ড. মোহাম্মদ আলী খান
ফুল। কবিতায়, গানে, চিত্রে ফুলের উপস্থিতি সর্বজনীন। জন্মের সময়, আনন্দের বহিঃপ্রকাশে, মালাবদলে, বাসর-শয্যায়, এমনকি শেষ বিদায় লগ্নে শবযাত্রায় ফুল না হলে চলে না। কত রঙ, কত যে সুবাস হাজার হাজার ফুলকে ঘিরে। সুনামগঞ্জে গন্ধরাজ ফুলের কদর আছে। অনেকের কাছে তা প্রিয় ফুল। কেউ ভালোবাসেন শাপলা, পদ্ম, কদম, হা¯œুহেনা, আমার প্রিয় ফুল রজনীগন্ধা। কৃষ্ণচুড়া নিয়ে আছে অনেক গান-কবিতা। কবিগুরুর কবিতায় ক্যামেলিয়া এসেছে আর এক মহিমায়। কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ডেফোডিল ফুলের বন্দনা বহুল প্রচারিত। সারা বিশ্বে যত ফুল আছে তার ভিতর জনপ্রিয়তার শীর্ষে গোলাপ। দ্বিতীয় স্থানে আছে ক্রাইসানথেমাম। আর তৃতীয় স্থানে টিউলিপ। দেশ কাল ভেদে অবশ্য এই পছন্দের তালিকা ভিন্ন ভিন্ন। সে বিতর্কে না যেয়ে বক্ষমান উপস্থাপনা শুধু নয়নাভিরাম টিউলিপকে ঘিরে।
টিউলিপ বসন্তের ফুল। শীতে বা গরমে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জন্মস্থান এশিয়া মাইনর, পারস্যেও তার জন্মস্থান খুঁজে পাওয়া যাবে। কবি ওমর খৈয়াম, কবি রুমীর কবিতায় টিউলিপ আছে। তুরস্কে টিউলিপ বরাবরই প্রিয় ফুল ছিল এবং তুরস্ক থেকেই টিউলিপ ইউরোপে পাড়ি জমায়। বর্তমানে ইউরোপের ফুল হিসাবে টিউলিপ সকলের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। আর তার কেন্দ্রবিন্দু হলো নেদারল্যান্ডসের কোকেনহফ টিউলিপ বাগান। নেদারল্যান্ডসের জাতীয় ফুলও টিউলিপ।
কোকেনহফ দক্ষিণ নেদারল্যান্ডেসের ছোট্ট শহর লিসি’তে (Lisse) অবস্থিত, আমস্টারডামের বিখ্যাত সিপল (Schiphol) বিমানবন্দর থেকে বেশি দূরে নয়। কোকেনহফের অর্থ কিচেন গার্ডেন যার আরো পরিচিতি গার্ডেন অব ইউরোপ নামে। এটিই পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও আকর্ষণীয় ফুলবাগান। এর আয়তন ৭৯ একর /৩২ হেক্টর এবং বছরে সাত মিলিয়ন (৭০ লক্ষ) ফুল বীজ এখানে রোপন করা হয়। সারা বছর কোকেনহফে টিউলিপের দেখা মিলবে না, এই বাগান খোলা থাকে মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মে পর্যন্ত। আমার বিরল সৌভাগ্য, গত ১২ মে ২০১৬ তারিখে এই নয়নাভিরাম মন জুড়ানো বাগানে একটি মুগ্ধ বিকেল কাটাতে পেরেছি।
কী অসাধারণ সে বাগান, যত দেখি তত যেন আরো কাছে এসে ডাকে। বাগানের ভিতর শত শত ফুলের বিছানা। বাগানের বাইরে বিশাল প্রান্তর জুড়েও দেখা মিলবে টিউলিপের ক্ষেত। এক এক সারি এক এক রঙের টিউলিপে সাজানো, বিশাল মাঠ জুড়ে টিউলিপ অপরূপ সৌন্দর্য বিলিয়েই চলেছে। এখানে টিউলিপ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হয় এবং সমগ্র ইউরোপ তথা সারা বিশ্বে তা রপ্তানি হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শখ ও টিউলিপ বন্দন, শিরোনাম হয়ে আছে কয়েক শতাব্দী। শত শত কবিতা লেখা হয়েছে টিউলিপকে নিয়ে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র সিলসিলা’র একটির অংশের চিত্রায়ণ এই টিউলিপ বাগানেই হয়েছিল। অনেক বরেণ্য ব্যক্তিদের আগমন ঘটেছিল এই ঐতিহ্যম-িত ফুল বাগানে। রানি জুলিয়ানা ছিলেন বাগানটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা Prince Bernhand এখানে স্মরণীয় ছবির কিছু দৃশ্য ধারণ করেছেন।
