একাত্তরের জলছবি- একটি বিব্রতকর এসাইনমেন্ট

গৌরাঙ্গ চন্দ্র দেশী
সেও যুদ্ধ
কিছু গৌরবময় সাফল্যের পাশাপাশি আমাদের অনেক ব্যর্থ মিশনের এটি একটি। তবে একাত্তরের যে সময়টায় দুশমনদের কবলে থাকা এলাকায় আমাদের স্থিতি-চলাচল-ঘুম আর জেগে থাকা সবই ঝুঁকির বিচারে ছিল একার্থক, জীবন যেখানে ছিল মৃত্যুরই সমান্তরাল, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সবটুকু সময়ই আমাদের কাছে ছিল যুদ্ধতুল্য। ক্ষেত্র বিশেষে চলাচলের পথে শত্রুকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারা কিংবা সঙ্গত কারণে মাঝ পথ থেকে ফিরে আসাও ছিল অনেক সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতোই  যুদ্ধময়।
কখনো কখনো ব্যর্থতাও যে সাফল্যের ন্যায় তৃপ্তিদায়ক হতে পারে, তেমন দু-চারটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, যার মধ্যে তিনজন পাক কমান্ডো আমাদের হাতে আটক হওয়ার ঘটনাটি অন্যতম। এটি কোন বড় অপারেশনের কাহিনী নয়, বরং অপারেশন মাঝপথেই  তা পন্ড হওয়ার কাহিনী সেটি। কিন্তু সেও অনপনেয় কালিতে আঁকা আমাদের গৌরবময় একাত্তরেরই জলছবি।
মূল কাহিনীতে যাবার আগে প্রাসঙ্গিক একটা একটা পার্শ্ব কাহিনীর উল্লেখ করি।
যুদ্ধে পাঞ্জাবী সৈন্য কতজন মেরেছেন?
আমাদের এক সহযোদ্ধা কোন এক হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা নিতে গেলে তাকে কথাচ্ছলে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে সরাসরি পাঞ্জাবী সৈন্য কতজন মেরেছেন শুনি। মুক্তিযোদ্ধার প্রচলিত প্রামাণিক দলিলাদি দেখতে চাওয়ার পাশাপাশি এ প্রশ্নটি তাকে অনেক জায়গায়ই অনেকে নাকি প্রায়ই করেন।
বন্ধুটি বুঝাতে চেষ্টা করেন যে একজন মুক্তিযোদ্ধার একাত্তরের সাফল্য নিরুপনের একাধিক মানদন্ড ছিল; সময়ে বিপদকে পাশ কাটিয়ে জীবিত থাকতে পারাটাও  সেসব মানদন্ডের একটি হতে পারে।
কথিত আছে, যুদ্ধে নাকি নিহত শত্রুর চাইতে আহত শত্রুর মূল্য বেশি। পরিস্থিতি বিবেচনায় আবার এক সময়ে শত্রুর চেয়ে তার অস্ত্র বেশি দামি।
পাঞ্জাবী সৈন্যরাই মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র শত্রু ছিলনা। তাই নয় মাসে কতজন পাঞ্জাবী মারা পড়লো, আর কতজন রাজাকার; সারেন্ডার করলো কতজন, সেসব পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ একটি আলাদা বিষয়। সবচাইতে বড় কথা, সে যুদ্ধে আমরা বিজয়ী। আর সে বিজয়ের  প্রত্যক্ষ অংশীদার আমরা সবাই।
আমাদের মত মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বড় অংশই ছিল অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রাথমিক অস্ত্র চালনায় মাত্র এক মাসের গেরিলা ট্রেনিং নেয়া। কারো কারো আবার স্থানীয় ভাবে কেবল পুরানো দিনের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ‘খুলনা-জুড়না আউর ফায়ার করনা’ ধাঁচের ট্রেনিং সম্বল করেই যুদ্ধ শুরু, যাদের যুদ্ধ কৌশলের মূল মন্ত্রই ছিল, হিট এন্ড রান। অথচ পূর্ব-সংকেত বিহীন দৃশ্যমান আর অদৃশ্য আচম্বিত আঘাতে আঘাতে আর বহুমুখী তৎপরতায় সেই সব বিচ্ছুরা পাক-বাহিনী ও তাদের দোসরদের কি নাকানি-চুবানীটাই যে খাইয়েছে তার সামষ্টিক পরিমাপ কেবল পাঞ্জাবী মারার একটিমাত্র মানদন্ডের সূচকে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
