কামরুল জাহাঙ্গির
বুদ্ধদেব বসু তাঁর মোরা গান রচি কবিতায় জীবনকে দেখেছেন এভাবেÑ
‘অলস আবেশে মোরা জীবনেরে দেখি নি মধুর;Ñ/ ললাটে ঝরিছে স্বেদ-তারি স্বাদ মোদের অধরে,/ হৃদয়ে দুঃখের যজ্ঞÑ তারি জ্বালা প্রত্যেক অক্ষরে,/ মোদের আকাশ রুক্ষ, শ্যাম স্বপ্নে নহে সে মেদুর।
মফস্বল থেকে প্রকাশিত আদর্শনিষ্ঠ কোন পত্রিকা সম্পাদকের জীবনটাও এমন করুণ ট্র্যাজেডির উপাখ্যান। এখানে স্বপ্ন আছে, আকাক্সক্ষা আছে, কর্মযজ্ঞ আছে, ত্যাগ-সাধনা-একনিষ্ঠতা আছে। কিন্তু সবকিছুর শেষে ‘মোদের আকাশ রুক্ষ’ এর মতোই এক সকরুণ উপসংহার।
আশাভঙ্গ
চার বছর অতিক্রমের পর আমাদেরকে আজ শক্তপোক্ত একটি কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল। সুনামগঞ্জের মত মফস্বল শহর থেকে একটি নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের কোন রকমের পূর্ব অভিজ্ঞতা সামনে না থাকা সত্ত্বেও আমাদের সম্পাদক যখন ২০১২ সনের প্রথমভাগে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের ডিক্লারেশন নিয়ে নিয়মিত প্রকাশের অঙ্গিকার ব্যক্ত করলেন তখন অনেকেই একে অবাস্তব পরিকল্পনা হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন। প্রত্যয়ী সম্পাদক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দুর্গম পাহাড় ডিঙানোর মত কষ্ট করে এই চার বছর যাবৎ পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশনা বজায় রেখে নিজের কথা রেখেছেন। কিন্তু তিনি আরেকটি কথা রাখতে পারেননি। প্রকাশনার শুরুতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা একে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালনা করব। সংবাদ প্রকাশে নিরাপোশ, পক্ষপাতহীন এবং কোন দুর্নীতির আশ্রয় না নিয়েই আমরা পত্রিকাটিকে প্রকাশনা ব্যবসায় হিসাবে দাঁড় করাব।’ প্রকাশনার চার বছর অতিক্রম করার পর যখন প্রেসের ও কাগজের কয়েক লাখ টাকা বাকি পড়ে থাকে এবং সম্পাদক নিজে যখন এই চারটি বছর লাভ উঠানো দূরে থাকুক ভর্তুকি দিতে দিতে জেরবার অবস্থা, তখন বলতেই হয় দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে তিনি এখন পর্যন্ত লাভজনক না হোক ‘না লাভ-না ক্ষতি’ এই অবস্থায়ও দাঁড় করাতে পারেননি।
শপথরক্ষার কঠিন লড়াই
পত্রিকা বহু বিড়ম্বনা সহ্য করে ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরোধিতা মোকাবিলা করে দেড় বছরের মাথায় ডিএফপি তালিকাভুক্ত হয়ে সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছে বটে, তবে জেলা সুনামগঞ্জে সরকারি বিজ্ঞাপনের পরিমাণ কতটা কিঞ্চ্ৎি গত আড়াই বছরের পত্রিকা খুললেই তা প্রমাণ হয়। তাছাড়া সরকারি বিজ্ঞাপনের নি¤œহার ও বিলপ্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা সরকারি বিজ্ঞাপনের উপর পত্রিকার প্রকাশনা টিকে থাকার সম্ভাবনাকে পরাস্ত করেছে। এই জেলায় বেসরকারি বিজ্ঞাপনের উৎস প্রায় নেই বললেই চলে। মূল ভরসা শুভেচ্ছা বিজ্ঞাপন যা বিজ্ঞাপনদাতার বদান্যতার উপর নির্ভরশীল। ব্যক্তি বিশেষের বদান্যতার উপর নির্ভর করে একটি পত্রিকা কখনও শক্ত মাটির উপর দাঁড়াতে পারে না। চার বছরের মাথায় এসে যে নির্মম সত্য আমাদের উপলব্ধিতে এসেছে তা হলো, সততা বজায় রেখে মফস্বল শহরে দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা