জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আম্মার বড় ফুফুর বাড়ী। ওখানে আশ্রয় নিয়েছেন আম্মার ছোট চাচা মকব্বির আলীর বৌ সন্তানেরা। উনি নাকি কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলেন খোঁজ নাই। ওখানে গিয়েই জানতে পারি গতকাল সুনামগঞ্জে পাক আর্মি ঢুকে গেছে। কারফিউ জারী করেছে। বড় মামা তাদের হাতে পড়েছিলেন, মরতে মরতে বেঁচে এসেছেন।
আমার বড় মামা বদিউর রহমান হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজের প্রফেসার। ছিলেন হবিগঞ্জে। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি বাড়ীর চিন্তায় অস্থির হয়ে যান। উনার ছোট ফুফুর বাড়ী বানিয়চঙে। ছিলেন সিলেটে। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আব্দুল খালিক খানের স্ত্রী। উনার কোন সন্তানাদি না থাকায় আমার আম্মা ও বড় মামাকে লালন পালন করেছেন। নিজ স্বামীকে নিজে বিবাহ করিয়েছেন। উনার সতীনের চার জন ছেলেমেয়ে। বাপের বাড়ীতে প্রচুর সম্পাত্তি পেয়েছেন। স্বামীর ব্যবসা পুরোপুরি ধ্বস নামলে সদ্য বানিয়াচঙের মূলবাড়ীতে গেছেন। ওখানে কিন্তু উনার মন বসছিলো না। উনি বড় মামাকে হবিগঞ্জে খবর পাঠান, যেভাবেই হোক উনাকে সুনামগঞ্জে নিয়ে যেতে। উনার মা জীবিত। ভাইরা আছে। সর্বোপরি আমার মায়ের জন্য উনার জান। তিনি এই যুদ্ধেও সময় নিজের লোকের কাছে আসতে চান। মামার নিজেরও প্রাণ আকুলী বিকুলী করছিলো। তাই বহু কষ্টে নদী পথে সুনামগঞ্জ এসে দেখেন সুনামগঞ্জ খালি। বাড়ীতে শুধু মতিউর মামার মা আর বাবা। মধ্যবাজারে নিজেদের দোকানে গিয়ে দেখেন সারা বাজার বিরান ভূমি। বাড়ী এসে তিনি আব্বা আর সিতারার শহীদ হওয়ার খবর পান। নানুবু মানে আম্মার ছোট ফুফু ভেঙ্গে পড়েন। উনাকে লোক দিয়ে উনার বড় বোনের বাড়ী রামনগড়ে পাঠিয়ে দেন। আমরা কোথায় আছি খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেন। দিন দুই পর হয়তো স্মৃতি কাতর হয়ে মতিউর মামার মায়ের কাছ থেকে আমাদের বাসার চাবি নিয়ে বাসায় গিয়েছিলেন। আব্বার প্রিয় লাল রঙের রেডিও দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। কারণ সারাক্ষণ আব্বা এই ট্রানজিস্টার চালাতেন খবর সংগ্রহের জন্য। রেডিওটি নিয়ে সেলিম মামা (মতিউর মামার ছোট ভাই) কে নিয়ে মাত্র বারী মঞ্জিল পার হচ্ছেন দেখেন, এক ট্রাক আর্মির গাড়ী ব্রেক কষে। আর উনাকে হল্ট বলে থামায়। তিনি জানেন সুনামগঞ্জে এখনও পাঞ্জাবী আসে নাই এ জন্য বেরিয়েছেন। পাঞ্জাবী দেখে তিনি বুঝতে পারেন এরা সদ্য এসেছে আর তাকে হত্যা করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করবে। তিনি হাত তুলে দাঁড়ান। তারা তাকেও সেলিম মামাকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অস্ত্র তাক করে। তার নাকি তখন সিনেমার ছবির মতো আমাদের ভাই বোনদের মুখ চোখে ভাসছিলো আর আল্লাহ কেবল ছিলেন এদের বাপ চলে গেছে আজ আমি গেলে কে ওদের দেখবে। এই এতিমদের জন্য আল্লাহ আমায় বাঁচাও। সেলিম মামা কান্নাকাটি করায় উনাকে সরে যেতে বলে। কিন্তু না তিনি নাকি আমার ভাইজানকে মেরো না বলে সামনে গিয়ে দাঁড়ান। অন্য এক আর্মি এসে যে গুলি করতে যাচ্ছিলো তাকে থামায়। আর বড় মামাদের যেতে বলে। জান বাঁচিয়ে তিনি আজই নদী পথে রামনগড়ে পৌঁছেছেন। আমরা অবাক হয়ে শুনি। যে পাক আর্মির ভয়ে আমরা সুনামগঞ্জ ছেড়েছিলাম তারা আসলো এখন। আর এরমধ্যে কতো কিছু হয়ে গেলো। আজ গুলির মুখ থেকে বড় মামাকে ছেড়েও দিলো। আমাদের বাবা বোনকে হানাদাররা ছাড়লো না। বিনা দোষে হত্যা করলো! পাক আর্মি নৃশংস হত্যা যজ্ঞ চালিয়েছে যেমন তেমন তাদের মাঝেও কেউ কেউ ভালোছিলো। কিন্তু বাঙালিই পিআর! ছোট মেয়েটাকেও টার্গেট করে গুলি চালালো। সিতারা বড় মামার সবচেয়ে আদরের ছিলো। ওর রং গোলাপী ছিলো। বলতো সে নাকি আম্মার পেট থেকে বেরুয় নাই, বড়মার পেট থেকে বেরিয়েছে। আমাদের বড় মামানানা ভাইর মা গোলাপী রংয়ের ছিলেন। সিতারাকে বেশী ভালোবাসতেন। বলতেন আমার মেয়ে। বড় মামা হাঁটেন আর এক সময় একেক স্মৃতি বলে উঠেন। আমরা শুধু দু’চোখ মেলে দেখি। কেউ কেউ এসে আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এসো তো মা এতিমের মাথায় হাত বুলালে সওয়াব আছে। কারা তারা চিনি না। শুধু বুঝতে পারি এই যুদ্ধ আমাদের এতিম করে দিয়েছে।
সারা রামনগড় ভেঙ্গে মহিলারা আম্মাকে দেখতে আসে। কতজনে কত কথা বলে আমরা নিরব দর্শক হয়ে শুধু দেখি। বুকে জমে থাকা কান্না আর হাহাকার। কাউকে শেয়ার করার মতো অবস্থায় থাকি না। আম্মা পাথরের মূর্তির মতো বসেই থাকেন, বসেই থাকেন। আর আমরা মুরগীর বাচ্চার মতো তার কাছে বসে থাকি। বড় মামাও আম্মার কাছ ছাড়া হন না। নানুবু আম্মার ছোট ফুফু আমাদের থাকা খাওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নেন। নানা ভাই চারিদিকে খোঁজ লাগান কে কোথায় আছে জানার। সুনামগঞ্জ থেকে খবর আসে পাক আর্মি সব নেতাদের বাড়ী তাল্লাশী চালাচ্ছে উনার দোকান লুট হয়ে গেছে। আলফাত মোক্তার সাহেব, হোসেন বক্ত সাহেব, আফাজ উদ্দীনের বাড়ী পুড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের বাসা লুট হয়ে গেছে এবং অনেকে পাক আর্মির সাথে হাত মিলাচ্ছে। ৪/৫ দিন পর আমাদের ছোট নানা ডা: মকব্বির আলী রামনগড়ে এসে পৌঁছান। তিনি নাকি তার শ^শুর বাড়ী মৌলভীবাজার গেছিলেন বেড়াতে। যুদ্ধ লাগার পর বহু কষ্ট করে তিনি এসে পৌঁছাতে পেরেছেন। এসব বর্ননা তিনি দেন সবাই শুনে। আমার শুধু মনে হতে থাকে আব্বাও যদি এতো কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে এসে হাজির হতেন। এ কয়দিন যা দেখেছি মনে হয় স্বপ্ন । ভযাবহ দু:স্বপ্ন।