প্রায় সাত মিলিয়ন ফুলের সম্ভারে যে অপরূপা তাকে দেখতে কিছু নজরানা দিতেই হয়ে। ১৬ ইউরো দিয়ে টিকিট কাটার সাথে একটি গাইড বইও মেলে। বাস, কার পার্কিং-এর জন্য বিশাল এলাকা, সর্বত্র এক সুশৃঙ্খল পরিবেশ। প্রবেশ তোরণ আকর্ষণীয়। বাগানে প্রবেশের আগে থেকেই টিউলিপ সুন্দরীরা অভিবাদন জানাতে থাকে। সারা বাগান জুড়ে ছোট ছোট খাল এবং তার উপর নান্দনিক সেতু, সেখানেও ফুলের ছোয়া আছে। নবোঢ়ার সাজের জন্য বা নব-দম্পতির ছবি তোলার জন্য যা কিছু দরকার, শুধু এই বাগানে এসে পড়লেই চলবে। বহুরঙের টিউলিপ স্বাগত জানাবে, শুভেচ্ছা জানাবে, বিনিময় করবে অকৃত্রিম ভালোবাসা।
সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকরা এসেছেন এখানে। শ্বেতবর্ণ থেকে শুরু করে কৃষ্ণবর্ণসহ আমাদের মত বাদামী রঙের মানুষের মুগ্ধ পদচারণা বাগান জুড়ে। কেউ তাড়াহুড়া করছে না। প্রত্যেকের কাছেই কাম্য, আর একটু না হয় বেশি থাকি। এখানে মিলছে নয় দশকের সাক্ষী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কেবল দুধদাঁত পড়েছে শিশু, আলোকিত যৌবনের উছ¦াসে পূর্ণ যুবক-যুবতী, বয়ঃসন্ধিক্ষণে বিভ্রান্ত কিশোরী, অন্তঃসত্বা নারী, বয়সে তরুণ, মনে তরুণ। ভালো লাগার এক অন্তঃনিঃসৃত ফল্গুধারা বয়ে যায় অজান্তে। ষোড়শ শতকে পারস্য, তুরস্ক থেকে নেদারল্যান্ডস-এ থিতু হলে সপ্তদশ শতকের মধ্যেই টিউলিপ এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে যে, টিউলিপকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক শব্দচয়ন ‘টিউলিপম্যানিয়া’ (Tulipmania)।
লাল রঙের টিউলিপগুলো যখন পাশাপাশি ফুলের বিছানায় হালকা বাতাসে দোল খায় তখন বিরস মানুষও কল্পনা প্রবণ হয়ে উঠবে। অনন্যসাধারণ সে উপস্থাপনা। বিখ্যাত শিরি-ফরহাদের ঘটনা থেকে লাল টিউলিপের প্রতি ভালোবাসা দুর্বার হয়েছে। যখন ফরহাদ জানলো, শিরিন নিহত হয়েছে, তখন ঘোড়ার পিঠে বসা প্রেমিক নিজেকে শেষ করে দিল, তার বক্ষ বিদীর্ণ করা লাল রক্তের ধারা আশ্রয় নিল মৃত্তিকা পরে, এক এক ফোটা রক্ত থেকে জন্ম নিলো এক একটি লাল টিউলিপ। এই লাল, হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত ভালোবাসার রঙ যার তুলনা শুধু লাল টিউলিপ।
কী মনোরম কী সুন্দর সাদা টিউলিপ, হালকা রোদের আলোয় ঝলমলে উজ্জ্বল। বারে বারে জানায় সু-স্বাগতম। সাদা টিউলিপের পাপড়িগুলো যেন কথা বলে অন্তহীন শান্তির কথা, সত্য ও সুন্দরের কথা। সাদা টিউলিপকে দেখে মনে হবে সে যেন পুর্ণিমার জোৎ¯œা থেকে, হেমারফেস্টের জমিনে থাকা শীতের বরফের স্তর থেকে, মাদার তেরেসার শুভ্র বসন থেকে সাদা রঙ এনে এখানে মিলিয়েছে। হলুদ টিউলিপের আবেদন হৃদয়ের গহীনে কড়া নাড়ে। মননশীলতা, সুচিন্তা, প্রশান্ত মনের এক প্রতীক যেন হলুদ টিউলিপগুলো। পারপেল রঙের টিউলিপগুলো রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক। আর কালো টিউলিপের তুলনা কালো টিউলিপই। প্রেমিক প্রেমিকার কেন্দ্রবিন্দুতে যে নোনাব্যথা তা যেন কালো টিউলিপের পাপড়িতে ছড়িয়ে আছে। বহু রঙের টিউলিপ রয়েছে সারাটা বাগান জুড়ে। সারি সারি একই রঙের টিউলিপ বা বহুরঙের টিউলিপ, এক জমিনে পাশাপাশি থেকে তৈরি করে এক মায়াবী ভুবন। সারি সারি টিউলিপ ছাড়াও একটি মাত্র টিউলিপও নিজে গুণে গুণাম্বিত। এমনকি একটি ফুলও যার যার মহিমা নিয়ে প্রস্ফুটিত বিকশিত প্রশংসিত।
