জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আইয়ুব খান পদত্যাগ করে। সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দেয়। মুক্তি পান আমাদের দাদা গোলাম রব্বানী। মনে হয় সেটা ফেব্রুয়ারি মাস ছিলো। জীপে করে বিজয়ীর বেশে দাদা আসেন। শত শত ছাত্র জনতা তাকে মালা দিয়ে নিয়ে আসেন আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে সারা শহর। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে আনন্দে গর্বে মাতোয়ারা আমরা । এ সময় শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়। শ্লোগানে আরেকটি পালক যোগ হয়। কিন্তু না আন্দোলন থামে না। ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হয়ে শীঘ্র নির্বাচন দিবেন বলে ওয়াদা করেন। শুরু হয় নির্বাচন আদায় করার আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু তখন চষে বেড়াচ্ছেন সারা পূর্ব পাকিস্তান। ছয়দফা বাস্তবায়নের জন্য যে তার জনগণের ম্যান্ডেট দরকার। সুনামগঞ্জেও শুরু হয় তার কার্যক্রম ।
বঙ্গবন্ধুর সুনামগঞ্জ আগমন ও ১৯৭০ এর নির্বাচন ১৯৭০ সালে শহর প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী আমি। বৃত্তি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি। চারিদিকে নির্বাচনের আমেজ। সামাদ চাচা বার বার সুনামগঞ্জ আসছেন। দুইজন দুই পার্টি করলেও আমাদের বাসায় তিনি আসতেনই।
রাত্রে বারান্দায় বসে আব্বা আর তিনি গভীর আলোচনায় মগ্ন হতেন। এরই মাঝে সুনামগঞ্জে সাজ সাজ রব পড়ে যায় বাংলার অবিসংসবাদিত নেতা শেখ মুজিব যিনি ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু খেতাব পেয়েছেন তিনি নাকি সুনামগঞ্জ আসছেন। সামাদ চাচা বার বার সুনামগঞ্জ আসছেন। সব দলের নেতারা উন্মুখ তিনি এসে কি বলেন। মিছিলের ভাষায় আরও এক পালক যোগ হয়। “স্বাগতম শেখ মুজিব লও লও লও সালাম”। ছাত্রদের মাঝে বড়দের মাঝে এক অন্য ধরনের উত্তেজনা। আমরা ছোটরাও উত্তেজিত। ছয়দফার কারিগর, সদ্য আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেঁচে ফিরে আসা বীর সুনামগঞ্জ আসছেন! কিন্তু তাকে দেখতে পাওয়া আমার মতো পিচ্চি মেয়ের জন্যে অসম্ভব এক বিষয়। তথাপি সড়ক পথে এসেছিলেন বলে আর আমাদের বাসাটি বাসষ্টেন্ডে হওয়ায় এই পথেই তিনি শহরে ঢুকবেন। সকাল থেকে শত শত ছেলে মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, বড় ছোট স্কুল কলেজের ছাত্র সবাই। আমিও দাঁড়িয়ে। গাড়ি আমাদের বাসার সামনেই। একটা সবুজ রংয়ের জীপে করে সেই দীর্ঘদেহী জননেতা তার দীর্ঘ হাত তুলে অভিবাদন জানিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই দীর্ঘ হাত আর একটুখানি মুখ দূর থেকে দেখা আজও চোখে ভাসে। আব্বারা জনসভায় চলে যান আর আমরা অধীর আগ্রহে মাইকে তার গমগমে কন্ঠস্বর শুনি। ইতিহাসের এক কিংবদন্তীকে এই একটু দেখার স্মৃতি আজও চোখে ভাসে।
বঙ্গবন্ধু যাওয়ার পর পরই নির্বাচন ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন হবে অক্টোবরে। তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। শুনতে পাই, কেন্দ্র থেকে প্রাদেশিক পরিষদে দাদা গোলাম রব্বানীকে দিরাইর সিটে ন্যাশনাল আওযামী পার্টির প্রার্থী দেয়া হয়েছে। এক রাতে দাদা আর আব্বার মাঝে কথা হয়, দাদা জানতে চান, তিনি প্রার্থী হবেন কি না ? বরুণ দা চাচ্ছেন সেন দা এর অনুকূলে সিট ছেড়ে দিতে। আব্বার মতামত জানতে চান। ঐ দিন আব্বার উত্তর ছিলোÑ এই নির্বাচন স্বাধীকার আদায়ের নির্বাচন। যে ভাবেই হউক শেখ মুজিবের হাত শক্তিশালী করতে হবে। স্বাধীকার আদায় হলে সমাজতন্ত্র আনা দুষ্কর হবে না। এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ম রক্ষার জন্য। জীবনে অনেক সুযোগ আসবে, এই মুহূর্তে বরুণ দা এর কথা শোনা উনার কর্তব্য। হ্যাঁ দাদা গোলাম রব্বানী সরে এসছিলেন। