স্টাফ রিপোর্টার
করোনা মহামারিতে শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানসহ সবখানে এক ধরনের সংকট। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোগান্তি ও চ্যালেঞ্জটা অন্যদের চেয়ে বেশি। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত বছরের ১৭ই মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পর দফায় দফায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সবশেষ ঘোষণায় আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়ালেখা প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ। যার কারণে অনেকটা ঘরবন্দী রয়েছে শিশুরা। এছাড়াও করোনাকালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও নজর দেয়া জরুরি হয়ে গেছে। দরিদ্র প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোও জীবিকা সংকটে রয়েছে সবচেয়ে বেশি।
প্রতিবর্ন্ধী শিশুদের অভিভাবকরা জানান, একঘেয়েমি জীবন বিরক্তিকর মনে হওয়াসহ বেশকিছু কারণে ধীরে ধীরে তারা মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এরকম পরিস্থিতিতে তাদের সঠিক মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। অনলাইনে ক্লাসের ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মোবাইলে আসক্তি বাড়ছে। এ ধরণের আচরণগত পরিবর্তন শিশুদেরকে মহামারি পরবর্তী জীবনেও তাদের খাপ-খাইয়ে নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে।
জানা যায়, ২৫ জন প্রতিবন্ধী শিশু ও ১০ জন শিক্ষক নিয়ে সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পরিকল্পনা মন্ত্রী (তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী) এমএ মান্নান। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর সুনামগঞ্জ জেলা পুরাতন ক্রীড়া সংস্থার কার্যালয়ে (অস্থায়ী ক্যাম্পাস) শ্রেণি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনতে ও শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে জেলা প্রশাসনের পরিচালনায় স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৭ নভেম্বর সুনামগঞ্জ অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের স্থায়ী ক্যাম্পাসে মো. নূরুল হক ভবন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম। বর্তমানে এই স্কুলে ৮০-৯০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। পড়াশোনায় যারা ভালো করছে তাদেরকে যুক্ত করা হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও মিউজিক্যাল থেরাপি দেওয়া হচ্ছে অটিস্টিক শিশুদের। শেখানো হচ্ছে ছবি আঁকা ও খেলাধুলা। যাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাদের জন্য রয়েছে ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থাও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বও দেখিয়েছে স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষকরা জানান, স্কুলে ৮০ থেকে ৯০ জন ছাত্র ছাত্রী রয়েছে। তাদেরকে গান, কবিতা, নাটক খেলাধুলার মাধ্যমে আনন্দ দিয়ে শিক্ষা প্রদান করা হয়। অনেক ছাত্র ছাত্রীরা আছে কিছু করতে পারে না তাদের কে বাথরুম ব্যবহার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, বড়দের সালাম দেওয়া, সবার সাথে কথা বলা, নিজে পরিচয় দেয়া, রান্না শিক্ষা সহ দৈনন্দিন জীবনে আবশ্যকিয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রদান করা হয়। অনেকে আছে সুন্দর গজল গাইতে পারে, কেউ নাচতে পছন্দ করে, কেউ খেলতে পছন্দ করে, কে কেউ আবার রং তুলি দিয়ে ছবি আঁকতে পছন্দ করে। যে যা ভালোবাসে সেই দিয়ে তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু প্রতিভা থাকে সেই প্রতিভাকে জাগ্রত করাই মূল লক্ষ্য আমাদের।
সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের ছাত্র ছাকিবুল ইসলাম ইমন’র মা আলেয়া বেগম বলেন, আমার ছেলে সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়ে। স্কুলে গেলে পড়াশোনাসহ বিভিন্ন সহ শিক্ষা কার্যক্রমে তার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকতো। করোনার জন্য অনলাইনে ক্লাস হয় আবার বন্ধও হয়। অনলাইনের ক্লাসে পড়াশোনা বুঝতে কষ্ট হয় তার। স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ নেই। স্কুল খুলে দিলে ভালো হতো আমাদের ছেলে মেয়েদের জন্য।
সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল ছাত্রি সাঈদা আক্তার বেবী’র মা মোছা. সাহেরা বেগম বলেন, আমার মেয়ে স্কুল চলাকালীন মোটামুটি চলাফেরা ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। দীর্ঘ দেড় বছর স্কুল বন্ধ থাকায় এখন খুব সমস্যা হচ্ছে। স্কুল খোলা থাকার সময় নিয়ম করে সকালে উঠে স্কুলে যেতো। কথা শুনতো। এখন স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বেলা ১১টায় উঠে। স্কুল বন্ধ থাকার দোহাই দেয়। ঘরে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে পড়েছে। রাগও বাড়ছে, কথা শুনে না, পড়াশোনাও করে না। মেয়েটাকে নিয়ে মহা বিপদে আছি।
তিনি বলেন, স্কুলে গেলে স্যারদের কথা শুনতো, খেলাধুলা করতো, স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী বাড়ীতে চলাফেরা করতো। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় সমস্যা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাফাত উল হক চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে সুনামগঞ্জ অটিস্টিক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলও বন্ধ হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা জিরোতে চলে আসছে। আমাদের কিছু করার নেই। সরকার থেকে ঘোষনা আসলেই নতুন করে আবার স্কুলের ক্লাস শুরু হবে।
তিনি বলেন, স্কুল খোলা থাকলে আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের আনন্দঘন পরিবেশের মাধ্যমে শিক্ষা দিতাম। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাতাম। তাদের সাথে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছি।


