কৃষক নয়, অধিকাংশ বাঁধে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বৃহৎ হাওরগুলোতে ফসল রক্ষা বাঁধের বেশিরভাগ কাজই নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট’এর সদস্যরা। এদের কেউ কেউ সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা কিংবা জনপ্রতিনিধি। নীতিমালা রক্ষার জন্য পিআইসি’র সভাপতি-সম্পাদকের নাম হিসাবে কৃষককের নাম কেবল কাগজে কলমে যুক্ত রয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, কাজ করানো, পিআইসি সভাপতি ও সম্পাদকের সই নিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন সবই ওই প্রভাবশালীরাই করছেন। ওই প্রভাবশালী সিÐিকেট’র সদস্যরাই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরি করা, কাজে অনিয়ম কিংবা অসময়ে কাজ শুরু করণের হোতা। তাদের সহযোগিতা করছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তারা। লাভের টাকা এরাও (অসাধু কর্মকর্তারাও) পাবেন।
সুনামগঞ্জে হাওররক্ষা বাঁধের ৭২৫ টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন হয়েছে ৭২৫ টি। এই প্রকল্পগুলোর কাজ বাস্তবায়নের জন্য ১২৮ কোটি ৮৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
১৫ ডিসেম্বর থেকে প্রত্যেক প্রকল্পের কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রæয়ারি’র মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু এখনো কিছু প্রকল্পে কাজই শুরু হয় নি। আবার কোনো কোনো প্রকল্পে নামে মাত্র কাজ হয়েছে, অকাল বন্যা, পাহাড়ী ঢল বা পানির অপেক্ষা করছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা। কোনো কোনো বাঁধে মাটি দেওয়া হলেও কমপেকসন হয় নি বা নীতিমালা মোতাবেক কাজ হয় নি। সরেজমিনে বাঁধের কাজ ঘুরে দেখার সময় সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলমগীর কবির বলেন, বাঁধের কাজে অনিয়ম হওয়াটাই স্বাভাবিক, কোথাও কৃষক প্রতিনিধিরা কাজ করতে পারছে না। ২-৩ জনের সিÐিকেট কাগজে-পত্রে পিআইসি গঠন করে বাঁধের কাজ করছে, তারাই অফিসের যোগাযোগ ও ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করছে।
জামালগঞ্জের একজন সরকারি কর্মচারী নিজের নাম না ছাপার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, হালির হাওরের ৫ টি পিআইসিতে বেহেলী ইউনিয়নের যাদের রাখা হয়েছে তাঁরা একেবারেই সহজ সরল হতদরিদ্র মানুষ। এঁরা কীভাবে কাজ করাবেন এ নিয়ে শুরুতে আলোচনা ছিল এলাকায়। পরে সকলে জেনেছেন ৫ পিআইসির নিয়ন্ত্রকই স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি ও এক যুবলীগ নেতা।
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর উপ-প্রকল্পের ৮৫ নম্বর পিআইসি যাদের দিয়ে করা হয়েছে, তারা কেউই কৃষক নয় দাবি করে এই হাওরপাড়ের সুখলাইন গ্রামের কৃষক মৃদুল কান্তি দাস বলেন,‘এই বাঁধে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কাজ করাচ্ছেন।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চলতি নদীর বাম তীরে বাঁধ নির্মার্ণের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। ১৪ টি পিআইসি এই বাঁধের কাজ করছে। চলতি নদীর বাম পাড়ে বড় কোন হাওরও নেই।
বামপাড়ের অক্ষয়নগর গ্রামের সাজ্জাদুর রহমান পলিনসহ একাধিক গ্রামবাসী জানান, অপ্রয়োজনীয় এই বাঁধে ২০১৭ সালের হাওরডুবি’র ঘটনায় দুদক’র দায়ের করা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামীর ছেলে পেশায় ঠিকাদারকেও পিআইসি’র সভাপতি করা হয়েছে।
ধর্মপাশার একজন জনপ্রতিনিধি নাম উল্লেখ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, লাভের সামান্য অংশ দেবার শর্ত দিয়ে পিআইসিতে সভাপতি ও সম্পাদক রাখা হয়েছে কিছু কৃষককে। চেকে স্বাক্ষর দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই তাদের। পিআইসি’র অন্য ৫ সদস্য জানেনও না তারা পিআইসির কমিটিতে আছেন। এমনকি প্রকল্প এলাকায় সাঁটানো সাইনবোর্ডে নাম দেওয়া হলেও সদস্যদের মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করেনি বেশিরভাগ পিআইসি। কেউ যাচাই করলে লুকোচুরি বেরিয়ে যাবে, এজন্য কমিটির সদস্যদের মুঠোফোন নম্বর সাইনবোর্ডে যুক্ত করা হয় নি।
কেবল এই কটি বাঁধে নয় অনেক বাঁধের কাজেই প্রভাবশালী সিÐিকেট’র লোকজন যুক্ত থাকায় কাজ আদায় করতেও সমস্যা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান বলেন, নামে একজন, কাজ করাচ্ছে অন্যজন এমন একটি অভিযোগ বৃহস্পতিবার একজন গণমাধ্যমকর্মী আমাকে জানিয়েছেন। এই বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে। কোন সমস্যা হলে দায় কিন্তু যার কাগজে নাম আছে, তাকেই নিতে হবে। ভবিষ্যতে উপেজলা কমিটিগুলোকে এসব বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হবে। তারা যাতে আরও বেশি যাচাই করে কমিটির প্রস্তাব পাঠান।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক কাবিটা স্কীম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির অভিযোগ নিস্পত্তিকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, প্রত্যন্ত উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের জন্য জেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির দায়িত্বশীলদের যাওয়া সম্ভব ছিল না। উপজেলা থেকে প্রস্তাব পাঠানোর সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে কাদের কাদের নাম আসছে, সেই ব্যাপারে উপজেলা কমিটিকে আরও আন্তরিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।