কবির নামের ঠিক বানান কোনটি

ইকবাল কাগজী
‘কয়লা ধোইলে ময়লা যায় না’ কিংবা ‘স্বভাব যায় না মইলে’। যে যা-ই বলুক, আমার ‘স্বভাব’টা গেলো না, যেমন ছিলো তেমনই রইলো। কেবল ‘দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া যাই’, যেমন আমাদের একজন কবির নাকি এমন স্বভাব ছিল। তিনি ‘দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া যাইতেন’।
একবার, সময়টা বোধ করি ১৯৯২ সালের পরে, বাবরি মসজিদের ‘সাম্প্রদায়িক’ দাঙ্গার রেশ ধরে সুনামগঞ্জে মন্দির ভাঙচুরের অঘটন ঘটার পর,  বাংলা উপন্যাসের চূড়ান্তস্পর্শী ঔপন্যাসিক, ‘খোয়াবনামা’র ¯্রষ্টা  আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সুনামগঞ্জে এসেছেন, লেখক শিবিরের আমন্ত্রণে। তখন সুনামগঞ্জের লেখক শিবিরের কর্ণধার ছিলেন বিখ্যাত মুতাসিম আলী। আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছিলো ‘বাংলাসাহিত্যে প্রতিবাদের ধারা’। প্রবন্ধ উপস্থাপক ছিলেন রজতকান্তি সোম মানস। এরকম কাজে তখন তিনি ছিলেন নিতান্তই যাকে বলে নতুন। প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর শুরুর দিকে ছিলেন সুনামগঞ্জের বিদগ্ধ আলোচকরা। তাঁরা প্রবন্ধকারকে সমালোচনার শাণিত কৃপাণ দিয়ে কেটে কুচিকুচি করলেন। আখতারুজ্জামান ভাষণ দিতে উঠে প্রথমেই যা বললেন তার মর্মার্থ ছিলো অনেকটা এরকম : আজ অন্যরকম কীছু বলবো বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে গেলো যে, সংঘটিত ব্যপারটাকে আর ছাড় দেওয়া  যায় না। তারপর প্রবন্ধকারের বক্তব্যের সমর্থনে চললো তাঁর দীর্ঘ  সারগর্ভ আলোচনা। বলাবাহুল্য আলোচনাটি যারপরনাই মনোমুগ্ধকর হয়েছিল।
এখানে ঘটনাটির উপস্থাপন করলাম এ জন্য যে, আখতারুজ্জামান সেদিন খেপে গিয়ে ছিলেন একটি যুক্তিসঙ্গত সাহিত্যিক মূল্যায়নকে খ-ন করার অকারণ প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার স্বভাবসুলভ দায়িত্ববোধ থেকে। বোধ করি ‘স্বভাব যায় না মইলে’ ব্যাধিটি তাঁর পুরোমাত্রায়ই ছিল। এভাবে কেউ না কেউ মাঝে মধ্যেই খেপে যেতে পারেন এবং সত্য সুন্দর ও স্বাধীনতার পক্ষে এভাবে দাঁড়ানোই মানুষের কর্তব্য। এভাবেই নজরুল খেপে গিয়ে একবারে বিদ্রোহী হয়ে উঠেন। প্রমাণ করেন খেপে যাওয়াই জীবনের নিয়ম।
একটি বিশেষ বিষয় প্রত্যক্ষ করে আমি খেপেছি কি না জানি না, তবে বিষয়টির কৌন্দর্যের  (‘সৌন্দর্য’ শব্দের একটি অনুগবয়ন, যার অর্থ কদর্য বা কুৎসিত) বিপক্ষে দাঁড়িয়ে অন্তত প্রতিবাদ না হোক দুয়েকটি কথা না বলে পারছি না। এই প্রচেষ্টাকে কেউ যদি খেপে যাওয়া বলে আত্মতৃপ্তিলাভে উৎসাহী হন আমার তাতে কোনও আপত্তি নেই, তা এমন মুফতে আত্মতৃপ্তি লাভে তিনি আগ্রহী হতেই পারেন।  ভুলে গেলে চলবে না যে, অসঙ্গতিকে ছেড়ে দেওয়া যায় না বা অসঙ্গতিকে বাড়তে দেওয়া সমীচীন নয়।