ডা: নানা তার কম্পাউন্ডার মালেকের বাড়ী মুক্তিখলা থেকে ঘুরে এসে বর্ডারের খবর বলেন। নানাভাই মনো স্থির করে ফেলেন এই দৌঁড়াদৌড়ি নয় তিনি ইন্ডিয়াই যাবেন। একরাত্রে আম্মাকে আর বড় মামাকে ডাকেন কাছে বসান। আমরা যথারীতি আম্মার কাছে। ইন্ডিয়া যাবার সিদ্ধান্ত জানিয়ে তাদের মতামত চান। আম্মা জানিয়ে দেন, তিনি আর নানাভাইর সাথে যাবেন না। উনার যুক্তি ওখানে কলেরা লাগছে। আবার কারও কিছু হবে না দেখা যাবে উনার বাচ্চারাই মারা যাচ্ছে। আম্মার কথা উনাকে উজানীগাঁও আমাদের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিতে। আমাদের চাচারাই ঠিক করবেন আমরা কোথায় যাবো। নানাভাই দু:খ পান কিন্তু আম্মার মত ফেলতেও পারেন না। আব্বা আর সিতারার মৃত্যুর পর তিনিও নিজেকে অপরাধী ভাবছেন। কিন্তু আমাদেরকে ছেড়ে যেতে উনার খুব কষ্ট হবে জানান। আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা তিনি যেহেতু দিতে পারেন না, সেহেতু আম্মার মত বহু কষ্টে মেনে নেন। বড় মামাও জানান তিনি যাবেন না। তিনি গেলে আমাদের কে দেখবে। তারপরে অবস্থা দেখে তিনি যাবেন। নানাভাই আম্মা ও বড় মামা দু’জনকে পাঁচ হাজার করে টাকা দিয়ে বলেন, উনার নিজের কাছেও খুব বেশী রইলো না আল্লাহ ভরসা। আমরা ঘুমুতে চলে যাই। রাত্রে প্রশ্রাব করার জন্য নানাবু আপা আর আমাকে নিয়ে বের হন। বারান্দায় রাত্রে এই কাজ করা হতো। বের হয়ে দেখি গভীর রাতে আমার রাশভারী নানা বেন্চে বসে ডুকরে ডুকরে একা একা কাঁদছেন। নানুবু উনার কাছে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়ান। তিনি আমাকে আর আপাকে দুদিকে ধরে হৃদয় বিদারক কান্না করতে থাকেন আমরা চুপ করে দাড়িয়ে থাকি। আমাদের কান্না শেষ হয়ে গেছে।
পরদিনই নানা ভাই, নানী ছোট মামা আর আবু ভাইর ফ্যামেলী ইন্ডিয়ার পথে রওয়ানা হন। প্রথমে নৌকায় পরে নাকি হাঁটা পথ। আম্মা ঘর থেকে বের হন না। আবেদীন আর লাকীকে বুকে জড়িয়ে পড়ে থাকেন। আমরা নৌকা পর্যন্ত যাই। নানা ভাইর বোনরা যান। যান বড় মামা। আর কি দেখা হবে। যেনো শেষ যাত্রা। হয়তো জীবনের শেষ দেখা। সবার চোখে পানি, মনে ভয়।
