শাহ্ মীম
অনেক জানা কথার মাঝে চলে আসে অজানা কথা-অনেক অচেনা, অশুনা কথার মাঝে উদয় হয় অনেক জানা কথা। মনে হয় এসব কথাতো আমি জানি। এসব কথা আমার মনে গাঁথা ছিল অনেক আগে থেকে শুধু শোনারই অপেক্ষা ছিল। সাধক আব্দুল করিম এর জন্ম ১৯১৬ সালের ২৫শে ফেব্র“য়ারী দিরাই এর ধল আশ্রম গ্রামে। পিতা ইব্রাহিম আলী। মাতা নাইয়র জান বিবি। ছোট বেলা তাঁর কাটে গরু রাখার মতো কঠিন অমানুষিক পরিশ্রমের কাজে। পরবর্তী জীবন তাঁর কাটে দোকান কর্মচারী হিসাবে কাজ করে। যৌবন শুরু ঘেটু গান-মাল জোড়া বাউল গানকে কেন্দ্র করে। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। গান রচনা সুর করা আর গান গাওয়া নিয়েই কর্মব্যস্ত জীবন পার করে দিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণ ২০০৯ সনের ১২ই সেপ্টেম্বর রোজ শনিবার সকাল ৮ ঘটিকা। করিম পীরছাব তাঁর জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন মানুষকে ভালবেসে। তেমনি মানুষের ভালোবাসায় তিনি সিক্তও হয়েছেন। মানুষকে তিনি উজার করে ভালবেসেছেন। মানুষের ভালবাসা, ভাব, ভক্তি তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, মুক্তি এগুলো ছিল তাঁর রচনার মূল উপজীব্য বিষয়। এদের কেন্দ্র করেই তাঁর অধিকাংশ গান। তাঁর গানে রয়েছে নিগুঢ় তত্ত্বের মতো বিষয়। শাহ্ আব্দুল করিমের জীবনে আমরা দেখতে পাই সাধারণ মানুষের শুধুমাত্র আনাগোনা নয়। তাঁর জীবনে সাক্ষাত হয়েছে অনেক অসাধারণ মানুষেরও- তাঁদের নৈকট্যে এসে করিম পীরছাবও হয়ে গেছেন অসাধারণ গুণীন, বলিষ্ট মানবতাবাদী, সাধক, দার্শনিক অনেক কিছু। করিম পীরছাব ছিলেন একজন দীক্ষা প্রাপ্ত সাধক। তাঁর মুর্শীদ ছিলেন উকারগাঁও নিবাসী মাওলা বক্স মুন্সী এবং তাঁর পীর ছিলেন শ্রীপুর বিশ্বনাথ নিবাসী হযরত ইব্রাহিম শাহ্ মাস্তান। এছাড়াও তিনি ঘনিষ্ট সাহচর্যে এসেছিলেন সৈয়দ আলী সাব এর মতো আধ্যাত্ম পুরুষ এবং ঘনিষ্টতা ছিল জগন্নাথপুরের চেরাগ আলী শাহ্ এর সাথে। করিম পীরছাব ছিলেন একান্তই গুরুভক্ত। তাই তাঁর বালক ও ভক্তের সংখ্যা ছিল প্রচুর। করিম পীরছাব এর শেষ জীবন ছিল স্মৃতি ভ্রষ্ট অবস্থায়। শেষ জীবনে তাঁর কয়েকটি নামই শুধু স্মৃতি ফলকে আঁটা ছিল। এদের মধ্যে বাবুল (নিজ ছেলে) নূরজালাল, মহুরীর বেটা উরফে খেলু, জলসুকার আব্দুর রহমান, বানিয়াচংয়ের নূরুন নেছা (তাঁর প্রিয় শিষ্যা) এবং সর্বশেষ দুখু (তাকে) তিনি নিজেই লালন পালন করে বড় করেছিলেন। আমি যদ্দূর জানি এই নাম গুলি ছাড়া অন্য কারো নাম তাঁর স্মৃতিতে ছিলনা। তাঁর বালকদের মধ্যে বিলাল উদ্দিন ছিল অন্যতম। তাঁর বিবাহিত জীবনের বারটি বছর পার হয়ে গেল কোন বাচ্চা কাচ্চার মুখ দেখতে পেলনা। সে তার পীর ছাবকে জিজ্ঞেস করলেই বলতেন ‘হবে হবে’। মনমড়া অবস্থায় চিকন এক বেদনা নিয়ে বিলাল উদ্দিন এর বেঁচে থাকাই দায় ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর পীর করিম পীরছাব এর কথাই সত্যি হল। বিলাল উদ্দিন এর তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সুখের সংসার। সে সব সময় বলে বেড়াতো আমার মুর্শীদ করিম পীরছাবের দোয়ায় এসব হয়েছে। করিম পীরছাবের আরেক বালকের নাম আব্দুল মতলিব। পাগলার আসামপুর