‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’

মাওলানা মুহাম্মদ এমদাদুল হক
ঈদুল ফিতর অর্থাৎ রোযা ভাঙার দিবস ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের এক ঈদ অর্থ আনন্দ,উৎসব,আহলাদ ইত্যাদি। দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আযহা। ধর্মীয় পরিভাষায় একে ইযাউমুল জাএজ (অর্থঃ পুরস্কারের দিবস) হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর মুসলমানেরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্যপালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করে থাকেন।
তারিখ: হিজরি বর্ষপঞ্জী অণুসারে রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উৎসব পালন করা হয়। (৬) তবে এই পঞ্জিকা অনুসারে কোনও অবস্থাতেই রমজান মাস ৩০ দিনের বেশি দীর্ঘ হবে না। হয় ২৯ দিন হবে না -হয় ৩০ দিনে হবে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের সমাপ্তিতে শাওয়ালের প্রারম্ভ গণনা করা হয়। ঈদের আগের রাতটিকে ইসলামী পরিভাষায় লাইলাতুল জাজা (অর্থ: পুরস্কার রজনী) এবং প্রচলতি ভাষায় “চাঁদ রাত” বলা হয়। শাওয়াল মাসের চাঁদ অর্থাৎ সূর্যাস্তে একখানি নতুন চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদ ঘোষা হয়, এই কথা থেকেই চাঁদ রাত কথাটির উদ্ভব। ঈদের চাঁদ স্বচক্ষে দেখে তবেই ঈদের ঘোষণা দেয়া ইসলামী বিধান। আধুনিক কালে অনেক দেশে গাণিতিক হিসাবে ঈদের দিন নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারিত হয় চাঁদ দেখেই। দেশের কোথাও না-কোথাও চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে। দেশের কোনো স্থানে স্থানীয় ভাবে চাঁদ দেখা গেলে যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে ঈদের দিন ঠিক করা হয়। মুসলমানদের জন্য ঈদের পূর্বে পুরো রমজান মাস রোজা রাখা হলেও ঈদের দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ বা হারাম। এমনি ভাবে বছরে ৫দিন রোজা রাখা হারাম। দুই ঈদের দিন আইয়্যামে তাসরিকের  তিন দিন।
ঈদের নামায কিভাবে পড়বেন-ভোর সকালে গোসল করে ফজরের নামাজ পড়বেন এর পর। ফযরের নামাযের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের নামাযের সময় হয়। এই নামায আদায় করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব।
ঈদের দিন ভোরে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদত করে থাকেন। ইসলামিক বিধান অনুসারে ২ রাকাত ঈদের নামাজ ৬ তাকবিরের সাথে  ঈদগাহ্ ময়দানে বা বড় বড়  জামে মসজিদে পড়া হয়।
ইমাম  সাহেব কর্তৃক শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পূর্বে খুৎবা (ইসলামিক বক্তব্য) প্রদানের বিধান থাকলেও ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে তা নামাজের পরে প্রদান করতে হয়। হাদিসের  বর্ণনা অনুযায়ী ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে খুৎবা প্রদান ইমাম  সাহেবের জন্য সুন্নত ; তা শ্রবণ করা নামাযীর জন্য ওয়াজিব। সাধারণত: ঈদের নামাজের পরে মুসলমানরা সমবেতভাবে মুনাজাত করে থাকেন, এবং একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের সম্ভাষণ বিনিময় করে থাকেন। ঈদের বিশেষ শুভেচ্ছাসূচক সম্ভাষণটি হলো, “ঈদ মুবারাক”। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া নামক ঈদগাহে। হাদিস শরীফে এসেছে যে ব্যক্তি সারাটি মাস রমজানের রোজা আদায় করে ঈদগাহে যায় আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সমস্ত পাপাচার ক্ষমা করে ঘোষণা করি যাও আজ   থেকে সে নিস্পাপ মাসুম শিশুর ন্যায়। তোমার সব গোনা ক্ষমা করে দেওয়া হল।
