কুমারী পূজার প্রচলন ও তাৎপর্য

অ্যাড. গৌরাঙ্গ পদ দাশ
সনাতন শাস্ত্র কুমারী পূজার তাৎপর্য অত্যন্ত অর্থবহ। সাধারনত দুর্গা পূজার অঙ্গ রূপে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তন্ত্রশাস্ত্র মতে, অনধিক ষোল বছরের অরজ;স্বলা কুমারী মেয়ের পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে স্থান ভেদে কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা ও অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কাম্যখ্যাদি শক্তিক্ষেত্র ও কুমারী পূজার প্রচলন আছে। শান্ত্রমতে, কুমারী পূজার উদ্ভব হয় কোলাসুরকে বধ করার পর থেকে। কোলাসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করলে বিপন্ন দ্গেন মহাকালীর শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। তারপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন হয়। কুমারী পূজায় কোনো জাতি, ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই। দেবীজ্ঞানে যে কোনো কুমারীই পূজনীয়, এমনকি বেশ্যাকুলজাত কুমারীও। তবে সাধারণত ব্রাহ্মণকুমারী কন্যার পূজাই সমধিক প্রচলিত। এক থেকে ষোল বছর বয়সী কুমারী মেয়ের পূজা করা চলে। বয়সের ক্রমানুসারে পূজাকালে এদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, দুই বছরের সরস্বতী, তিন বছরের ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কালিকা, পাঁচ বছরের সুভগা, ছয় বছরের উমা, সাত বছরের মালিনী, আট বছরের কুজিকা, নয় বছরের কালসন্দর্ভা, দশ বছরের অপরাজিতা, এগারো বছরের রুদ্রাণী, বারো বছরের বৈরভী, তেরো বছরের মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছরের পীঠনায়িকা, পনেরো বছরের ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোল বছরের অন্নদা বা অম্বিকা।
কুমারী মেয়েকে মনে করা হয়সর্ববিদ্যাস্বরূপিণী। কুমারী পূজা ব্যতীত দেবতার পূজা, হোম ইত্যাদি কোনো কিছুই সফল হয় না। ভক্তদের বিশ্বাস এর দ্বারা কোটি গুণ ফল লাভ হয় হয়, সকল বিপদ দূরীভূত হয়, কুমারী ভোজনে ক্রিলোকভোজেনের ফল লাভ হয়। কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব হলো নারীতে পরমার্থ লাভ। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে যে ক্রিশক্তির ফলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া সাধিত হচ্ছে, সে ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকিৃতি বা নারী ঁজাতির প্রতীক ও বীজবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়। এ এক মহত্তম সাধনাপদ্ধতি। এ সাধনায় সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারী মূর্তির রূপ ধারণ করে; তাই তার নিকট নারী ভোগ্যা নয়, পূজ্যা। এ ভাবনায় ভাবিত হয়েই রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজর স্ত্রীকে ষোড়ষীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। কুমারী পূজার মাধ্যমে এ সত্যই তুলে ধরা হয়।
লেখক: কেন্দ্রীয় জন্মাষ্ঠমী উদযাপন পরিষদ, সুনামগঞ্জ জেলা শাখা।