বাড়ী। আব্দুল মতলিব ও তাঁর স্ত্রী মাটি কাটতো তাদের দুঃখে, কষ্টে দিন কাটত। করিম পীরছাব তাকে দেখলেই বলতেন “তোরও সুখের দিন আসবে- চিন্তা করিস না”। সত্যিতেই দেখা গেল সে একদিন চলে গেল সৌদি আরবে। যাওয়ার কিছুদিন পর নিয়ে গেল তার এক ছেলে ও মেয়ের জামাইকে। সত্যিকার অর্থেই আব্দুল মতলিবের দিন আনন্দ ও সুখে কাটছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মহুরীর বেটা উরফে খেলু ভাইয়ের কথা। খেলু ভাই ও তার স্ত্রী দুজনেই তারা করীম পীরছাব এর মুরীদ ছিলেন। উনাদের বাসায় দিরাই এলে থাকতেন এবং যাবার সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে বলতেন “তোমরা কি রকমে চলতায়-এর মাঝে আরো ঘর ভাড়া-চিন্তা করি তোমরার কথা-“মুর্শীদে চালাইবানে”। এখন খেলু ভাই ও তাঁর স্ত্রী আল্লাহর রহমতে সুখেই আছেন। করিম সাবের মুখে শোনা যায় সৈয়দ অলী সাহেবের কথা, যদ্দূর জানা যায় তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর (অবঃ) ক্যাপ্টেন ছিলেন। আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত ওই উঁচুতে। তিনি সৈয়দ শাহ্ নূর সাহেবের ছেলের দিকের পন্থী ছিলেন। করীম পীরছাব এর ভাষ্য মতে ধল ও তাড়লে সৈয়দ আলী সাহেবের অনেক মুরীদান ছিল, সেখানে তিনি মাঝে মাঝে আসতেন এবং মুরীদানের দেয়া কই মাছ কাঁটা সহ খেয়ে ফেলতেন। সৈয়দ আলী সাব ছিলেন শীর্ষ ফকিরদের অন্যতম। ধল এর এক ভদ্রলোক প্রায়শঃই করিম পীর ছাবকে ঢং করে বলতেন, পীরছাব ছেলের বিয়ে দিবেন না? উত্তরে করিম সাব বলতেন ‘হবে হবে’। ধল এর ওই ভদ্রলোক বলতেন আপনার ঘরে এনে কি মেয়ে বিয়ে দিয়ে যাবে? করিম সাব বলতেন “মুর্শীদ চাইলে ঘরে এনেই মেয়ে দিয়ে যাবে”। এই কথাটাই সত্যি হল বাবুলের জীবনে বায়ান্ন নম্বর বিয়ের কথাবার্তা ভেঙ্গে যাওয়ার পর তেপ্পান্ন নম্বর বিয়ে ঘরে এনেই মেয়ে দিয়ে ছিল বাবুলের শশুর বাড়ীর লোক জন। বাবুলের শুশুরের নামও ছিল আব্দুল করিম। শাহ্ আব্দুল করিম ছিলেন কালজয়ী আধ্যাত্ম পুরুষ। কালকে তিনি জয় করেছেন অনায়াসে- সময়কে তিনি বন্ধন করেছেন আপন নিয়মে- স্থান, কাল পাত্রকে বেঁধে দিয়েছেন নিজস্ব এক মোহনীয় ভঙ্গিমায়। সময়েকে থিতু করে দিয়েছেন আপন আঙুলি হেলনে। সাম্প্রদায়িকতাকে দেখিয়েছেন বুড়ো আঙ্গুল। এর উর্ধ্বে ওঠে গান রচনা করেছেন, হয়েছেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশ খ্যাত এই জনপ্রিয় গানটির কথাই ধরা যাক।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান ঘাটু গান গাইতাম ॥
বর্ষা যখন হইত গাজির গান আইত
রঙ্গে ঢঙ্গে গাইত আনন্দ পাইতাম
বাউলা গান ঘাটু গান আনন্দের তুফান
গাইয়া সারিগান নাও দৌড়াইতাম ॥
হিন্দু বাড়িন্ত যাত্রাগান হইত
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম
কে হবে মেম্বার কে হবে গ্রাম সরকার
আমরা কি তার খবর লইতাম।
বিবাদ ঘটিলে পঞ্চাইতের বলে
গরিব কাঙালে বিচার পাইতাম
মানুষ ছিল সরল ছিল ধর্মবল
এখন সবাই পাগল বড়লোক হইতাম ॥
করি ভাবনা সেদিন আর পাবনা
ছিল বাসনা সুখী হইতাম
দিন হতে দিন আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম ॥
(কালনীর ঢেউ)
