বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর জেলার চার উপজেলায় ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনের খবর প্রকাশ হওয়ায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রথমে জামালগঞ্জ উপজেলা কমিটি গঠনের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এবার তাহিরপুর, জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের খবর পাওয়া গেছে।
তবে ওই চার উপজেলা ছাত্রলীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। শুধুমাত্র বিভিন্ন মাধ্যমে শুনছেন নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে। জগন্নাথপুর উপজেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির কপি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে প্রকাশ করেছেন সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী। বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি পেছনের তারিখ দিয়ে এককভাবে কমিটি অনুমোদন দিচ্ছেন এই খবর জানাজানি হলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফজলে রাব্বী স্মরণের একক স্বাক্ষরিত কমিটির দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কমিটির দায়িত্বশীল এক নেতা নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন, ‘এসব কমিটি গঠন ভিত্তিহীন। তাদের ওই কমিটিতে স্মরণ একাই স্বাক্ষর করেছেন। সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষর করেন নি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর ছাড়া কমিটি গঠন হয় কিভাবে।
তাহিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কমিটি গঠন নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। সভাপতি কমিটি গঠনের সত্যতা নিশ্চিত করলেও সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন এখনও কমিটি গঠন হয়নি। এদিকে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের নতুন উপজেলা ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল পদে বিবাহিত, অছাত্র, হত্যা মামলা আসামীরা রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই ।
জানা যায়, জগন্নাথপুরে সাফরোজ ইসলাম মুন্নাকে সভাপতি ও রুমেন আহমদেকে সাধারণ সম্পাদক, সায়েক উদ্দিন, ইসলাম উদ্দিন জসিম ও ফরহাদ আহম্মদকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৯১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক বছর মেয়াদী এই কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশিত কমিটিতে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফজলে রাব্বী স্মরণের স্বাক্ষর থাকলেও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমদ চৌধুরীর কোন সাক্ষর নেই। এছাড়া দলীয় প্যাডে প্রকাশিত একটি কমিটিতে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির স্বাক্ষরের কোন তারিখ নেই। তবে ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন ১০ জানুয়ারির তারিখে কমিটির অনুমোদন দেখানো হয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা ছাত্রলীগের নবগঠিত কমিটির সভাপতি দাবিদার সাফরোজ ইসলাম জানান, গত ১০ মার্চ সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপজেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির অনুমোদন করেছেন। অনুমোদিত কমিটির কপি তাদের হাতে রয়েছে। ফেইসবুকে প্রচারিত দুই কমিটির একটি কমিটিও সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন,‘বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্য ফেইসবুকে দুইটি ভুয়া কমিটি প্রচার করেছে।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে রয়েল মিয়াকে সভাপতি, শাহান আহমদকে সিনিয়র সাধারণ সম্পাদক ও ইমরান আহমদ তালুকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে উপজেলা ছাত্রলীগের ৯১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে রয়েলে মিয়া হাইস্কুল পর্যন্ত লেখাপড়া করেননি এবং তিনি বিবাহিত। এছাড়া নিজ গ্রামের (বগলাকাড়া দেবগ্রামের) সমছু মিয়া হত্যা মামলার অন্যতম আসামী তিনি। একইভাবে সাধারণ সম্পাদক ইমরান আহমদ বিবাহিত। বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন তার স্ত্রী। পরে ওই মামলাটি আপোশে নিস্পত্তি হয়েছে।
নতুন কমিটির সভাপতি দাবিদার রয়েল মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান আহমদ তালুকদার নিজেকে অবিবাহিত দাবি করে বলেন,‘আমরা অবিবাহিত, আমরা এখনও বিয়ে করিনি। আমাদের কমিটি বৈধ কমিটি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় আমাদের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখ আমাদের কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন। এখন অস্বীকার করলে করার কিছু নেই। ’ কোন প্রতিষ্ঠানে লেখা-পড়া করেছেন জানতে চাইলে রয়েল মিয়া সঠিক জবাব দিতে পারেননি।
তাহিরপুরে আহছানুজ্জামান শোভনকে সভাপতি ও আবুল বাশারকে সাধারণ সম্পাদক করে উপজেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে শনিবার বিকালে উপজেলা সদরে আনন্দ মিছিল করেছে উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
আহছানুজ্জামান শোভন বলেন,‘ আমাদের কমিটি নতুন কমিটি নয়। এটা চলমান কমিটি, গত তিনমাস আগেই আমাদের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমি সভাপতি ও আবুল বাশার সেক্রেটারি।’ কত সদস্য বিশিষ্ট কমিটি এবং কবে কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘কাগজ না দেখে তারিখ বলা যাবে না। কমিটির কাগজটি ঢাকায় রয়েছে।’
তবে আবুল বাশার বলেছেন,‘এখন পর্যন্ত কমিটি অনুমোদন হয়নি। কমিটি গঠনের কোন কাগজপত্র আমি পাইনি। আমি উপজেলা কমিটির সভাপতি প্রার্থী। শনিবার নেতাকর্মীদের দিয়ে মিছিল করিয়েছেন শোভন। আমি এসব বিষয়ে কিছু জানি না।’
একইভাবে জামালগঞ্জে আলমগীর কবিরকে সভাপতি, আরিফ আলম লিমনকে সাধারণ সম্পাদক, সিরাজ মিয়া ও রেজাউল করিম (বাবু) কে সহ সভাপতি, নুরুল আমিন, নাফি, পাপ্পু আচার্য্য ও সজল হাসানকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মাহবুব এলাহি, শফিউল আমিন (লিমন), শ্যামল হুসাইন (শিমু) ও মেহেদি হাসান হিরাকে সাংগঠনিক সম্পাদক, সাদ্দাম হুসেনকে প্রচার সম্পাদক ও তামীম রহমান চৌধুরীকে উপ দপ্তর সম্পাদক করে ৬১ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর কবির বলেন,‘গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ৬১ সদস্য বিশিষ্ট জামালগঞ্জ উপজেলা কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন। আমাদের কাছে কমিটি আছে।’
জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদ সুজন বলেন,‘জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর একের পর এক উপজেলা কমিটি গঠনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় আমরা বিব্রতরকর অবস্থায় আছি। সাধারণ নেতাকর্মীরা কঠোর সমালোচনা করছেন। এভাবে পেছনের তারিখ দিয়ে কমিটি অনুমোদনের কোন নিয়ম-নীতি নেই। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাসে এসব ঘটনা হয়েছে বলে আমি শুনিনি। কমিটি গঠনের তারিখ অনেক আগের উল্লেখ করে এখন প্রকাশ করার ঘটনা খুবই রহস্যজনক।
চার উপজেলায় ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন ও গঠনের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন,‘জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক এককভাবে কোন কমিটি অনুমোদন দিতে পারেন না। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে এধরনের কোন নীতিমালা নেই। কেউ যদি কোথাও এধরনের কমিটি গঠন ও বা অনুমোদন দিয়ে থাকেন তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভুয়া। এসব কমিটি নিয়ে কারো বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই।’
এ ব্যাপারে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফজলে রাব্বী স্মরণ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার আগেই এসব কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সকল কমিটিই জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে দেয়া হয়েছে।’ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিক আহমদ চৌধুরীর স্বাক্ষর না করার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন,‘ রফিক একেক সময় একেক কথা বলে।’
তবে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার দুই দিন আগে গত ৯ মার্চ বৃহস্পতিবার সম্মেলন প্রসঙ্গে জেলা কমিটির সভাপতি ফজলে রাব্বী স্মরণ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছিলেন,‘ কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকায় উপজেলা কমিটি গঠন শেষ করতে পারিনি।’