নিজেদের আবার এতিম মনে হয়। জন্মের পর থেকে এই মানুষটি আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। একই শহরে থাকি। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আমার নানার আগমন আমাদের বাসায় অবধারিত ছিলো। আপা ছিলো উনার জান। আর আম্মা একটা মাত্র মেয়ে। বড় আদরের। তাকে এই অবস্থায় ফেলে যাচ্ছেন। উনার ভেতরটা ছিড়ে ফুঁড়ে যাচ্ছে সবাই বুঝতে পারছে। আমাদেরও তো তাই। কিন্তু কঠিন বাস্তব মেনে আমরা ঘরে ফিরে আসি। পর দিন ডা: নানাও বেরিয়ে পরেন গন্তব্য মুক্তিখলা। সেখান থেকে ব্যবস্থা করে স্ত্রী সন্তান সহ যাবেন ইন্ডিয়া। রামনগড়ের নানা আজির উদ্দীন নাজির সাহেব সবার সেবা করায় সিদ্ধহস্ত। পৃথিবীতে উনার মতো মনের মানুষ আল্লাহ কম পাঠিয়েছেন। উনার ছাত্রাবস্থায় উনার বাবা মা ভাই বোন সবাই কলেরায় মারা যান। থাকার মাঝে আছেন উনার চাচা আর চাচা তো দুই ভাই। তাদের বাড়ীতেই আমরা এতো মানুষ আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু আমাদের আদর যতেœ ভালবাসা প্রদানে তারা কোন ত্রুটি রাখে নাই। সর্বোপরি বানিয়াচঙের নানুবু আসাতে তিনি একাই সব সামাল দিচ্ছেন। কিন্তু আম্মা আমাদের নিয়ে আমাদের চাচাদের কাছে যেতে চান। কারন আব্বা মারা যাওয়ার পরে উনাদের সাথে কোন দেখা হয়নি। তারা আম্মাকে হয় তো দোষী ভাবছেন। মোট কথা তাদের সম্মুখীন তিনি হতে চান।
পিতার কুলখানি
মে মাসের শেষ দিকে এক দুপুরে আমার চাচা (আব্বার ইমিডিয়েট বড় ভাই) আর সেজো চাচা নৌকা নিয়ে রামনগড়ে আসেন আমাদের নিয়ে যেতে। আব্বার একমাসের শিন্নি করতে চাচ্ছেন তারা। জানি না হয়তো বড় ভাই খবর দিয়েছেন। তাদের আর আমাদের মিলিত কান্নায় হয়তো সে দিন রামনগড়ের আকাশও কাঁদছিলো। প্রচুর বৃষ্টির মাঝে আমরা পিতার জন্মস্থানের দিকে রওয়ানা হই। সঙ্গে বড় মামা। সারা গ্রাম ভেঙ্গে লোক জড়ো হয়। কতজন যে অম্মাকে কত কথা শুনায়। বোবার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকি। এরা কেউ আমাদের চাচী বা চাচা তো ভাই বোন না। আড়ি পড়ি। পরের দিনই কুলখানি। বাড়ী এসেই জানতে পারি আমাদের গ্রামের ছত্তার মিয়া পাক আর্মির সাথে হাত মিলিয়েছে। ছত্তার মিয়ার বাড়ী আমাদের বাড়ী থেকে বেশী দূরে নয়। তার চাচার সাথে আব্বার চাচাতো বোন আলতাফুজীর বিয়ে হওয়ার সুবাদে তাকে আমরা ভাই ডাকি। আমাদের সুনামগঞ্জের বাসায় তাকে বহু দেখেছি। তার ছেলে বশীর জুবিলী স্কুলে পড়তো। সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। সে আমাদের বাসায় কত এসেছে খেয়েছে। আব্বা তাকে নাতি ডাকতেন আদরও করতেন। সেই ছত্তার মিয়া পাকআর্মির সাথে হাত মিলিয়ে আমাদের গ্রামে সকলকে ভয় দেখিয়ে চলছে। আমার সেজো চাচার শশুর বাড়ীর দিকেও সে আত্মীয়। উনাকে ডেকে নিয়ে নাকি বলেছে, গ্রাম এখন তার কথায় চলবে। বড় চাচা যেনো উনার ছেলের কৃতকর্মের জন্য সারেন্ডার করেন। সে ব্যবস্থা করবে আর দাদাকে নিয়ে আসতে হবেনইলে আমাদের বাড়ীর লোকের খবর আছে। বড় চাচা বাড়ী থাকেন না। দিনের বেলা আসেন এর মাঝেই এই কুলখানির