পারলে পৃথিবীতে যুদ্ধ থেমে যাবে। কেউ এবংবিধ স্বপ্নপ্রয়াসকে একটা আকাশকুসুম কল্পনা বলে পরিহাস করতেই পারেন, তারপরেও বলি, সেটা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সূর্যোদয় সূর্যাস্তের মতো প্রাকৃতিক কোনও ঘটনা নয়, জাগতিক তো বটেই সামাজিক—রাজনীতিকও বটে এবং অপরিবর্তর্নীয় কীছু নয়। বিশ^রাজনীতির পরিসরে অস্ত্রনিয়ন্ত্রণের ধারণাটি সে—মঙ্গলবার্তাই বিপর্যস্ত, বিপন্ন ও অস্থির পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের মনে এখনও আশার সঞ্চার করে, পৃথিবীতে ভালো থাকার স্বপ্নশিখা মানুষের মনে জাগিয়ে রাখে, যে—স্বপ্নশিখা থেকে জীবনের পথে অভিযাত্রী মানুষ পথ দেখার আঁধারবিনাশী আলো পায়।
মানুষের শরীরের কোথাও কোনও অংশে কোনও অভিঘাতের কারণে ক্ষতের সৃষ্টি হলে অস্তিত্বের সামগ্রিকতা হিসেবে একক মানুষ যেমন ভালো থাকতে পারে না, সমাজের ক্ষেত্রেও তাই হয়। সুতরাং সমাজের একক ব্যক্তিকে ভালো থাকতে হলে সমগ্র সমাজটাকে মানবপ্রজাতির ভালো থাকার জন্যে উপযুক্ত করে নিতে হবে। আমরা জানি, আমাদের কবি সুকান্ত তাঁর উত্তর প্রজন্মের জন্যে সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি প্রাণপণে জঞ্জাল সরিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যাবার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। সুকান্ত বিবৃত এই জঞ্জালই মূর্তনির্দিষ্ট পুঁজিবাদ, আস্ত একটি উৎপাদন ব্যবস্থা, যে—ব্যবস্থায় বুর্জোয়ারা উৎপাদন উপায়ের মালিক এবং শ্রমিকরা কেবল শ্রম শক্তির। পৃথিবীকে সমগ্র মানবপ্রজাতির বাসযোগ্য করতে হলে এই বিশেষ জঞ্জালটিকে উৎখাতের পরামর্শ দিয়েছেন সুকান্ত। পৃথিবীতে শান্তি ও সুখ প্রতিষ্ঠার জন্য সুকান্তের স্বপ্নই এখন বিপন্ন ও অস্থির পৃথিবীর স্বপ্ন। এমন স্বপ্নবান মানুষেরা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে জন্ম নিয়েছেন। এইসব মহামনিষীদের স্বপ্নচারণার পথে পা রেখেই ভবিষ্যতের পৃথিবীকে পথ চলতে হবে। পৃথিবীকে মানবপ্রজাতির জন্যে শান্তি ও সুখ অর্জনের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের মেধা বিকাশের লক্ষ্যে পরিবর্তন করে দিতে হবে। এটা নতুন কোনও কথা নয়। অনেকেই বলেছেন। কিন্তু এমন সুবচন মানুষকে বার বার উচ্চারণ করতে হবে, মানুষের চেতনায় মানবিকতার বিকাশকে পরিপূর্ণ কারার বিজ্ঞানকে পৌঁছে দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কারাচ্ছন্নতার অন্ধকারে আরও আরও আলো ছড়িয়ে দিতে। (চলবে)