সুনামগঞ্জের প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত যারা জীবিত রয়েছেন ওস্তাদ ফটিক চন্দ তাদের অন্যতম। ৮২ বছরের বয়সী এই প্রবীণ শিল্পী এখন নানাবিধ অসুখে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। শিল্পীরা সাধারণত কোন জাগতিক সুযোগ-সুবিধার দিকে ধাবিত হন না সক্ষম বয়সে। ফটিক চন্দও এর বাইরে নন। পুরো জীবন মনের আনন্দে গান গেয়েছেন। রচনা করেছেন অনেক গানের বাণী। শিখিয়েছেন অনেককে। কিন্তু নিজের বিত্ত বৈভব কীভাবে বাড়াতে হয় সেই পথের খুঁজে যেতে পারেননি কখনও। ফলস্বরূপ বৃদ্ধ বয়সে তাঁর জীবন কাটছে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশায়। তাঁর এক ছেলে কয়েক বছর আগে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করায় অবস্থা আরও অসহায় হয়ে পড়েছে। এতদিন তিনি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দুস্থ শিল্পী হিসাবে একটি বাৎসরিক ভাতা পেতেন। টাকার অংকে যা একেবারেই নগন্য। ফটিক চন্দের ভাষ্যমতে ২০১৫ সনে তিনি ১৬ হাজার ৬ শ’ টাকা ভাতা পেয়েছিলেন। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে ২০১৬ সনে তাঁর নামে এই ভাতার বরাদ্দ আসেনি। কেন আসেনি শিল্পী তার কিছুই জানেন না। জেলা শিল্পকলা একাডেমি সূত্রে জানা যায় মন্ত্রণালয় প্রতিবছর শিল্পীদের তালিকাসহ ভাতার টাকা পাঠায়। এবারের তালিকায় ফটিক চন্দের নাম নেই। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কোন কারণে কিংবা কোন মাপকাঠিতে এ বছর ফটিক চন্দের নাম বাদ দিয়েছে তা আমরা জানি না তবে যেকোন বিবেচনায় এই দুঃস্থ শিল্পীর নাম ভাতার তালিকার প্রথম দিকেই থাকার কথা। আমরা বিশ্বাস করতে চাই না মন্ত্রণালয় ইচ্ছাকৃতভাবে নামটি বাদ দিয়েছে বরং আমরা বিশ্বাস করতে চাই নিতান্ত ভুলবশতঃই নামটি বাদ পড়েছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আশ্বস্থ করেছেন শিল্পী যাতে ভাতা পেতে পারেন তিনি সেই চেষ্টা করবেন। আমরা সাধারণ সম্পাদকের এই আশ্বাসের উপর আস্থা রাখতে চাই।
শিল্পীরা একটি জাতির মনোজগত তৈরির কারিগর। তাঁরা জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন, জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জায়গাটিকে লালন ও সমৃদ্ধ করেন। সুতরাং জাতি গঠনে লেখক-শিল্পীদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। শিল্পীরা যেমন অকাতরে দেশ-জাতিকে সারা জীবন শুধু বিলিয়েই দেন কোন কিছু পাওয়ার আশা না করেই তেমনি এই শিল্পীদের প্রতি দেশ-জাতির কিছু দায়িত্ব রয়েছে। জাতীয় এই দায়িত্ববোধের জায়গাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ৮২ বছরের বৃদ্ধ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল একজন ফটিক চন্দ খুবই অবহেলায় দিন পার করছেন, উপরন্তু ভাতা কেড়ে নিয়ে তাঁর সম্মানের জায়গাটিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এতে জাতির গৌরব ক্ষুণœ হয়। দেশের সাংস্কৃতিক জগতকে যারা নেতৃতৃ¦ দিচ্ছেন দায়িত্বটি তাদের, এই লজ্জার জায়গা থেকে ফটিক চন্দকে উদ্ধার করা।
ফটিক চন্দ হয়তো আর বেশি দিন বাঁচবেন না। কিন্তু মৃত্যুর আগে এখন তিনি যে মর্মপীড়ায় ভোগছেন সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করা গেলে এই শিল্পী যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন শান্তি পাবেন। আমরা জানতে পেরেছি জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে এবার তাঁকে গুণীজন সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। এজন্য আমরা শিল্পকলা একাডেমির সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তবে এর সাথে শিল্পীর বর্তমান অস্বচ্ছলতা বিবেচনা করে স্থগিত হয়ে থাকা ভাতা চালু করা এবং অন্যভাবে তাঁকে আর্থিক সহায়তা দানের জন্য আমরা জেলা প্রশাসন, শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করছি। একজন শিল্পী যখন তৃপ্ত থাকেন তখন তার মুখে একটি জাতির তৃপ্তিবোধ জেগে উঠে। আমরা ফটিক চন্দকে তৃপ্ত দেখতে চাই।