ব্যবস্থা। বড় মামাকে দেখে তিনি ভয় পান। কেন এসছেন উনাকে নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষমতা উনার নাই। সেজো চাচাকে দিয়ে আব্বার কুলখানির দাওয়াত ছত্তার মিয়াকে পাঠানো হয়েছে। যাতে সে রুষ্ট হয়ে ঐ দিনই কোন ঝমেলা না করে। সে নাকি শুনে বলেছে বাবুর কুলখানিতে আমি কোন সমস্যা করবো না। উনি ভালো মানুষ ছিলেন কিন্তু বড় চাচাকে সারেন্ডার করতেই হবে। নইলে বাড়ী জ্বালিয়ে দেবে। শেষে বলছে যাও বাবুর কূলখানির অনুমতি দিলাম। আমরা অবাক হয়ে শুনি কুলখানি করার জন্যও অনুমতি লাগবে! ছোট চাচা ক্ষেপে যান এখনই গিয়ে জিজ্ঞেস করতে চান। বড় চাচা উনাকে সামলান। (আমার আব্বাকে আমাদের চাচাতো ভাইয়েরা বাবু ডাকতো। ছত্তার মিয়াও বাবু সম্বোধন করতো।) বাড়ী নাকি খালিই ছিলো চাচীদের তাদের বাপের বাড়ীতে বাচ্চা কাচ্চাসহ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো। কুলখানি উপলক্ষে সবাই এসেছেন। ছত্তার মিয়া সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে সে এই গ্রামের শাসক। পাক আর্মি নাকি তাকে ক্ষমতা দিয়েছে। তাকে সবাই সাহেব ডাকতে হবে। ছত্তার মিয়া ডাকা যাবে না। সাহবের অনুমতি পেয়ে বড় চাচা একটু নিশ্চিন্ত হন। অন্তত ঐ দিন কোন অঘটন ঘটবে না। আমার চাচারা পাঁচ ভাই পাঁচটি গরু জবাই করে কুলখানির আয়োজন করেন। বিভিন্ন গ্রাম থেকে এই দুঃসময়েও আত্মীয় স্বজন নৌকা করে আসে। আর দুপুরের মধ্যেই চলে যায়। সবার চোখে আতন্ক। মৃত্যু ভয়। অনেকেই আমাদের ডেকে ডেকে দেখে। চিনিও না অনেককে। গাগলী থেকে, গুয়চুড়া থেকে পাগলা থেকে, চনডীপুর থেকে, ভান্ডা থেকে লোকেরা আসে। বড় চাচা গাগলীর লোকের সাথে অনেকক্ষন কথা বলেন। বিকালের মাঝেই এতো বড় আয়োজন শেষ হয়ে যায়। আমাদের চাচারা শুধু হাহাকার করেন। আমাদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। আমরা শুধু দেখতে থাকি। কত জনের কত কথা! আম্মাকে দোষ দেয়া আমার নানা ভাই কে দোষ দেয়া, শুনতে থাকি। একটু প্রতিবাদ করার চিন্তাও করতে পারি না। আমরা বাড়ীতে থাকি। বড় চাচা বড় মামাকে নিয়ে কোথায় যেনো চলে যান। সবাই চলে গেলে উঠানে দাড়িযে আমার বাকী চার চাচা একজন আরেজনকে ধরে হৃদয় বিদারক কান্না জুড়েন। যা চোখে দেখার মতো নয়। তাদের স্বপ্নের ভাই, তাদের বহু কষ্টের শিক্ষিত ভাই, তাদের স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়েছে। এ কান্না যেনো সারা উজানীগাঁও ছড়িয়ে পড়েছে। আশেপাশের সবাই জড়ো হয়ে সে কান্নায় সামিল হয়। শুধু আমরা বোনেরা বারন্দার পালা ধরে নির্বাক চেয়ে থাকি। উদ্দেশ্যহীন চাওয়া। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নির্বাক চাহনি।
(চলবে)