গেরিলাদের চলাচলের মুখ্য রাস্তা
৮ জুলাই থেকে সক্রিয় সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার নিজের একাত্তর শুরু।   
তখন সড়ক পথে মৈলাম-চিনাকান্দি হয়ে কখনো বিশ্বম্ভরপুরকে ডানে, কখনো বায়ে রেখে নৌকাযোগে যে যেদিকে যাবার, সেদিকে যাবার জন্য যে রুটটি আমরা ব্যবহার করি, কালক্রমে সেটা গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা চলাচলের প্রধান রুটে পরিণত হয়। চিনাকান্দি স্থানটা আগে থেকেই সুবিখ্যাত; যুদ্ধ শুরুর আগের দিকে স্থানটা ইপিআরের গনি সুবেদারের (মানুষ গণি হাওয়ালদার বলতো) নামের সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। এ চিনাকান্দি তখন শেলা থেকে নারাইনতলা-নলুয়া-বইসারপার-বাগমারা-কানলার হাওর-গুজাবিল-ইসলামপুর-সৈয়দপুর ইত্যাদি নানা নামের স্পট ছুঁয়ে সীমান্ত বরাবর প্রসারিত প্রায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা বলয়ের প্রান্তিক অবস্থান।
এর আগে সাব-সেক্টরের নিজ নিজ কোম্পানির/গ্রুপের প্রতিরোধ যুদ্ধের বাইরে গেরিলা কার্যক্রমে লস্কর (যুদ্ধাহত), রবীন্দ্র দাশ (১), শামসুল হক (যুদ্ধাহত) প্রমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ দেশের ভেতরে যেতে উত্তর সীমান্তের ডান ও বাম উভয় দিকই ব্যবহার করেছেন। ক্রমে সেসব রুট বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। ঝুঁকি উপেক্ষা করে এর পরও নারায়নতলার আশ-পাশের মুক্তিযোদ্ধা অবস্থানগুলো থেকে বেশ কয়েকটি গেরিলা অপারেশন চালানো হয়।
বালাটের এফ এফ গোয়েন্দা তথ্য 1q
অসম সাহসী কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা নিজামউদ্দীন লস্কর (যুদ্ধাহত) তো পাক আর্মি পজিশনের খুঁটিনাটি সার্ভে করতে চরম ঝুঁকি নিয়ে দু-দুবার নিজেই সুনামগঞ্জে চলে গিয়েছিলেন। একবারতো বৈঠাখালি হয়ে সুনামগঞ্জ যেতে একেবারে রেগুলার চেকপোস্টে পাক মিলিশিয়া গার্ডের জেরার সম্মুখীনও হতে হয়েছিল তাঁকে। এসএসসি পরীক্ষার্থীর ছদ্ম পরিচয়ে পাকিস্তান লাইব্রেরি থেকে ওজিফা এবং ইসলামিয়া ট্রেডিং থেকে ক্যাশ মেমো সহ একটি উইংসাং কলম কিনেই লস্কর তাঁর মিশন শেষ করেননি, সুদক্ষ পেশাদার গোয়েন্দার মত যাবতীয় ইপ্সিত তথ্যাদি সুনিপুণ ভাবে সংগ্রহ করেই তবে ফিরেছিলেন।
অন্যন্য সাবসেক্টরের কথা জানি না, বালাট সাবসেক্টরে কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি একটা আলাদা মুক্তিযোদ্ধা গোয়েন্দা শাখা চালু হয়। কিশোরগঞ্জের এডভোকেট আব্দুল আউয়ালের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ গোয়েন্দা ট্রেনিং নিয়ে বালাট নামে। আমাকে গ্রুপটির লিডার আর এডভোকেট আব্দুল আউয়ালকে ডেপুটি লিডার করে দলটিকে আমার কোম্পানীতে একীভূত করা হয়। গ্রুপটির সদস্যবৃন্দ আলাদা আলাদা ভাবে দেশের ভেতরে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি সংগ্রহ করতো।
তিন কমান্ডো আটক