টিকিয়ে রাখা সুকঠিন বিষয়। তবে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসালে, সততা বিসর্জন দিলে, তোষামোদি করলে, গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থরক্ষায় সংবাদ পরিবেশন করলে, নিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দিলে এই চার বছরে পত্রিকার সম্পাদক ও জড়িত অন্যরা বহু অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু যে শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল সেখান থেকে বিচ্যুত হওয়ার মতো স্খলন ঘটেনি এটুকুই আমাদের সান্ত¡না।
জাতীয় পর্যায় থেকে আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত আমাদের পত্রিকা প্রকাশনার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, এখন অধিকাংশ পত্রিকার মালিক শিল্পপতি, মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী, লুণ্ঠনকারী ও কালো টাকার মালিক। পত্রিকার পিছনে তারা অঢেল টাকা খরচ করেন কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি মুনাফা না নিলেও তাদের সমস্যা নেই। কারণ এইসব মালিকের উদ্দেশ্য পত্রিকা প্রকাশ করে মুনাফা অর্জন করা নয়। বরং বৈধ-অবৈধ ব্যবসার রক্ষাকবচ আর সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য তাদের একটি পত্রিকা কিংবা মিডিয়া খুব প্রয়োজন। এইসব পত্রিকা মালিক আর গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত থাকে। এরকম প্রেক্ষাপটে সুনামগঞ্জের মতো একটি শিল্প ও ব্যবসায় অনগ্রসর এলাকা থেকে সুস্থ সাংবাদিকতা চর্চা আর সততার সাথে পত্রিকা প্রকাশনা দূরুহ কাজ নিঃসন্দেহে। আমরা এটুকু বলতে পারি, আমাদের সম্পাদক এ যাবৎ সাংবাদিকতার সুস্থ চর্চার মধ্য দিয়ে নিজে ক্ষতি স্বীকার করে পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রেখে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সংকট বহুমুখী
মফস্বল শহরে সংবাদ পরিবেশনের অনেক ঝুঁকি রয়েছে। এখানে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করা কঠিন কাজ। অথচ একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পাদক এরকম সত্য অস্বীকার বা এড়িয়ে যেতে পারেন না। এরকম তিক্ত সত্য প্রকাশ করার কারণে গত চার বছর সম্পাদককে অনেকের ভ্রƒকুটি সহ্য করতে হয়েছে। অনেকের বিরাগভাজন, প্রিয় অনেকের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটতেও দেখেছি আমরা। ব্যক্তিগত এইসব ক্ষতি উপেক্ষা করে সম্পাদককে সাধ্যমত সাংবাদিকতার আদর্শকে উর্দ্ধে ধরে রাখতে দেখেছি আমরা। ক্ষেত্র বিশেষে আপোশ যে করতে হয়নি কিংবা সত্যকে কায়দা-কানুন করে কিছুটা হালকা করার প্রয়াস যে একেবারেই দুর্নীরিক্ষ তা বলা যাবে না। তবে মোটা দাগে আমরা ফেলে আসা চারটি বছরই চেষ্টা করেছি সত্যকে সাথে নিয়ে পথ চলার।