বর্ষজীবী ও বসন্তকালীন ফুল হিসাবে টিউলিপ সুপরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Tulipa, চাষাবাদের উপযোগী এক প্রকার পুষ্পজাতীয় উদ্ভিদ। মুকুল থেকে এর জন্ম হয়। বিভিন্ন প্রজাতির টিউলিপ রয়েছে। উচ্চতা ১০ সে.মি. থেকে ৭১ সে.মি. পর্যন্ত হয়। টিউলিপ ফুল বহু রঙের হয়। আলেকজান্ডার ডুমার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ব্লাক টিউলিপ’ আজো পাঠকপ্রিয়। কালো টিউলিপ ফুলের পাপড়িগুলো নিকষ কালো না হলেও যথেষ্ট কালো। কোন কোন ফুলের ভিতরে কালো রঙের ছোপ আছে। একটি মাত্র রঙ নয়, বহু রঙে বিভোর টিউলিপও লক্ষ করা যায়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে কালো রঙ ছাড়াও সাদা, লাল, হলুদ, গোলাপী, বেগুনি ও পারপেল রঙের টিউলিপ। এছাড়া মিশ্ররঙের টিউলিপগুলো দেখতে অসাধারণ। গবেষণা করে নিত্য নতুন রঙের টিউলিপ সংযোজিত হচ্ছে। সাথে পাপড়ির গঠনেও বৈচিত্র এসেছে। একপ্রকার সাদা টিউলিপ, কাপের আইক্রীমের মত, নাম তার আইসক্রীম টিউলিপ।
ফুলের পাপড়িগুলো অসাধারণ। দেখতে অনেকটা কাপের মত বা তারার মত। কাপ আকৃতিই বেশি আদরণীয়। এর তিনটি পুষ্পদল এবং তিনটি বহিঃদল রয়েছে। ফলে ভিতরকার রঙ আরো গাঢ় দেখা যায়। বীজগুলো বাদামি রঙের, বাইরের আবরণ বেশ পাতলা। টিউলিপ গাছ ডাটার মত, দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের রজনীগন্ধার মত, তবে পাতাগুলো বেশ বড় ও চওড়া, দুই থেকে ছয়টি ডাটা থাকে, প্রজাতি ভেদে তা সর্বোচ্চ ১২টি হতে পারে।
নেদারল্যান্ডস-এর কোকেনহফ টিউলিপ বাগানে যখন ফুলগুলো ফোটে, নানা রঙের বাহারে চারিদিকে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন মনে হবে এ এক স্বর্গীয় উদ্যান। নানা আকারে ঢঙে ফুলের সারিগুলো সাজানো। ফুল ছাড়া সারা বাগানে রয়েছে সবুজের ছোঁয়া, আছে উঁচু উঁচু অনেক গাছ। ভিতরে সব পায়ে চলা পথ, ঝকঝকে সুন্দর। শুধু অসুস্থদের জন্য আছে হুইল চেয়ার। মাঝে মাঝে খাল, খালের স্বচ্ছ পানিতে ফুলের প্রতিবিম্ব চোখে পরশ বুলিয়ে যায়। ভিতরে টিউলিপ ফুলের জন্ম-ইতিহাস-বিকাশ নিয়ে আছে একটি জাদুঘর, বই কেনা যায় টিউলিপ ফুলের উপর। তাছাড়া আছে কয়েকটি দোকান, সুন্দর করে সাজানো, তবে সব গিফট আইটেমের দাম খুব বেশি। টিউলিপ বাগানে টিউলিপ ফুল ছাড়াও দেখা মিলবে কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিখ্যাত ডেফোডিল এবং গ্রীক সাহিত্যে আলোচিত নার্সিসাস ফুল। এই ফুলের রাজ্যে যিনি আসেন, তার পথ চলা খুব ধীর লয়ে হয়ে যায়, মন চায় আরো থাকতে, শুধু দ্রুত নিঃশ্বাস ছাড়ে ক্যামেরা বা মুঠোফোন।
ড. মোহাম্মদ আলী খান, অতিরিক্ত সচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, e-mail: [email protected]


