একাত্তরের নায়কেরা-শুকুর আলী

কুমার সৌরভ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এক পর্যায়ে ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা পঞ্চাশ জনে উন্নীত হয়ে পড়ে।
টেংরাটিলা ছিল পাক বাহিনির শক্ত অবস্থান। কাঠালবাড়ি থেকে দলটি টেংরাটিলা পর্যন্ত এসে পাক আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে মাঝে মধ্যে হিট এন্ড রান পদ্ধতিতে কিছু অপারেশন পরিচালনা করতে লাগল।
আষাঢ় মাসেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ব্যাচ আসল কাঠালবাড়ি। ওই ব্যাচের কমান্ডার ছিলেন সাধন ভদ্র। আবু সুফিয়ান, উজির মিয়া, হিরন্ময় কর, ঝন্টু ভদ্র, হায়দর আলী, এরশাদ প্রমুখ ওই দলে ছিলেন। (অবশ্য সাধন ভদ্রের সাথে আলোচনা কালে তাঁর কাঠালবাড়ি আসার তথ্য জানতে পারি নি। এটি একটি ঘাটতিও হতে পারে।-লেখক)  ইতোমধ্যে ক্যাপ্টেন হেলাল সেলা সাব সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি শহীদ চৌধুরীকে কোম্পানি কমান্ডার নিয়োজিত করলেন।
কাঠালবাড়ি থেকে শুকুর আলীকে প্লাটুন কমান্ডর মাইনুদ্দীনের অধীনে পাঠিয়ে দেয়া হয় টিলাগাঁও। টিলাগাঁওয়ের সুলতানের বাড়িতে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ১ নম্বর ডিফেন্স বাংকার। ২ নম্বর ডিফেন্স ছিল গ্রামের তামসা ডাকাতের বাড়ির পূর্ব দিকে। শুকুর আলী এক নম্বর ডিফেন্সে পোস্টেড হলেন। টিলাগাঁও মুক্তিযোদ্ধা অবস্থানের লঙ্গর  (খাওয়ার জায়গা) ছিল মহব্বতপুর। পরবর্তীতে টিলাগাঁওয়ে আরও মুক্তিযোদ্ধা আসতে থাকেন।
শুকুর আলী যেসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সেগুলো হলো মহব্বতপুর যুদ্ধ, বেতুরা নৈনগাঁও যুদ্ধ, ডাবর যুদ্ধ, জাওয়া বাজার যুদ্ধ, ঝাওয়া সড়ক সেতু ডেমোনিশন দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মিশন, জালালপুরে রাজাকারবাহিনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সর্বশেষ ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বড় যুদ্ধ। যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনায় গেলাম না ইচ্ছা করেই। কারণ এতে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে।
শুকুর আলী স্মৃতিচারণ করছিলেন। ৬ ডিসেম্বর টেংরাটিলা পাক বাহিনির অবস্থানে আমরা প্রবল আক্রমণ করি। পাক বাহিনি পিছু হঠা শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ধাওয়া করতে করতে একেবারে গোবিন্দগঞ্জ নিয়ে আসে। গোবিন্দগঞ্জে পাক বাহিনির সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্ড় আকারের যুদ্ধ হয়। ওখানেই আমার শরীরে স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। ডান হাতের কবজির উপরে এবং বাম পায়ের হাঁটুর নীচে। আমি অচেতন হয়ে যাই। মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে সিলেট চৌহাট্টা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। ১০ দিন চিকিৎসা নেয়ার পর সুস্থ হই। ততদিনে আমাদের কাক্সিক্ষত বিজয় এসে গেছে। বাড়ি চলে আসলাম। স্মৃতিচারণ শেষে শুকুর আলী শরীরে বিদ্ধ স্পিøন্টারের স্থানগুলো দেখালেন। ৪৫ বছরের আগের দাগ এখনও স্পষ্ট। এই দাগ হলো স্বাধীনতার চিহ্ন। এই চিহ্ন প্রমাণ দেয় শুকুর আলী এক মহান যোদ্ধা। এই চিহ্ন তাই তাঁর অহংকার।
শুকুর আলীর যুদ্ধ স্মৃতি শেষের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম, কোন ঘটনা এখনও তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তিনি বললেন মহব্বতপুর যুদ্ধের কথা। ভয়ানক ওই যুদ্ধে ৯ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। এরমধ্যে প্লাটুন কমান্ডার মাইনুদ্দীনের মৃত্যু হয়েছিলো তার চোখের সামনেই। দোয়ারাবাজারের পেকপাড়ার নূর মোহাম্মদের মৃত্যুও হয়েছিলো ওই যুদ্ধে। শুকুর আলী বলছিলেন, মাইনুদ্দীনের বাড়ি ছিল দোয়ারার মোল্লাপাড়া। যুদ্ধের সময় কয়েকবার মাইনুদ্দীনের সাথে তাদের বাড়ি গিয়েছেন শুকুর আলী। মাইনুদ্দীনের মা পরম মমতায় তাদের খাইয়ে দিয়েছেন প্রতিবারই। মাইনুদ্দীনের কথা মনে হলেই তাঁর মন বিষন্ন হয়ে উঠে এখনও।
আলোচনার শেষ সময়ে বিষাদ গ্রাস করলো আমাদের সবাইকে। এক সুবিশাল বিষাদসিন্ধুই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে অগণন মাইনুদ্দীন নূর মোহাম্মদরা জীবন দিয়েছেন। ভাগ্যগুণে ফিরে এসেছেন শুকুর আলীরা। এরকম সাহসের সময় একটি জাতির জীবনে আসে হাজার বছরে একবার। একাত্তরের ওই আকাশসমান সাহস যে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল সেটি কি ত্রিশ লক্ষ শহীদের স্বপ্নের রূপায়ণ করতে পেরেছে এই প্রশ্ন, এখনও কুড়ে কুড়ে খায় শুকুর আলীকে। তাঁর মতো সকলকেই। তিনি যখন দেখেন, স্বাধীন দেশে দুর্নীতির মৃগয়াক্ষেত্র, তিনি যখন স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালন দেখেন , এখনও দুর্বলের উপর সবলের পীড়ন দেখেন তখন নিশ্চয়ই চিৎকার করে না হোক অন্তত মনে মনে বলে উঠেন- এ আমরা চাই নি।
তবুও তৃপ্ত তিনি। অন্তত বুক উঁচু করে বলতে পারছেন, হাজার বছরের পরাধীনতার শিকল ভেঙেছি আমরা। শিকল ভাঙার ওই সুবিশাল প্রয়াসে আমারও ছিলো ছোট্ট একবিন্দু অবদান। তাঁর এই তৃপ্তির রেশটুকু প্রবহমান থাকুক চিরকাল এই কামনা করে শেষ করি আমাদের যুদ্ধপ্রসঙ্গ আলোচনা।