মফস্বলে সাংবাদিকতা চর্চার আরেক সংকট হলো, সকলেই তোষামোদ পছন্দ করেন। নিজের প্রচার-প্রচারণায় খামতি হলেই তারা রুষ্ট হন। ফলে সংবাদমূল্য থাকুক অথবা নাই থাকুক শুধুমাত্র এই প্রচার বিলাসিতার জন্য অনেক গুরুত্বহীন সংবাদ প্রকাশ করতে হয় মফস্বলের পত্রিকাকে। সুনামগঞ্জের খবর এই বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে না পারলেও তার সংবাদ পরিবেশনার প্রধান ধারায় একে কখনও প্রাধান্য দেয়নি। পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার শীর্ষ অথবা দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শীর্ষ সংবাদ দেখলে সকলেই বুঝতে পারবেন আমরা সংবাদ মূল্যকে গুরুত্ব দিয়েই সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছি। পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে কখনও আমরা আপোশ করিনি। স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যুতে নিয়মিতই আমাদের মন্তব্য অকপটভাবে প্রকাশ করে গেছি এই স্তম্ভে।
সংকটের আরও মাত্রা আছে। এরমধ্যে প্রধান হলো মানসম্মত রিপোর্টারের অভাব। মফস্বলে ভাল ছেলেমেয়েদের সাংবাদিকতা পেশায় আকৃষ্ট করা অনেক কঠিন। হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম ব্যতীত অধিকাংশই স্থানীয় প্রতিনিধিদের কোন পারিশ্রমিক দেয় না। স্থানীয় পত্রিকাগুলোর সামর্থ্য তো সীমিতই। এখন কোন শিক্ষিত তরুণকে সাংবাদিকতার জীবন পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে না, আগে এবং এখন অল্প সংখ্যক যেসব মননশীল ব্যক্তি এ কাজটি করছেন তারা ভালবাসার টানে এবং নিজের অন্য পেশার সাথে এটিকে গ্রহণ করেছেন। অন্য যারা এ পেশায় আসছেন তাদের নানারকম ধান্দা থাকে। ফলে মফস্বলের সাংবাদিকতা পেশা নানা দোষে আক্রান্ত। এর প্রতিফলন ঘটে স্থানীয় সংবাদপত্রে। যোগ্য রিপোর্টারের অভাবে অনেক জনস্বার্থ সংরক্ষণকারী বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করা যায় না। একেবারেই সাদামাটা একটি সংবাদ তৈরি করতেও সম্পাদক অথবা বার্তা সম্পাদককে মাথা ঘামাতে হয়। গত চার বছরে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের অধিকাংশ শীর্ষ সংবাদ তৈরি করতে হয়েছে খোদ সম্পাদককে। কিছু করেছেন বার্তা সম্পাদক। মফস্বল রিপোর্টারদের কিছু ভাল ভাল সংবাদও মাঝে-মধ্যে শীর্ষ সংবাদের স্থান দখল করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো কোন নতুন রিপোর্টারের প্রতিবেদন এই চার বছরে শীর্ষ শিরোনামে অন্তর্ভূক্ত হতে পারেনি। স্বয়ং সম্পাদককে যখন ছোট-বড় সংবাদ তৈরিতে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয় তখন পত্রিকার মানোন্নয়ন যে আকাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব নয় ত্ াসহজেই অনুমেয়।
সার্কুলেশন বাড়লে পত্রিকার লোকসানের পরিমাণ বাড়ে এরকম একটি ভয়ংকর ও অদ্ভুত বাস্তবতা আমাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই জানেন না, পাঠকরা ৩ টাকা দিয়ে একটি পত্রিকা কিনলেও পত্রিকা অফিসের অংশে আসে মাত্র ১ টাকা। তাও প্রকাশিত পত্রিকার মাত্র এক তৃতীয়াংশ এমন হিসাবের আওতায় আসে। সুতরাং সার্কুলেশন বাড়লে পত্রিকার লোকসান বাড়ার পরিহাসজনক বাস্তবতা নিয়েই আমরা পথ চলেছি। এই লোকসান আমাদের সার্কুলেশন বাড়ানোর ইচ্ছাকে একচুল নড়াতে পারেনি। বরং যে সংখ্যার একাধিক সংস্করণ ছাপতে হয়েছে তখন পত্রিকাসংশ্লিষ্ট সকলেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছেন।