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি বড় বড় নৌকা ভর্তি মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কয়েকটি কাজে সাবসেক্টরের ভেতরে যেতে আমরা চিনাকান্দি হয়ে বিশ্বম্ভরপুর বাজারের অদূরে সমবেত হই। অনেকের সাথে প্রীতেশ (চরনারচর), হাজী ছানু মিয়া (জিনারপুর), মানিকলাল দাস (জগন্নাথপুর), সুধীর সূত্রধর (চরনারচর) প্রমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধারা সে দলে ছিলেন।
এর মধ্যে গোপন সূত্রে আমার কাছে একটি খবর আসে। খবরটি এই যে বালাটের রিজার্ভ থেকে আমাদের দলে অন্তর্ভূক্ত করে দেয়া তিনজন নবাগত মুক্তিযোদ্ধার আচরণ সন্দেহজনক; পথ চলতি তাদের ফিসফিসানি কথাবার্তা থেকে অনুমান হয় যে তাদের ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য আছে।
সংবাদটি খুব চিন্তার মনে হল আমার কাছে। কিন্তু বাহ্যিক ভাবে খুব স্বাভবিক রইলাম।
এ মুক্তিযোদ্ধারা রিজার্ভ ক্যাম্প থেকে আমাদের পূনর্গঠিত গ্রুপে যুক্ত হবার সময় আমরা প্রাথমিক ভাবে জেনেছিলাম যে তারা অন্য সেক্টর থেকে আসা এমএফ মুক্তিযোদ্ধা। তখন বালাট ক্যাম্প ও রিজার্ভ কোম্পানী গুলোর প্রশাসনিক শীর্ষ দায়িত্ব ভারতীয় মেজর ডব্লিউ বি ডিস্যুজার; তাই ঐ তিনজনের ব্যাপারে আমাদের বেশি কিছু জানার ছিল না।
বিশ্বম্ভরপুরের তরুণ দুজন ছাত্র নেতা (একজনের নাম মুজিব, বড় বাড়ির ছেলে) আমাদের অত লোকের খাবারের আয়োজন করেছিল; তখন এরা সব সময় আমাদের এভাবে সাহায্য-সহায়তা করতো। সেদিন আয়োজন ছিল শুটকির অতি সুস্বাদু পাতলা ঝোল ও আতপ চালের ভাত। নৌকাতেই খেতে বসলো সবাই। সামান্য ছৈ-ওয়ালা বড় বড় নৌকা। আমি বসলাম সেটিতে, যেটিতে একটি এলএমজি ও সেই তিন নবাগত মুক্তিযোদ্ধা ছিল। সবাইকে খেতে বসালাম, পাল-গোড়ার কাছে উপবিষ্ট এলএমজিওয়ালাকেও। আমি যুদ্ধের দিনগুলোতে সবার শেষেই খেতাম, সেবারও তাই করলাম।
খাওয়া-দাওযা যখন মাঝ পর্যায়ে, তখন তামাসাচ্ছলে এলএমজির ট্রিগার আঙ্গুলে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে নৌকার সামনের দিকে মুখ করা এলএমজির ব্যারেল ১৮০ডিগ্রি ঘুরিয়ে ফেলি। এর পর সহাস্য তামাশার ছলেই সবাইকে পেছনে ঘুরিয়ে নানা নাটকীয়তার পর তিনজনের একজনের কাছ থেকে একটি গুলি ভর্তি অত্যাধুনিক পিস্তল উদ্ধার করতে সক্ষম হই। তারা নিজেরাই ম্বীকার করে যে, তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া তিনজন দল ছুট পাক কমান্ডো, ময়মনসিংহ জেলায় বাড়ি, আমাদের সঙ্গে দেশের ভেতরে যেতে পারলে সুযোগ বুঝে নিজ এলাকায় চলে যেত তারা,  কোন খারাপ উদ্দেশ্য তাদের ছিল না।
আমাদের মূল পরিকল্পনা ত্যাগ করে এ তিনজনকে অঘোষিত অস্ত্র রাখার দায়ে গ্রেফতার করে বালাট নিয়ে গিয়ে ইনস্পেকশান বাংলোতে মেজর ডিস্যুজার কাছে হস্তান্তর করি। মেজর ধন্যবাদ জানিয়ে আমাকে আইবি থেকে বিদায় দিলেন।
এ ঘটনাটা তখন যেমন আমাদের কাছে খুবই রহস্যময় ঠেকেছিল, আজো আমার কাছে তেমনি রহস্যজনক রয়ে গেছে। বিশেষ করে আটককৃতদের নিরুদ্বেগ নির্লিপ্ততা এবং মেজর ডিস্যুজার একেবারেই নির্বিকার ভাব আমাদের বিস্মিতই করে।
সে তিন মুক্তিযোদ্ধাকে এর পর রিজার্ভ ক্যাম্পে বা কোন গ্রুপ বা কোম্পানীতে দেখা যায়নি।