প্রস্তুতি: মুসলমানদের বিধান অনুযায়ী ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে একটি খেজুর কিংবা খোরমা অথবা মিষ্টান্ন খেয়ে ঈদগাহের দিকে রওনা হওয়া সওয়াবের (পূন্যের) কাজ। ঈদুল ফিতরের ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশসমূহের মধ্যে রয়েছে গোসল করা, মিসওয়াক করা, আতর-সুরমা লাগানো, এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহের মাঠে গমন করা, নামাজ-শেষে ভিন্ন পথে গৃহে প্রত্যাবর্তন। এছাড়া সর্বাগ্রে অযু-গোসলের মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার বিধানও রয়েছে। ইসলামের বিধানে নতুন পোশাক পরিধান করার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিভিন্ন দেশে তা বহুল প্রচলিত একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশেও সকল পরিবার সাধ্য মত নতুন পোষাক পড়ার চেষ্টা করে থাকেন ।
ফিৎরা; ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের রমযান মাসের রোযার ভুলত্রুটি দূর করার জন্যে ঈদের দিন অভাবী বা দুঃস্থদের কাছে অর্থ প্রদান করা হয়, যেটিকে ফিৎরা বলা হয়ে থাকে। এটি প্রদান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিৎরা আদায় করার বিধান রয়েছে। তবে ভুলক্রমে নামাজ পড়া হয়ে গেলেও ফিৎরা আদায় করার
নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। ফিৎরার ন্যূনতম পরিমাণ ইসলামী বিধান অনুযায়ী নির্দ্দিষ্ট। সাধারণত ফিৎরা নির্র্দিষ্ট পরিমাণ আটা বা অন্য শস্যের (যেমনঃ যব, কিসমিস.খেজুরের) মূল্যের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। সচরাচর আড়াই সের আটার স্থানীয় মূল্যের ভিত্তিতে ন্যূনতম ফিৎরার পরিমাণ নিরূপণ করা হয়। স্বীয় গোলাম-এর ওপর মালিক কর্তৃক ফিৎরা আদায়যোগ্য হলেও বাসার চাকর/চাকরানি অর্থাৎ কাজের লোকের ওপর ফিৎরা আদায়যোগ্য নয় ; বরং তাকে ফিৎরা দেয়া যেতে পারে। ইসলামে নিয়ম অনুযায়ী, যাকাত পাওয়ার যোগ্যরাই ফিৎরা লাভের যোগ্য।
ঈদ উৎসব; ঈদের দিনে সকালে প্রথম আনুষ্ঠানিকতা হল নতুন জামা-কাপড় পড়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া। ঈদের নামাজ শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য। নামাজের পর সবাই একসাথে হওয়া, দেখা করা। এসময় বাংলাদেশে ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে এবং সালামি গ্রহণ করে। ঈদের দিনে সালামি গ্রহণ করা প্রায় সব দেশেই রীতি আছে। তবে এর ধর্মিয় কোন বাধ্যবাধকতা বা রীতি নেই। সালাম মুসাফা, মোয়ানাকা,(কুলাকুলী) করলেই চলে।
ঈদের দিনে সেমাই,লাচ্ছি, সন্দেশ,বড়া, সমসা,  সবচেয়ে প্রচলিত খাবার। এবং বিশেষ আরো অনেক ধরনের খাবার ধনি গরিব সকলের ঘরে তৈরী করা হয়। এ উৎসবের আরো একটি রীতি হল আশেপাশের সব বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হয়। এ রীতি বাংলাদেশে সব জায়গায়ই আছে।
বাংলাদেশ সহ অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশে ঈদুল ফিতরই হলো বৃহত্তম বাৎসরিক উৎসব। বাংলাদেশে ঈদ উপলক্ষে সারা রমজান মাস ধরে সন্ধ্যাবেলা কেনাকাটা চলে। অধিকাংশ পরিবারে ঈদের সময়ে সব ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন নতুন জামা কাপড় খরিদ করে থাকেন ।
অন্য দিকে পত্র-পত্রিকাগুলেতে ঈদ উপলক্ষে ঈদ সংখ্যা নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে থাকেন। ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী ১সপ্তাহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে। ঈদের দিন ঘরে ঘরে সাধ্যমত বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের শহরগুলো হতে ঈদের ছুটিতে প্রচুর লোক নিজেদের আদি নিবাসে বেড়াতে যায়। এ কারণে ঈদের সময় রেল, সড়ক, ও নৌপথে প্র- ভিড় থাকতে দেখা য়াযদেখা যায়।
ঈদের গান
ঈদের চাঁদ দেখার সময়কার আনন্দমুখর পরিবেশকে নিয়ে লেখা ও সুর করা কাজী নজরুল ইসলামের “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” গানটি বেশ জনপ্রিয়। ঈদের দিনে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এই গানটি বাজানো হয়। বিশেষ করে ছেলে মেয়েরা অনেক আনন্দ করে,বন্ধু বান্ধবীর বাড়িতে দল বেঁধে বেড়াতে যায়।
(লেখক ইসলামী গবেষক.সভাপতি বিডি অনলাইন ইসলামী লেখক ফোরাম)