প্রাযুক্তিক ও মেধার সীমাবদ্ধতা আমাদের আরেক সংকটের নাম। মাত্র কয়েকটি সাধারণ মানের কম্পিউটার আর এক আনকোরা ডিজাইনারই আমাদের সম্বল। ঢাকার মিডিয়া হাউসগুলো যখন নামী-দামী শিল্পীর অলংকরণে পাতার সৌন্দর্য বাড়াতে পারে কিংবা এডফার্মের শৈল্পিক মনোহর বিজ্ঞাপনে শোভিত হয় তখন আমাদেরকে একমাত্র জুবেরের বুদ্ধিমত্তা আর মর্জির উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। জুবের শিখেছে ততটুকু যতটুকু শিখিয়েছেন তার খালু সুনামগঞ্জের নামী ডিজাইনার আলী সিদ্দিক। সুতরাং এখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা থাকবেই। যারা আমাদের বিগত বর্ষপূর্তি সংখ্যাগুলোর শৈল্পিক মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাদেরকে আমাদের এই সীমাবদ্ধতা মনে রাখার অনুরোধ জানাই। পত্রিকা চার বছরের মাথায় এসেও একেবারে নির্ভুল বানান আর প্রমিত রীতি অনুসরণ এবং সুশ্রাব্য বাক্য রচনার ক্ষেত্রে মানোত্তীর্ণ হতে পারেনি। এখনও আমাদের বানান ভুল হয়, একই বানানের একাধিক রীতি অনুসৃত হয়, বহু বাক্য জটিল হয়ে পড়ে। এর কারণ হলো রিপোর্টারদের এতদবিষয়ক সীমাবদ্ধতা ও মানসম্মত সম্পাদনার অনুপস্থিতি।
পত্রিকা অফিস এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি কেবলমাত্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে। এখনও এখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগ করা যায়নি। ফলে এক ব্যক্তিকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্বয়ং সম্পাদককে একাধারে ব্যবস্থাপনা, রিপোর্টিং, জনসংযোগ, বিজ্ঞাপন, সার্কুলেশন, অর্থসংগ্রহ এমনসব কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। অফিসের জেনারেটর নষ্ট হলে তাকেই ছুটতে হয় মেকানিক সন্ধানে। কম্পিউটারের সার্ভিসিং প্রয়োজন হলে সম্পাদককেই মাথা ঘামাতে হয়। অর্থাৎ মফস্বলের সম্পাদককে সকল কাজের কাজী না হয়ে কোন উপায় নেই। বরং বলা চলে আমরা যে সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্য নিয়ে প্রতিদিন পত্রিকা বের করে চলেছি পৃথিবীর যে কেউ আমাদের নিকট থেকে এর শিক্ষা নিতে পারে। দা দিয়ে দাড়ি চাঁচার যে প্রবাদ তৈরি হয়েছে তার স্বার্থক রূপায়ন দেখা যাবে আমাদের পত্রিকা অফিসে আসলে। আসলে এখানে যারা কাজ করেন তারা কেউই পেশাদার মনোবৃত্তির নন, সকলেই সাংবাদিকতাকে উপভোগ করেন অনেকটা ভালবাসা থেকে, এজন্যই এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হচ্ছে।
শক্তির অফুরান জুগান
এই পত্রিকার মাধ্যমে কিছু লেখক নিজেদের সৃষ্টিশীল চর্চা অব্যাহত রাখার সুযোগ পেয়েছেন। পুরাতন লিখিয়েরা এর মধ্য দিয়ে যেমন নিজেদের শাণিত করার সুযোগ পাচ্ছেন তেমনি অনেক নতুন লেখকও তৈরি হচ্ছেন। পত্রিকার বিগত চার বছরে বহু মানসম্মত লেখা প্রকাশ পেয়েছে যা সুনামগঞ্জের সাহিত্য ও মননশীলতার অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে।
আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে নীতিনির্ধারক ও জনগণের দৃষ্টিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো বজ্রপাতের মতো বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগকে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভূক্ত করণ। এই আলোচনা আমরা শুরু করেছি ২০১২ সনে সরস্বতিপুর ট্রেজেডির পর থেকেই। যখন এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ছিল না ন্যুনতম কোন আলোচনা। এরপর ধারাবাহিকভাবেই এটি আমরা অব্যাহত রেখেছি। এখন বিষয়টি জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। স্থানীয় ইস্যুতে আমাদের বহু পরামর্শ কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করেছেন। এরকম হিসাব দিতে গেলে লেখার কলেবর অনেক বেড়ে যাবে তাই পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি না ঘটানোই ভাল।