সুনামগঞ্জে ‘হাওর পাড়ের গল্প’ (এই ‘হাওর পাড়’ শব্দ বা শব্দবন্ধের বৈয়াকরণিক বিশুদ্ধতা নিয়ে আলাহিদা গল্প আছে। আপাতত এখানে তা অপ্রাসঙ্গিক)  হয়ে গেলো। গল্প বলিয়েরা অনেক অনেক কেচ্ছা শুনালেন। এই অনেক কেচ্ছার একটি কেচ্ছা বাউলকবি দুর্বিন শাহের নামের বানানবৈভিন্ন্য। কোনও ভাষায় কোনও একটি শব্দের বানানবৈভিন্ন্য বা অর্থ এক হলেও বানানের ভিন্নতা থাকতেই পারে বরং না থাকাটাই অস্বাভাবিক। বাংলাভাষায়ও  কোনও কোনও শব্দের বানানবৈভিন্ন্য স্বাভাবিকভাবেই স্বীকৃত, এতে অবাক হওয়ার কীছু নেই। কিন্তু কোনও মানুষের বা কোনও কবির নামের বানানবৈভিন্ন্য একটি অস্বাভাবিক বিষয়, ভাষাতাত্ত্বিক কোনও যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়। পৃথিবীতে কোনও  ব্যক্তির নামের একক বানান সেই ব্যক্তিটিকে সকলের চেয়ে আলাদা করে পরিচিত করে, এই পরিচিতি কোনও ব্যক্তির  অস্তিত্বের নির্দেশক। এখানে অর্থাৎ কারও নামের বানানে বৈভিন্ন্য উপস্থিত হলে ব্যক্তির একক পরিচিতির  প্রতিষ্ঠা বিঘিœত হয়, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে না বুঝিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অন্য কাউকে বুঝায়। শরৎ ও চন্দ্র এই দুই শব্দের সন্ধিসিদ্ধ  শব্দ শরচ্চন্দ্র এবং অসন্ধিসিদ্ধ শব্দ শরৎচন্দ্র। এদিক থেকে বিবেচনায় এই শব্দদ্বয়কে বলা যায়, একই শব্দের দুই বানান। কিন্তু শরচ্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামের বানান দিয়ে কখনওই কেউ বাংলাসাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে শনাক্ত করতে পারবেন না। মানুষের নামের বানানবৈভিন্ন্যর বিশেষ বিশেষত্ব এটাই, অর্থাৎ ভীষণ বিপর্যয়ের বাপ। কবি দুরবিন (যদি দুরবিনই তাঁর প্রকৃত নামের প্রথমাংশ হয়) শাহকে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার বানানবৈভিন্ন্যহীন একটি নাম ধারন করার মানবিক অধিকার থেকে বিচ্যুতকরণের অধিকার কারও নেই।               
কবির নাম সুমনকুমার দাশ লিখেছেন ‘দুরবিন’ (দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, ২৯ অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা : ০১, শিরোলেখ : দুর্বিন শাহ তাঁর গান, তাঁর কথা), মরতুজা আহমদ লিখেছেন ‘দূবর্বীণ’ (দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, ৩০ অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা : ০১, শিরোলেখ : প্রসঙ্গ দূবর্বীণ শাহ) এবং একটি পত্রিকা লিখেছে ‘দূর্ব্বীণ’ (শিরোলেখ : দ্বিতীয় দিনে দূর্ব্বীণ শাহকে স্মরণ, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, ২৯ অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা : ০১)। অন্য একটি পত্রিকাও ‘দূর্ব্বীণ’ বানান অনুসরণ করেছে।
কথা হলো, বানানের বৈভিন্ন্য থাকতেই পারে কিন্তু । ত্রিবর্ষ শব্দের সঙ্গে ইক (ষ্ণিক) প্রত্যয়যোগে নিষ্পন্ন  হতে পারে ত্রৈবার্ষিক, ত্রিবার্ষিক ও ত্রৈবার্ষিক এই তিনটি শব্দ এবং তারা কেউই পাণিনির ব্যাকরণবিধি লঙ্ঘন করেনি, সুতরাং অশুদ্ধতার পঙ্ক তাদেরকে স্পর্শ করে না। বাংলাভাষায় এমন বানানবৈভিন্ন্য সম্পন্ন শব্দ একবারে বিরল নয়, অনুসন্ধান করলে অনায়াসেই পাওয়া যেতে পারে। আরও উদাহরণ উপস্থিত করার প্রয়োজন দেখি না। কিন্তু কথা হলো আলোচ্য  ‘দুরবিন’ শব্দটি কেবল একটি শব্দ নয়, এই শব্দটি আমাদের একজন কবির নাম। এই কারণে এই শব্দটি যখন কবির নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হবে, তখন এই শব্দটির বানানবৈভিন্ন্য কোনও যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়।
শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে (সাহিত্য অকাদেমি) দুরবিন, দূরবীন ও দূর্ব্বীণ শব্দের কোনও ভুক্তিই নেই। সেখানে আছে দূরবীক্ষণ ও দূরবীণ। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে (বাংলা একাডেমী) দুরবিন, দূরবীন ও দূরবীক্ষণ শব্দত্রয়ের ভুক্তি আছে। দুক্ষেত্রেই অর্থের কোনও পার্থক্য নেই, যদিও অর্থবয়নে পার্থক্য আছে। সাহিত্য অকাদেমির অভিধানে অর্থ লেখা হয়েছে  ‘দূরবস্তুর দর্শনসাধন যন্ত্রবিশেষ’ ও বাংলা একোডেমির অভিধানে অর্থ লেখা হয়েছে ‘দূরবর্তী বস্তু স্পষ্টভাবে দেখার যন্ত্রবিশেষ’।
‘দূবর্বীণ’ বানানটির (ভুলে গেলে চলবে না, ‘বানান’ শব্দের অর্থ কিন্তু বর্ণবিশ্লেষণ) একটি কষ্টকর উচ্চারণ হতে পারে ‘দুর্ববিন’ এবং উচ্চারণের পর শ্রোতার মনে কোনও অর্থবোধের ব্যঞ্জনা উৎপন্ন না হবারই সম্ভাবনা বেশি। যে-কোনও বিবেচনায় এটি একটি স্পষ্ট নির্দিষ্ট বানানবিভ্রাট এবং বোধ হয় এটি একটি গুরতর মুদ্রণপ্রমাদও বটে। এটি নিয়ে এর বেশি কীছু বলার নেই। মুদ্রণক্ষেত্রে অনবধানতাবশত এমন ভুল হতেই পারে।   
বাংলা একাডেমির অভিধানে দুরবিন, দূরবিন, দূরবীক্ষণ শব্দত্রয়ের ভুক্তি আছে। অন্যদিকে সাহিত্য অকাদেমির অভিধানে দূরবীক্ষণ  ও দূরবীণ শব্দদ্বয়ের ভুক্তি আছে। ‘দূর্ব্বীণ’ শব্দের ভুক্তি দুই অভিধানের কোনওটাতেই নেই। অন্য অভিধানে উঁকি মারার অবকাশ অবশ্য ছিল না বলে দুঃখিত। বাঙলা একাডেমির অভিধানে দুরবিন ও দূরবিন শব্দদ্বয়ের উৎস দেখানো হয়েছে ফারসি। দূর্ব্বীণ শব্দটিতে রেফ (র্  )-য়ের পরে বর্ণের দ্বিত্ব হওয়ার প্রাচীন ও অধুনা বর্জিত বানানরীতির অনুসরণ পরিলক্ষিত হয়। স্বনামের বানান লেখার সময় কবির এইরূপ কথিত বানানরীতি অনুসরণের পশ্চাৎপদতা উপস্থিত ছিল কিনা, অর্থাৎ কবি তাঁর নামের বানান ‘দূর্ব্বীণ’ লিখতেন কিনা সেটা জানা দরকার। এমতাবস্থায় অভিধান অনুসরণে কবির নাম ‘দুরবিন’ হওয়াই সবচেয়ে সমীচীন। কেউ ভিন্নমত পোষণ করতেই পারেন। আর সে ভিন্নমতদ্বারা নির্দিষ্ট বানানটাই হয়তো কবি অনুসরণ করতেন, এমনও হওয়া বিচিত্র নয়। তারপরেও কোনওরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে কবি কোন বানানটিকে স্বনাম লেখার ক্ষেত্রে অনুমোদন করেছিলেন।
আমার জানি, বরুণ রায় ও রাধারমণের ক্ষেত্রে তাঁদের নামের স্বঅনুমোদিত  বানান অমান্য করে ‘ণ’-য়ের স্থলে কোথাও কোথাও ‘ন’ লেখা হয়। সেটা কোনও অর্থেই কাম্য হতে পারে না। নামের এইরূপ বানানবিকৃতি এইসব মহামানবদের অমর্যাদা করা ভিন্ন অন্য কীছু নয়। এই অবিমৃষ্যকারিতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
এবং যে যা-ই বলুন না কেন, পরিশেষে প্রশ্ন থেকেই গেলো, কবির নামের ঠিক বানান কোনটি?