বিশেষ প্রতিনিধি
করোনার কারণে সুনামগঞ্জের ‘শিক্ষা সংগ্রামীরা’ মানসিক চাপে পড়েছে। বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীরাই এক্ষেত্রে সংকটে বেশি। পড়াশুনার খরচের পাশপাশি টিউশনি’র আয় দিয়ে যারা মা-বাবা ভাই বোনের সংসার চালায় এরা এই সময়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। শিক্ষাবিদরা বলেছেন, সরকারিভাবে এবং বিত্তবানরা এদের সহযোগিতায় এগিয়ে না আসলে, এরা অনেকেই হতাশায় বিপথেও চলে যেতে পারে।
জেলার ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের বিল্লালপুরের শিক্ষা সংগ্রামী মো. মুনসুর আলম সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। করোনার এই সংকটকালে নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে মুনসুর বললো, তার মতো শহর এবং গ্রামাঞ্চলে আরও অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের চোখে মুখে এখন কেবল হতাশার ছাপ।
মুনসুর জানালো, তার বাবা শফিকুল ইসলাম বর্গাচাষী। মা খোদেজা বেগম গৃহিনী। তারা ৫ ভাই এক বোন। বড় ভাই কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে ফিনান্স এ- একাউন্টিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আরেক ভাই হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। গ্রামে থাকা আরেক ভাই আলমগীর হোসেন ও বোন শাপলা আক্তার এবার এসএসসি উত্তীর্ণ হয়েছে। ভর্তি হবে কলেজে। আরেক ছোট ভাই মাদ্রসায় পড়ছে। তাদের বাবার সামর্থ নেই পড়ালেখার খরচ চালানোর। বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া তারা তিনভাই-ই নিজের পড়াশুনার খরচ নিজেরা চালানোর পাশপাশি, বাড়িতে থাকা বাবা, মা, ভাই বোনের সংসার চালানোর দায়িত্ব পালন করে।
মেডিকেল কলেজ পড়–য়া ভাইটি জাতীয় চক্ষু হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহীন রেজা চৌধুরী’র সহযোগিতায় ঢাকার ‘দৃষ্টি উন্নয়ন সংস্থা’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা পাওয়ায় দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে। সে নিজের খরচ চালিয়েও এই টাকা থেকে গ্রামে সংসারের খরচ চালাতে সামান্য টাকা পাঠায়। সংকটে পড়েছে সে ও তার কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া বড় ভাই আশরাফুজ্জামান।
মহামারি করোনার শুরুতেই তারা দুই ভাই যেখানে টিউশনি করতো সেই অভিভাবকরা জানিয়ে দেন, এখন আর পড়াতে হবে না। এরপর দুই ভাই চলে আসে গ্রামে। মেডিকেল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মেডিকেলে পড়–য়া ভাই জাহিদ হাসানও গ্রামে চলে আসে। গ্রামে এসে তিন ভাই, গ্রামে থাকা আরেক ভাই এবং বাবা মিলে ধান কাটার দল গঠন করে। বাবার বর্গা জমির ধান নিজেরাই কেটেছে। পরে গ্রামের অন্যদের জমি ভাগে ও নগদ টাকায় কেটে দিয়েছে।
বৈশাখের পর যতই দিন যাচ্ছে, মানসিক চাপ বাড়ছে মুনসুর ও আশরাফুজ্জামানের।
মুনসুর জানালো, মার্চের এক তারিখে তার টিউশন শুরু হয়, মাস শেষ করার আগেই লকডাউনের জন্য বাড়ি এসেছে, টিউশনির টাকাও পায় নি। ম্যাচের ভাড়াও দিয়ে আসতে পারে নি। একই অবস্থা ভাই আশরাফুজ্জামানেরও। দুই ভাই দুটি করে টিউশনি করতো, মাসে সাড়ে ৬ হাজার টাকা পেতো। তিন মাস হয় বাড়িতে আছে তারা। ম্যাচের ২০০০ হাজার টাকা করে মাসে বকেয়া হচ্ছে। টিউশনি থাকবে কী-না, সেটাও অনিশ্চিত। ঈদের সময় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তারা (অভিভাবকরা) যাবার জন্য বলে নি।
মুনসুর বললো, ৮ হাজার টাকা ম্যাস ভাড়া বকেয়া হয়েছে। এই টাকা কীভাবে দেব। এই দুশ্চিন্তার পাশাপাশি টিউশনি ছুটলে নতুন করে কীভাবে টিউশনি পাই এসব চিন্তা ভর করছে। বাড়িতেও এখন আয় রোজগার করার মতো কোন কাজ নেই। পানি এসেছে, চিন্তা করছিলাম জাল- নৌকা হলে বাবাকে নিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করা যায় কী-না। কিন্তু বিশ^ বিদ্যালয় খুললে ক্লাস করার জন্য চলে যেতে হবে। সব মিলিয়ে কী করবো বুঝতে পারছি না।
হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যারা সংগ্রাম করে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখে, তাদের বেশির ভাগই এই সংকটে পড়েছে।
একইভাবে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার নবীনগর এলাকায় ভাড়া বাসায় মা, দুই ভাই ও এক বোনকে নিয়ে থাকেন কানু বর্মণ। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কানু চারটি টিউশনি করে মাসে ১২ হাজার টাকা আয় করতেন। ৩ মাস হয় তার টিউশনি বন্ধ। সামান্য কিছু টাকা জমানো ছিল, তাও এই লকডাউনের সময়ে খরচ করায় এখন হাত একেবারে শূন্য। এক ভাই মাছ ধরে বিক্রি করে যা পায়, ঘর ভাড়াসহ সংসারের খরচ চালাতে পারছে না।
কানু বললো, কারো কাছে চাইতেও পারছি না, আবার জীবন বাঁচানোও কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসে অসহায়ের পাশে আমরা, সুনামগঞ্জ’এর পক্ষ থেকে বাসায় এসে ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন এক বড় ভাই। এই সময়ে সামান্য হলেও কাজে লেগেছে টাকাগুলো। টিউশনি শুরু করতে না পারলে কী করে চলবো, বুঝতে পারছি না।
কানু জানালো, কেবল নবীনগরেই আরও ৮-১০ জন অনার্স ও ডিগ্রি পড়–য়া শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা টিউশনি করে নিজের পড়াশুনার খরচ চালানোর পাশপাশি সংসারও চালান।
করোনাকালে সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে সহায়তা কার্যক্রম চালিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অসহায়ের পাশে আমরা, সুনামগঞ্জ।
এই সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা বিটিভি’র সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট আইনুল ইসলাম বাবলু জানালেন, সংকটে পড়া মানুষদের মধ্যে টিউশনি করে যারা পড়াশুনা করেন আবার সংসারও চালান, এসময়ে তারা অনেক চাপে পড়েছেন। তিনি মনে করেন, বিত্তবানরা এদের সহযোগিতায় এগিয়ে না আসলে, হতাশায় পড়বে এরা।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসর প্রাপ্ত অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন,‘সরকার করোনাকালে বহু ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে, আমি মনে করি যেসব শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবনেই নিজের ও পরিবারের জীবীকার চিন্তা করছে। এসব শিক্ষা সংগ্রামীদের নানা মাধ্যম থেকে তালিকা করে প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। না হয় চরম হতাশায় পড়ে বিপথগামীও হতে পারে এরা।