অজানা অচেনা পথ ধরে হাটা যেমন আনমনা পথিকের স্বভাব, নিগুঢ় পথে হাটা তেমনি আরীফ লোকের আজন্ম স্বভাব, স্বরূপ সন্ধানে যেমন ব্যস্ত থাকেন স্বরূপ সাধনে লিপ্ত সাধু পুরুষ- ঠিক তেমনি ভাবজাত ভেসে, বেড়ায় বাউল আব্দুল করিমের সাদামাটা জীবনে। আমাদের নিকট পরিলক্ষিত হয় সেই পরম সত্যের স্বরূপ তপোধীর ভট্টচার্য্য উত্থাপন করেন সম্পূর্ণ ভিন্নতায় অথচ তা কত যুক্তিসঙ্গত জিজ্ঞাসা আমরা, নাগরিক অন্ধ ও বধির জনেরা, “বাউল করিমের প্রাণ-খুলে গাওয়া গান শোনার মতো কান কি অর্জন করেছি আদৌ”? লোক গানের তরুণ সমঝদার সাইমন জাকারিয়ার ধারনা আবহমান বাংলা গানের ধারনায় করিম সংযোজন করেছেন “ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপূর্ব সংমিশ্রণ”। তাঁর মতে শাহ্ আব্দুল করিমের এক একটি গানের বাণীতে এবং সুরের মোহনায় এক সঙ্গে এসে মেশে এদেশের সাম্প্রতিক সময় ও সহস্র বছরের লালিত প্রাণের ধারা। বসন্ত যখন জাগ্রত হয় কৃষ্ণ চুড়ার ডালে ডালে ফুটে ওঠে ফুল। কোকিল ডেকে ওঠে কুহু স্বরে। প্রকৃতি আবীর ছড়ায় চতুর্দিকে। ভেসে আসে ফুলের গন্ধ। সেই ফুল করিম শাহর বাড়ীতেই ফুটুক বা আবার তা হতে পারে তাঁর বন্ধুর বাড়ী। ফুলের গন্ধে কোন ভিসা জটিলতা বা ইমিগ্রেশন নাই তা ভেসে আসতে পারে করিম শাহর নিজ বাড়ী থেকে। তাইতো এমন নিপুণ রচনা ওঠে আসে তাঁর হাতে
বসন্ত বাতাসেও সইগো বসন্ত বাতাসে
বন্ধুর বাড়ীর ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে
সইগো বসন্ত বাতাসে ॥
বন্ধুর বাড়ীর ফুল বাগানে নানা বর্নের ফুল
ফলের গন্ধে মনানন্দে ভ্রমরা আকুল
সইগো বসন্ত বাতাসে ॥
বন্ধুর বাড়ির ফুলের টঙ্গি বাড়ির পূর্বধারে
সেথায় বসে বাজায় বাঁশি মন নিল তার সুরে
সইগো বসন্ত বাতাসে ॥
মন নিল তার বাঁশির গানে রূপ নিল আঁখি
তাইতো পাগল আব্দুল করিম আশায় চেয়ে থাকি
সইগো বসন্ত বাতাসে ॥
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর এক লেখায় শাহ্ আব্দুল করিম সম্পর্কে উল্লেখ করেন “শাহ্ আব্দুল করিম ছিলেন গণ-মানুষের বাউল। তাদের দুঃখের দিনের কান্ডারী শ্রেষ্ট বাঙালিদের একজন। তিনি বেঁেচ রইবেন অনেকগুলো পরিচয়ে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি যে একজন বাঙালি এবং বিশ্বমানব ছিলেন সে পরিচয়টি আমাদের অত্যন্ত অনুপ্রেরণা দেবে, যেমন দেবে তাঁর বাউল সাধনার গান গুলো”। এখানে একটা বিষয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সাথে বলতে চাই শাহ্ আব্দুল করিম কস্মিন কি কদাচ গণ-মানুষের বাউল ছিলেন না। তিনি গণ-মানুষকে ভালবেসে গেছেন- তারাও তাকে ভালবেসেছে মন প্রাণ উজার করে। প্রকৃত অর্থে শাহ্ আব্দুল করিমকে বলা যায় ‘মানুষদের বাউল’ তিনি নিজেও যাবার সময় মানুষ হয়ে বিদায় নিয়েছেন এবং মানুষ হওয়ার জন্য এসব রচনা তিনি মানুষের জন্য লিখে গিয়েছেন। কারণ শাহ্ আব্দুল করিমের মধ্যে ‘মান এবং হুশ’ দুটোই বিদ্যমান ছিল। এজন্যেই তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
লেখনী তথ্য:-
শাহ্ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র সংকলন ও সম্পাদনা- শুভেন্দ্র ইমাম
লেখক পরিচিতি :-
সুনামগঞ্জ জেলা বারের বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী
ও
কবি জেসাস শামীম।


