স্টাফ রিপোর্টার
কেউ খেলার ছলে, কেউ বা বন্ধুর সঙ্গে মিশে ছোটখাটো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এদের বিরুদ্ধে চুরি—মারামারির মামলা হওয়ায় কেউ কেউ জেল কেটেছে। কেউবা তারিখে তারিখে আদালতে এসে হাজিরা দিতে হতো। অপরাধি হিসাবে হাজিরা দেওয়ার সময় কোমলমতি শিশুদের যেমন মন খারাপ হতো। অভিভাবকরাও বিব্রত ও লজ্জিত বোধ করতেন। জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে আদালত এমন ৭০ শিশু অভিযুক্তদের সংশোধনের জন্য বাবা মায়ের কাছে ফেরত পাঠালেন। বিচারকের নির্দেশে ওদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা, ফুল আর ডায়রি তুলে দিলেন আদালতের কর্মীরা। সোমবার দুপুরে সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং শিশু আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এই ব্যতিক্রমী রায় দেন।
মামলা থেকে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া ৫০ টি মামলায় ৭০ জন শিশু আদালতে এসে হাজিরা দিতে হতো। মারামারি, ছোটখাটো চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল এদের বিরুদ্ধে। কোমলমতি এসব শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠতে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। শিক্ষাজীবন ব্যাহত হবার উপক্রম হয়। আদালত এই শিশুদের কারাগারের পরিবর্তে মা—বাবার জিম্মায় ফেরৎ পাঠিয়ে শিশুদের জীবন সুন্দর ও মানবিক গুণাবলি নিয়ে বেড়ে ওঠার জন্য সংশোধনের শর্ত দিলেন। আদালতের এমন রায়ে আবেগাপ্লুত হলেন অভিযুক্ত শিশু তাদের অভিভাবকরা।
শহরের নর্থ ইস্ট আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী রাজু মিয়া বললেন, কলেজের পাশের বিসিক মাঠে মারামারি হয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আমি ওখানে গিয়েছিলাম। মারামারিতে আমি যুক্ত হই নি। কিন্তু মামলার আসামী হয়ে গেল দেড়বছরে ২৫ বার আদালতে হাজিরা দিতে এসেছি। হাজিরার দিনে মন খারাপ হতো। কলেজে ক্লাস থাকলেও হাজিরায় গিয়েছি। আদালত আমাকে সংশোধনের জন্য মা বাবার জিম্মায় দেওয়ায় আমি খুশি। আমাকে যে শর্ত পালনের জন্য বলা হয়েছে। আমি সেটি করবো। ডায়রিতে লিখে রাখবো।
জেলার জগন্নাথপুরের চিলাউড়া নয়াপুঞ্জি এলাকার কিশোর দেলোয়ার হোসেন সাঈদীও একবছর আগে মারামারি মামলায় আসামী হয়ে ৬—৭ বার হাজিরা দিয়েছেন। বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ কাম কাজ কইরা খাই, গাঁওয়ে মারামারি অইছে হকলের লগে আমারেও আসামি দিছে। যেদিন হাজিরা দিতে আইতাম, ইদিন আর কামও যাইতাম পারতাম না, আইলেতো খরচও লাগে, মা—বাপ বড় বেশি চিন্তাত আছলা, আজকে জজ সাবে মুক্তি দিছইন, তানরা যে লাখান চলার কথা কইছইন ইলাখানঔ চলমু, এক বছর পরে আইয়া ডায়রি দেখাইমু।’
আদালতের দেওয়া শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে নিয়মিত পড়াশুনার পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু ভাল কাজ করা এবং ডায়রীতে তা লিখে রাখা, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা, সবার সাথে সদ্ভাব রাখা এবং ভাল ব্যবহার করা, বাবা—মাসহ গুরুজনদের আদেশ নির্দেশ মেনে চলা এবং বাবা মায়ের সেবা যত্ন করা ও কাজে কর্মে তাদের সাহায্য করা, নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা এবং ধর্মকর্ম পালন করা, প্রত্যেকে কমপক্ষে ২০টি করে গাছ লাগানো এবং গাছের পরিচর্যা করা, অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করা, মাদক থেকে দূরে থাকা, ভবিষ্যতে কোন অপরাধের সাথে নিজেকে না জড়ানো।
এসব শর্ত প্রতিপালিত হচ্ছে কি না তা প্রবেশন কর্মকর্তা মো. শফিউর রহমান পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রতি তিনমাস অন্তর অন্তর আদালতকে অবহিত করবেন। শফিউর রহমান বললেন, এই ধরণের রায় যুগান্তকারী, এর মাধ্যমে শিশুদের সংশোধন হবার সুযোগ এবং পূন:একত্রিত হবার সুযোগ হলো। এই সময়ে তাদের আচার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে আদালতকে রিপোর্ট জানাব।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট রবিউল লেইস রোকেস বললেন, এই রায়ের ফলে ছোট খাট অনেক মামলার দীর্ঘসূত্রিতার অবসান হল। শিশুরা তাদের আপন ঠিকানা ফিরে পেল। আদালত প্রাঙ্গণে আসা থেকে রেহাই পেলো। আদালতের শর্ত মেনে চললে অবশ্যই শিশুটি সংশোধিত হবে।
ব্যতিক্রমী রায়ের দিনটি স্মরণিয় ও ইতিহাস হয়ে থাকবে বললেন, অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট হাসান মাহবুব সাদী। তিনি বলেন, এ ধরনের রায় উদাহরণযোগ্য।
একই আদালত ইতিপূর্বে তিন দফায় ৯৫ মামলায় ১৩৩ জন শিশুকে প্রবেশন দিয়ে মামলা থেকে নিষ্কৃতির মাধ্যমে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। একইভাবে ইতিপূর্বে এই আদালতের বিচারক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলায় দুই দফায় সুনামগঞ্জের প্রায় দেড় শতাধিক দম্পতিকে বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করে আপোষে তাদের মামলা সমূহ নিষ্পত্তি করে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের সন্তানদের সুখীজীবন ফিরিয়ে দেন।
- শাল্লা মাধ্যমিক অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তে উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষ
- বিশ্বম্ভরপুরে বিশ্ব পানি দিবস পালিত