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের অন্যতম শক্তি হলো এর মফস্বল প্রতিনিধিরা। বিভিন্ন উপজেলায় যারা পত্রিকার প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদেরকে বাছাই করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। ফলে উপজেলার সবচাইতে গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকরাই আমাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের অনেকেরই রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা। ফলে মফস্বল সংবাদ পরিবেশনে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর একটা মান বজায় রাখতে পেরেছে সবসময়। আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের সোর্স। সকলেই জানেন, যার সোর্স যত শক্তিশালী সেই সাংবাদিক তত বেশি সফল। সোর্স না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদের ক্লু পাওয়া যায় না। এই সোর্স-সামর্থের কারণে সুনামগঞ্জের খবরে বহু সংবাদ পরিবেশনা করা হয়েছে যা অন্য কোন পত্রিকা পরিবেশন করতে পারেনি। জাতীয় শীর্ষ গণমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধি ও সুধীজনদের আস্থার জায়গাটি বরাবরই সুনামগঞ্জের খবরের প্রধান প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে। আর পাঠক আস্থার বিষয়টি তো সর্বাগ্রে অবস্থান করে। শুধুমাত্র পাঠক আস্থা বজায় থাকার কারণেই সুনামগঞ্জের খবর একেবারে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে গত চার বছর যাবৎ নিজের প্রকাশনা টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, এই অমোঘ সত্য উচ্চারণ না করলে নিজের সাথে নিজের বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
আরেকটি আস্থার জায়গা হলো আমাদের বিদেশি প্রতিনিধি ও পাঠকরা। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের খবরের অনলাইন ভার্সন চালু হওয়ার পর বিশ্বের যেখানেই সুনামগঞ্জের মানুষ রয়েছেন তাদের অপরিহার্য দৈনন্দিন কার্যতালিকায় অনলাইনে সুনামগঞ্জের খবর পাঠ করা অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। ফলে সুনামগঞ্জের খবরের পাঠক সংখ্যা এখন কাগজের চাইতে অনলাইনে অনেক অনেক বেশি। বিদেশ থেকে প্রচুর প্রতিক্রিয়া, মতামত, উপদেশ ও পরামর্শ আমরা নিয়মিত পেয়ে থাকি। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, ভারত, কানাডা এমনসব দেশে কিছু নিবেদিত সংবাদকর্মী সেদেশে বাঙালিদের খবরাখবর পরিবেশনের সাথে জড়িত।
তাকিয়ে সম্মুখে
তবুও আমরা দৃষ্টি রাখি সামনেই। অনুপ্রেরণা খুঁজি পেছনের সফলতা থেকে। দুঃখ ভুলি তৃপ্ত পাঠকের মুখ কল্পনা করে। তংকার ঝংকার শুনতে না পেলেও মানুষের একটুখানি ভালবাসার কাঙাল আমরা। কারণ আমাদের জীবনের লক্ষ খুঁজি সেই বুদ্ধদেবেইÑ
‘ঝরাও ঝরাও জীর্ণ জরার হলদে পাতা,/ ছড়াও ছড়াও সূর্যের লাল বীজ।/ জ্বালাও জ্বালাও ভাঙা হৃদয়ের শুকনো ডালে/ সূর্যের উজ্জ্বল লাল মঞ্জুরী।’ (পূর্বরাগ)।