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সেখানে প্রার্থী হন। কিন্তু আর কখনও নির্বাচন করার সুযোগ তার হয়নি। সে যাই হউক। নির্বাচনে সুনামগঞ্জ শহরের প্রার্থী দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী। মার্কা নৌকা। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও দিরাই এ আব্দুস সামাদ আজাদ চাচা। প্রাদেশিক পরিষদে রইছ চাচা, জহুর চাচা, হেকিম চাচা, সেন দা আরও অনেকে। এই সময় সারা শহরে এক নূতন স্লোগানে মুখরিত থাকতো “জয় বাংলা” আওয়মী লীগ ন্যাপ সবাই একই স্লোগান দিতো। স্লোগানটা মরমে ঢুকে যায়।
প্রতিদিন নৌকার মিছিল আর কুঁড়েঘরের মিছিল। পিডিপি, মুসলিম লীগ এরাও প্রার্থী দেয় কিন্তু মিছিল মিটিংয়ের সাহস নেই। নৌকার জোয়ারে সব ফ্যাকাসে। আব্বা বাড়িতে সময় বেশী কাটান। সামাদ চাচা প্রার্থী। তিনি ন্যাপ হলেও সামাদ চাচা তার জানি দোস্ত। আর নৈতিক ভাবে তিনি বিশ্বাস করতেন এই নির্বাচন স্বায়ত্বশাসন আনার নির্বাচন। স্বায়ত্ব শাসন আসলে সমাজতন্ত্র আসবে। কাজেই শেখ মুজিবের হাত আগে শক্ত করতে হবে। সারা দেশের সব প্রগতিশীল দলের নেতারা হয়তো তাই কামনা করতেন, এজন্যেই এই নির্বাচনে প্রায় শতভাগ জয় শেখ মুজিবের পক্ষে আসে। দাদা চলে গেছেন দিরাই সেন দার জন্যে কাজ করতে। নিজেদের একটা সিট দরকার দর কষাকষির জন্যে। আমাদের বাসায় তাই নির্বাচনের কাজ নেই। তবে সারা শহর উত্তাল। নানাভাই মতছিন আলী মার্চেন্ট সমিতির সভাপতি, মটর মালিক সমিতির সভাপতি আওয়ামী লীগের জন্য প্রাণপাত করতে প্রস্তুত। ওখানে রোজ মিটিং হচ্ছে প্লান প্রোগ্রাম হচ্ছে। আনোয়ার রেজা নানাভাইর ছেলেবেলার বন্ধু , কিন্তু না তিনি বন্ধুর পক্ষে কাজ করছেন না। কুকড়া চুলের সৌম্যকান্তির ওবায়দুর রেজার পক্ষে কাজ করছেন। রোজ সন্ধ্যায় মধ্যবাজারে তার উঠানে বসছেন অনেকে। কিষন লাল বাবু, কিশোরী মোহন বাবু, শিরিষ বাবু, আফাজউদ্দীন সাহেব,বারী মিয়া সাহেব, লাল মামা অনেকেই। সবার উপরে হোসেন বক্ত মামা। তিনি সারা শহর দাবরিয়ে বেড়াতেন। রাত্রে দোকান থেকে তার প্রিয় দামান্দ নানাভাইর কাছে চলে আসতেন। কি যে কথা জামাই শশুরে আল্লাহ জানেন। তবে যে কোন আন্দোলনে তিনি নানাভাইকে বড় গুরুত্ব দিতেন বিশ্বাস করতেন। তার অনেক কাজ উনার মাধ্যমে করাতেন তা বুঝতে পারতাম।
আমি এ সময় ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি। শহর প্রাইমারী বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। হেড মাষ্টার দীর্ঘদেহী ঋষিসম হরেন্দ্রলাল সেন। তিনি আমাদের স্কুলের ৫/৬ জনকে বৃত্তির জন্যে সিলেক্ট করেছেন। তখন বৃত্তি পাওয়া যেমন সম্মানের তেমন কষ্টসাধ্য। সারা শহরে হাতে গুনা বৃত্তি আসতো। এবং সিলেকশন প্রক্রিয়াও ছিলো খুব কঠিন। তার জন্যে আলাদা পরীক্ষা দিতে হতো। সিলেক্ট হলে স্কুলই দায়িত্ব নিতো তাকে তৈরি করার। এ কারণে হেড মাষ্টার স্যার আমাদের দুইটার পর পাঠিয়ে দেন রাজগোবিন্দ স্কুলে কোচিং করার জন্যে উনার ভাই দীজেন্দ্র লাল সেনের কাছে। ওখানে গিয়ে জানি উনি উনার ভাই। তিনি কানে কম শুনতেন। কিন্তু বৃত্তির ছাত্র গড়ায় উনি নাকি কিংবদন্তী ছিলেন। আমি ও টুকু আমাদের স্কুল থেকে যাই। অন্যদের বাসা থেকে পারমিশন না