কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের হৃদপিন্ড হাওরাঞ্চল

হাওর নিয়ে নীতিনির্ধারকদের অস্পষ্ট ধারণা রয়েছে বলে এবারকার দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বেশ ভাল করে বুঝা গেছে। দেশের প্রায় ২০ ভাগ এলাকা হাওরাঞ্চল। এই হাওরাঞ্চলের উৎপাদিত ধান দেশের খাদ্যভান্ডারে জোগান দেয় প্রায় অনুরূপ পরিমাণ। এই বিশাল হাওরে একটিই আবাদযোগ্য ফসল। বোরো ধান ছাড়া আর কোন ফসল আবাদ করা যায় না এখানে। বোরো আবাদ মৌসুমের বাইরে প্রায় ৮ মাস এই হাওর জলমগ্ন থাকে। তখন হাওরগুলো হয়ে উঠে বিশাল সমুদ্রসম। হাওরের এই বিশাল জলাধার দেশের মিঠাপানির সর্ববৃহৎ এলাকা। হাওরগুলো দেশীয় প্রজাতির মৎস্য প্রজনন ও উৎপাদনের উৎকৃষ্ট ক্ষেত্র। হাওরের বিশাল ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে হাজার হাজার হাঁসের খামার। হাওরাঞ্চলের হাঁসের খামারে উৎপাদিত ডিম দেশের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের অন্য যেকোন অঞ্চলের চাইতে এই হাওরাঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বিপদজনক বাস্তবতা হলো হাওরাঞ্চলের প্রধান কৃষিপণ্য বোরো ধান উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত প্রকৃতির উদারতার উপর নির্ভরশীল। অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ইত্যাদি কারণে ফসল হানির আশঙ্কা এখানে প্রবল। এবার প্রায় শতভাগ বোরো ফসল হানি যা শতাব্দীকালের মধ্যে দেখা গিয়েছে কি না সন্দেহ, সেটি হাওরের প্রতি প্রকৃতির বিরূপ আচরণকে সামনে নিয়ে এসেছে। রয়েছে মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা। হাওরের ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ/সংস্কারের জন্য যে বিশাল সরকারি বরাদ্দ আসে তা কার্যত কতিপয় ব্যক্তি লুটপাট করে নিয়ে থাকেন। এবার বাঁধ নির্মাণের প্রায় ৬৯ কোটি টাকার মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ কাজও হয় নি বলে কৃষকদের ব্যাপক অভিযোগ। এর উল্টোদিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করা গেলে হাওরাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবদান সারা দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য। এখানে কৃষি ও মাছ উৎপাদনে খরচের পরিমাণ দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক কম। সম্পদ ও সম্ভাবনার এই বিশাল হাওর অঞ্চলকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যেরূপ মনোযোগ থাকা দরকার তা না থাকায় নিয়মিত এখানে নেমে আসে দুর্যোগ। এবারের ভয়াবহ ফসল হানির পর হাওরের প্রতি এই বঞ্চনার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।
হাওরের সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য নিয়ে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোন কাজ শুরু করতে পারে নি বা করতে দেয়া হচ্ছে না। হাওর উপযোগী ধান চাষ ও প্রায় ৮ মাসের বিশাল জলাধারকে কীভাবে আরও বেশি দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদনক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় সেনিয়ে নেই কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা। এই হাওর এলাকায় রয়েছে দেশের অধিকাংশ বিল, যা মাছের খনি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিলগুলো সনাতনী ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে যেতে পারে নি। হাওরের দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর, জুৎসই ও স্থায়ী সমাধানের উপায় উদ্ভাবিত হচ্ছে না। সকল পর্যায়ের বিশেষজ্ঞগণের অভিন্ন অভিমত হলো হাওরকে অকাল বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ব্যাপকভাবে নদী খনন করতে হবে। নদীর সাথে খাল ও বিলগুলোও খনন করতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে জাতীয় কোন পরিকল্পনাই নেই। বছর বছর বাঁধ আর বছর বছর দুর্নীতি, এই অবস্থার বাইরে আসা যায় নি দীর্ঘ দিনেও।
এবারের মহাদুর্যোগকে সামনে রেখে আমরা দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি হাওরকে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার আহ্বান জানাই। সাময়িক, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী এই তিনভাগে আমরা হাওর উন্নয়নের মহা পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের হৃদপি- হলো এই হাওরগুলো। এই হৃদপি- সচল রাখলে তাজা থাকবে দেশ।