করোনার সময় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি অত্যাধুনিক এম্বুলেন্স বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো। এম্বুলেন্সে ছিলো লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা। পরে সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গেলো, উপযুক্ত চালক না থাকায় গ্যারেজের বাইরে পড়ে আছে এম্বুলেন্সটি। ব্যবহার না করার কারণে মূল্যবান এই এম্বুলেন্সটি নষ্ট হওয়ার উপক্রম। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দামী দামী যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার খবর জানি আমরা। অর্থাৎ দেশের মানুষের করের পয়সার অথবা বিদেশি বন্ধুদের উপহারে যেসব মূল্যবান উপকরণ আমাদের স্বাস্থ্যখাতে যুক্ত হয় সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারে আমরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারি না। এমন এক প্রেক্ষাপটে আরেকটি ভাল খবর জানা গেল। শনিবার ভারতীয় সরকার জেলার ছাতক ও দিরাই উপজেলা হাসপাতালে লাইফসাপোর্ট ব্যবস্থাসম্বলিত ২ টি আধুনিক এম্বুলেন্স প্রদান করেছেন। ভারতের বাংলাদেশস্থ সহকারি হাইকমিশনার নিরাজ কুমার জায়সওয়াল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এম্বুলেন্স ২ টি হস্তান্তর করেছেন। ছাতকে সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক এবং দিরাইয়ে সংসদ সদস্যের পক্ষে দিরাই পৌরসভার মেয়র এম্বুলেন্সগুলো গ্রহণ করেন। দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ভারত সরকারের এই উপহার ইতিবাচকভাবে ভূমিকা রাখবে। আমরা এজন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
বাংলাদেশের সমস্যা হলো, সমন্বয় ও সম্পদের সুষম ব্যবস্থাপনার অভাব। এই অভাবের কারণে ভবন থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় সেবা পাওয়া যায় না। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার যন্ত্র থাকলেও টেকনোলজিস্ট বা রেডিওলজিস্ট না থাকায় রোগীর পরীক্ষা হয় না। সেবিকা না থাকায় বেডে থাকা রোগি সেবা পায় না। অথচ যন্ত্র এবং এর পরিচালনার জন্য দক্ষ লোক একই সাথে ব্যবস্থা করাটা হলো সুব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আমরা যেমনটা কেনাকাটায় অধিক আগ্রহ বোধ করি এটি সচল রাখতে ততটাই অবহেলা দেখাই। ফলে দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো এখনও মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। চিকিৎসাসেবা এখন বেসরকারি খাতে উচ্চ মূল্যের পণ্য বিশেষ। টাকা দিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য নেই সাধারণ মানুষের। সরকারি হাসপাতালগুলোকেই হয়ে উঠা উচিৎ ছিল সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ভরসার জায়গা। দুর্ভাগ্যজনক হলো এটি হয়নি। ফলে দেশের প্রান্তিক মানুষ মূলত সুচিকিৎসার কোন সুযোগ নিতে পারেন না। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এমন অবস্থা কাম্য ছিল না।
যাই হোক জেলার ছাতক ও দিরাই উপজেলায় ভারত সরকার বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ যে ২টি এম্বুলেন্স উপহার দিয়েছেন সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার কামনা করি। ব্যবহার না হলে এই উপহারের কোন মূল্য থাকবে না। যেমন মূল্যহীন অবস্থায় নষ্ট হয়ে গেছে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দেওয়া নৌ এম্বুলেন্সগুলো। হাওর এলাকার পল্লীবাসীর সুবিধার জন্য কয়েকটি উপজেলায় একসময় কয়েকটি নৌ এম্বুলেন্স দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এগুলো কখনও ব্যবহৃত হতে শুনা যায়নি। মূলত কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে কম সম্পদ দিয়েই অনেক বেশি সুবিধা দেয়া যায়। কিন্তু আমরা যথেষ্ট সম্পদ দিয়েও ন্যূনতম সুবিধা দিতে পারি না। এটি কি আমাদের অদক্ষতা? নাকি ¯্রফে সীমাহীন অবহেলা? অনেকে বলে থাকেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রকে অকার্যকর করার জন্য একটি প্রক্রিয়া বজায় থাকে যাতে মানুষ প্রাইভেট চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে পয়সা খরচ করে চিকিৎসা নেন। এমন অভিযোগ অমূলক নয় বরং চরমভাবে বাস্তব অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
মনে রাখা দরকার চিকিৎসা মানুষের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার দেয়ার জন্য সরকার বহু টাকা খরচ করেন। এর পরও যদি দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোন প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা কাঠামো থেকে সেবা না পান (কয়েকদিন আগের প্রথম আলোর একটি রিপোর্ট দ্রষ্টব্য) তাহলে সেটি খুব নির্মম। স্বাস্থ্যসেবাকে আমরা মানবিক কাঠামোর মধ্যে দেখতে চাই।