পওয়ায় যাওয়া হয় না। ওখানে গিয়ে দেখি অনেক স্কুলের ছেলেরাও পড়তে আসছে। দিজেন্দ্র লাল সেনের কাছে কোচিং করা আমার জীবনের একটা মাইলফলক। জীবনে বহু টিচারের কাছে পড়ার সুযোগ হয়েছে কিন্তু এই কানে কম শুনা টিচারের কাছে যে অংক আমি করেছি তা দিয়ে এস এস সি, এমন কি বিসিএস পরীক্ষা চালিয়ে দিয়েছি। অংককে সহজ ভাষায় হৃদয়ঙ্গম করাতে উনার জুড়ি ছিলো না। তার সাথে ইংলিশ। উনি আমাকে বড় আপন করে নিয়েছিলেন। তার কারণ উনার টিচার ছিলেন নাকি আমার বড়বাবা হাজী ইয়ছিন আলী মাস্টার সাহেব। আমার বড় দাদা মানে নানা মতছিন আলী সাহেবের বাবা। তিনি নাকি বিশের দশকে এই স্কুলেরই মাষ্টার ছিলেন। বড় যতœ করে পড়াতেন। স্কুলে এবং বাসায় যখন যেখানে সুযোগ হতো। এই বিষয়টা আনার কারণ হলো তখন আমি লঞ্চঘাটের রাজনৈতিক কমর্কান্ড আর ষোলঘরের কর্মকান্ড দেখার সুযোগ পেয়ে যাই । স্কুলের পাশেই ছিলো লঞ্চঘাট। কত প্রকারের মানুষ যে এদিক দিয়ে আসতো! তাদেরও আলোচনার বিষয় আন্দোলন। বিভিন্ন থানা থেকে রেডি হয়ে কর্মীরা আসতো আর লঞ্চ থেকে নেমেই শ্লোগান দিতে দিতে শহররে দিকে যেতো। পড়া ছেড়ে আমরা এই মিছিল দেখতে ব্যস্ত হয়ে যেতাম। আর স্যারের বেতের বাড়ি খেতাম।
ছুটির দিনে স্যারের বাসায় সকাল থেকে যেতে হতো। স্যারের বাসার পাশেই ছিলো নানু মোক্তার সাহেবের বাসা। উনি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। উনার বাসায় লোকসমাগম হতো। যাওয়ার পথে উকিল পাড়ার কলেজ হোস্টেল, ভানু দা দের বাসা, একটু এগোলে মিনু দা দের বাসা, এদের সবার বাসার সামনেই বিভিন্ন বয়সের ছাত্রদের জমায়েত থাকতো। স্যারের বাসাটা ছিলো একেবারে তপোবন। শিক্ষকের বাসা। সবাই পড়াশুনায় ভালো। কিন্তু তারাও রাজনৈতিক মিছিলের শরিক। পাশেই আমাদের হেড স্যার। উনার মেয়ে মীরা দি, ছেলে হারু দা ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত কিন্তু বাসায় কোন রাজনীতির ছায়াও নাই। ছেলে মেয়ে একসাথে কোচিং, মারা মারি ঠেলাঠেলি কত রকম দুষ্টুমী যে করতাম তার ইয়ত্তা নেই। মানিক রীনা দির ভাই, বাধন, পি আই স্যারের ছেলে বাহার, মাইজবাড়ীর এক ছেলে, আরও কয়েকজন ছিলো কোচিং মেট। মেয়েদের মাঝে আমি আর টুকু। সকালে বিকালে স্যারের বাসায় যাওয়া আর রাস্তায় রাস্তায় মিছিলে গলা মেলানো। উকিল পাড়া লম্বা বাসার অপজিটে একটা মুদীর দোকান থেকে চার আনার তেতুল কিনে লবণ মরিচ দিয়ে মানিক আর বাঁধন এর সাথে ভাগ করে তেতুল খেতে খেতে বই খাতা হাতে রওয়ানা হতাম আর নৌকা নৌকা -কুড়েঘর কুড়েঘর শ্লোগান দিতে দিতে পথ চলতাম। সামনেই ছিলো পিডিপি এর মাহমুদ আলী সাহেবের বাসা। উনারা খুব সম্মানিত মানুষ। সুনামগঞ্জের উন্নয়নে বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে এই বাসার অবদান অস্বীকার করার উপায় নাই। আসাম গভ: এর সময় থেকে এই বাসা মিনিস্টার বাড়ি। আর মাহমুদ আলী সাহেব নিজেও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা স্বত্তেও তিনি পিডিপি থেকে দাঁড়ানোতে কোণঠাসা । ছড়া কাটতাম আমরা। কে যে শিখিয়ে দিয়েছিলো মনে নাই।
বাট্টি গুট্টি পিডিপি নেতা ইলেকশন আসিলে
দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফিরে সকালে বিকালে ।
বিকালে স্যারের বাসা থেকেই দেখতাম নৌকা নিয়ে বিরাট মিছিল। পরক্ষণেই কুড়েঘরের মিছিল। এ যেনো এক উৎসব। (চলবে)
- বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে মানববন্ধন
- বন্দুকের লাইসেন্স নবায়নে জগন্নাথপুরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ


