হাওর সর্দারদের উৎখাত ভিন্ন হাওরের ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের সরকারি বরাদ্দ লুঠপাটÑ এ বছরের অন্যতম প্রবণতা। গত দুই বছর এরকম প্রক্রিয়া কম ছিল। তিন বছর আগে যে বছর অকাল বন্যায় শতভাগ বোরো ফসল তলিয়ে গিয়েছিল সে বছর পর্যন্ত বাঁধের বরাদ্দের অধিকাংশ টাকা ব্যয়িত হত ঠিকাদারদের মাধ্যমে। ঠিকাদাররা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ, প্রয়োজনাতিরিক্ত বরাদ্দ আনয়ন, সত্তর থেকে আশি ভাগ কাজ না করেই বিল উত্তোলন; এমন সব ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে হাওর রক্ষার টাকা আত্মসাৎ করতেন। সর্বাংশে ফসল ডুবির পর ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে সরকার ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে বাঁধের কাজ বাস্তবায়নের নীতিমালা জারি করেন। প্রথম দুই বছর পদ্ধতিটি ব্যতিক্রম বাদে মোটামুটি কৃষক-বান্ধব ছিল। এবার এর ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে ঠিকাদাররা যেসব পন্থায় বাঁধের টাকা লোপাট করতেন এবার পিআইসির নাম ভাঙিয়ে কতিপয় রাজনৈতিক মদদপুষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি এ কাজটি করার পাঁয়তারা শুরু করেছেন। এদের কারণে ঠিক ঠিকাদারি পদ্ধতির মতই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি পদ্ধতিটিও অকার্যকর প্রমাণিত হতে চলেছে। জেলার কৃষি ভিত্তিক জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন বোরো ফসলের জন্য এ হলো বিরাট অশনিসংকেত। হাওর ও কৃষির স্বার্থে এই আগ্রাসী মনোবৃত্তিকে কঠোরভাবে দমন করা উচিত।
আসল কথা হচ্ছে, যেকোনো পদ্ধতির চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হলÑ এর বাস্তবায়নের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সদাচরণ। বাস্তবায়নকারী যদি ভাল হয় তাহলে কোনো পদ্ধতিই মূলত খারাপ নয়। আমরা এমন এক সর্বগ্রাসী সময় অতিক্রম করছি যে সময়ে সুযোগ পেলেই সবকিছু চেটেপুটে খেয়ে নিতে চাই। সুতরাং সেই যে কথায় আছে, সাগরের ঢেউ গুনার কাজে লাগিয়ে দিলেও সেখানে রোজগারের ধান্দা বের করতে অসুবিধা হয় না। তেমনি বাঁধের জন্য সরকার সদিচ্ছা পোষণ করে যত ভাল ভাল পদ্ধতিই চালু করুন না কেন আমাদের আগ্রাসী সময় সবকিছুকে স্বার্থসিদ্ধির উপকরণে পরিণত করে ফেলতে পারে।
জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন বাঁধের কাজ দেখে বিভিন্ন জায়গায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। জগন্নাথপুর উপজেলায় দুইটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে, সঠিকভাবে কাজ না করায় ২০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। প্রতিদিনই স্থানীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন বাঁধের কাজের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। প্রশাসনের উচ্চপদস্তরা পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলতে শুরু করেছেন, বাঁধের কাজে অনিয়ম সহ্য করা হবে না। যতটুকু কাজ ততটুকুর বাইরে কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না মর্মেও তারা সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু কার্যত হাওরে এসব কথাবার্তার প্রেক্ষিতে অবস্থার উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে না। ফলে যদি প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করে তাহলে এবার কৃষকদের ভাগ্যে কী লেখা রয়েছে সেই দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে সকলের মাঝে।
এবার যদি পিআইসি ব্যবস্থাটি ব্যর্থ প্রমাণিত হয় তাহলে এর দায় স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপরও বর্তাবে। কারণ এবার পিআইসি গঠনে রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যাপক অভিযোগ আছে। কাগজেপত্রে কৃষকের নাম দেখিয়ে কাজ করাচ্ছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, টাকা পয়সাও তুলছেন-খরচ করছেন তারা। যেভাবে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ইজারা এনে প্রভাবশালী জলসর্দাররা জলমহাল নিয়ন্ত্রণ করেন তেমনি এবার হাওরে নতুন আরেক প্রবল প্রতাপশালী হাওর সর্দারদের উদ্ভব ঘটতে শুরু করেছে। এই হাওর সর্দারদের উৎখাত ভিন্ন অকাল বন্যার ঝুঁকি থেকে হাওরের বোরো ফসলকে মুক্ত রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়।