হাসান শাহরিয়ার
সবেমাত্র স্কুলে যেতে শুরু করেছি। ইংরেজি তো দূরের কথা, বাংলাও শিখিনি। এর মধ্যে বাড়ি থেকে হুকুম হল আরবিও পড়তে হবে। এটি একটি বাড়তি বোঝা মনে করে কিছুটা বিরক্ত হলাম, কিন্তু কাজ হল না। অগত্যা আমার ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরীর (বর্তমানে সুনামগঞ্জ বারের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও বিশিষ্ট কলামিস্ট) সঙ্গে প্রথমে কায়দা এবং পরে সিপারা (আমপাড়া) ও কোরআন শরিফ পড়তে রোজ সকালে এক ঘন্টার জন্য টাউন মসজিদে যাওয়া শুরু করলাম। তখনকার দিনে বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্তারা মনে করতেন ধর্ম সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক জ্ঞানদান তাদের পবিত্র কর্তব্য। কারণ একটু বয়স বাড়লে ছেলেমেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন আসে এবং ধর্ম শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ কমে যায়। অতএব এ ব্যাপারে যা তালিম দেওয়ার তা শুরুতেই দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের স্কুলের লেখাপড়ার সঙ্গে যোগ হত নামাজ শেখা এবং পবিত্র কোরআন শরিফের কয়েকটি সুরা মুখস্থ করা। সেই সঙ্গে বাধ্যতামূলক ছিল রমজান মাসে রোজা রাখা। আমাদের পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শুরুতে হোসেন তওফিক চৌধুরী ও আমি এইচএমপি (হাজী মকবুল পুরকায়স্থ) এমই মাদ্রাসায় (এখন হাইস্কুল) ভর্তি হই। এই মাদ্রাসা বা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমাদের নানা তাহিরপুরের মোল্লাপাড়া নিবাসী হাজী মকবুল পুরকায়স্থ। আমাদের বিদ্যালয়ের উত্তর পাশেই ছিল সুদৃশ্য টাউন মসজিদ। অনেকটা কোর্ট-আদালতের গা-ঘেঁষে অবস্থান ছিল বলেই এর অপর নাম কোর্ট মসজিদ। এখন নাম হয়েছে কেন্দ্রিয় জামে মসজিদ। তখন যেমন সুনামগঞ্জ শহরে কোনো ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট’ ছিল না, এখনও নেই। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে যোগ হয়েছে সাইকেল রিক্সা। অতএব আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল পদযুগল। আমাদের হাসন নগরের বাসা থেকে সকালে যেতাম মসজিদে, ফিরে এসে গোসল করে গরম ভাত খেয়ে ছুটতাম স্কুলে। শহরে তখনও পাকা রাস্তা হয়নি। কোনো কোনো রাস্তা ইট বিছানো ছিল। তবে একবার ইট উঠে গেলে আর নতুন ইট বসানো হত না। ফলে খানাখন্দকের সৃষ্টি হত। বৃষ্টির দিনে বেশ কষ্ট হত। তবে এসব শহরবাসীর গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বয়েসি আরও কয়েকটি ছেলে কোরআনে দরস নেওয়ার জন্য মসজিদে আসত। আমার সহপাঠী হুমায়ূন মঞ্জুর চৌধুরী (সাবেক পিপি ও সুনামগঞ্জ বারের একজন সিনিয়র আইনজীবী) ছিল তাদের একজন। দু’জন হুজুর আমাদের পড়াতেন। তাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। তাদের অক্লান্ত চেষ্টায়ই আমরা নামাজ পড়া শিখলাম। কেউ কোরআন খতম দিলে গরম জিলাপি অর্থাৎ শিরনি বিতরণ করা হত। বোধকরি কোরআন খতম দেওয়ার আগেই আমাদের আরবি পাঠের সমাপ্তি ঘটে। তবে আমরা কয়েকটি সুরা মুখস্থ করে নামাজ পড়া শিখে ফেলেছিলাম। এরপর আর পরিবার থেকে আমাদের উপর তেমন কোনো চাপ ছিল না। মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে টাউন মসজিদে নামাজ পড়তে যেতাম, তবে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়া ছিল বাধ্যতামূলক। শেষ বয়সে এসে আজ উপলব্ধি করছি বাল্যকালের এই শিক্ষাটি ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ২০০০ সালে ভাতিজা হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজব্রত পালন করার পর নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করলাম। কোরআন শরিফ পড়তে গিয়ে দেখলাম এই সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেও সবকিছু স্পষ্ট মনে আছে, শুধু উচ্চারণে খটকা লাগত। ছেলেবেলায় নামাজ পড়া রপ্ত না করলে হয়তো পরবর্তীকালে আর নামাজই পড়া হত না। ছেলেবেলার টাউন মসজিদের সেই হুজুরদের নাম মনে নেই। হয়তো তারা বেঁচে নেই। আজ আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের স্মরণ করছি। আল্লাহ তাদের বেহেশত নসিব করুন।
সুনামগঞ্জ জেলায় মসজিদের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। নির্মাণশৈলী ও অপূর্ব কারুকাজের জন্য পাগলা বা রায়পুর বড় মসজিদ বিখ্যাত। কলকাতা থেকে রাজমিস্ত্রী এনে দশ লাখ টাকা ব্যয়ে ইয়াসিন মির্জা দশ বছরে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন (১৯৩১-৪১)। দৃষ্টিনন্দন আরও মসজিদ আছে জেলার বিভিন্ন স্থানে। সুনামগঞ্জ শহরের মহল্লায় মহল্লায় এখন মসজিদ। পৌরসভার বর্ধিত এলাকাসহ শহরে বর্তমানে অর্ধশতাধিক মসজিদ আছে। সেগুলো হল ষোলঘর মসজিদ, আলিমাবাগ মসজিদ, টাউন মসজিদ, পূর্ব বাজার মসজিদ, আরফিন নগর মসজিদ, তেঘরিয়া মসজিদ, তেঘরিয়া গাজীর দরগাহ মসজিদ, তেঘরিয়া পীর মহল্লা মসজিদ, বায়তুল মামুর মসজিদ, জেল মসজিদ, জামতলা মসজিদ, বিএডিসি মসজিদ, নিউ কোর্ট মসজিদ, মদনীয়া মাদ্রাসা মসজিদ, বড়পাড়া মসজিদ, জামাইপাড়া মসজিদ, ষোলঘর গুম্বজওয়ালা মসজিদ, ওয়াপদা মসজিদ, কলোনি মসজিদ, মোহাম্মদপুর মসজিদ, দরগাহ মসজিদ, আলীপাড়া মসজিদ, বনানিপাড়া মসজিদ, হাসন নগর মসজিদ, নয়া হাসননগর মসজিদ, হাসন নগর কলেজ বোর্ডিং মসজিদ, কুরিয়ার পাড় মসজিদ, সুলতানপুর মসজিদ, আফতাবনগর মসজিদ, হসপিটাল মসজিদ, জামায়াত মসজিদ, বিলপাড় মসজিদ, নবীনগর মসজিদ, দোজা মার্কেট মসজিদ, ফুড অফিস মসজিদ, কেন্দ্রিয় গোরস্থান মসজিদ, থানা মসজিদ, পুলিশ লাইন মসজিদ, দক্ষিণ হাজিপাড়া মসজিদ, মল্লিকপুর মসজিদ, বিডিআর ক্যাম্প মসজিদ। ওয়েজখালি বাজার মসজিদ, কালিপুর মসজিদ ও জলিলপুর মসজিদ। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি জামে মসজিদ। একটি ছোট শহরে এত মসজিদ ! রাজধানী ঢাকা যদি হয়ে থাকে ‘মসজিদের নগরী’ তাহলে সুনামগঞ্জ কেন হবে না ‘মসজিদের শহর’ ?
ছোট সময় থেকেই দেখে এসেছি সুনামগঞ্জের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক। সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া আগেও যেমন লাগেনি, এখনও না। সুনামগঞ্জ জেলায় মসজিদের পাশাপাশি মন্দিরও আছে। মোট ৭৬০টি। গির্জা আছে ৬১টি। সুনামগঞ্জ শহরের কালীমন্দির, জগন্নাথ মন্দির ও বৈষ্ণবদের আখড়া অতি প্রাচীন। পলাশের জমিদার রায়বাহাদুর অমরনাথ রায় ছিলেন সুনামগঞ্জের প্রথম পৌর চেয়ারম্যান। আমরা তাকে দেখিনি। তবে আমাদের বাল্যকালে যারা জাতি-ধর্ম নির্বশেষে সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তাদের মধ্যে রায়বাহাদুর অমরনাথ রায়ের ভাই আইনজীবী জিতেন্দ্রনাথ রায় (চারুবাবু) ও সমাজসেবক মন্মথনাথ রায় (পিলুবাবু), সাবেক মন্ত্রী অক্ষয়কুমার দাশ, আইনজীবী হেমচন্দ্র চৌধুরী, যামিনীকান্ত দেব ও যামিনী শ্যাম এবং সংস্কৃতিসেবী মনোরঞ্জন চৌধুরী (রঞ্জুবাবু) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। স্কুলে আমাদের বার্ষিক মিলাদ মাহফিলে হিন্দু ছাত্ররা আসত; আমরাও যেতাম তাদের সরস্বতী পূজায়। চারুবাবু তো শহরের কোনো কোনো মিলাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতাই দিতেন। ঈদের নামাজ শেষ হলে দেখা যেত প্রাক্তন মন্ত্রী অক্ষয়কুমার দাশ দাঁড়িয়ে আছেন সকলকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। বিবাহ অনুষ্ঠানে উভয় ধর্মের লোকজন উপস্থিত থাকতেন। একবার চৈত্র সংক্রান্তির দিনে বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে হোসেন তওফিক চৌধুরী ও আমি চারুবাবুর বাসায় গিয়েছিলাম। অনেক মিষ্টান্ন খাইয়েছিলেন আমাদের। এক অপূর্ব শ্রদ্ধার নিদর্শন দেখিয়েছিলেন শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রাধারমন দাস। পৌর চেয়ারম্যান আবু হানিফা আহমদ (নওয়াব মিয়া), লক্ষণছিড়ির জমিদার আনোয়ার রাজা চৌধুরীসহ শহরের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিকেলে বাজারে তার দোকানে (বর্তমান দাস ব্রাদার্স) আড্ডায় বসতেন। নওয়াব মিয়ার বসার জন্য রাধারমন একটি চেয়ার তৈরি করেন। এই চেয়ারে শুধু নওয়াব মিয়াই বসতেন। অন্য কাউকে বসতে দেওয়া হত না। নওয়াব মিয়ার মৃত্যুর পর রাধারমন চেয়ারটি তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। নওয়াব মিয়ার ছেলে অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির জাহানূর (প্রয়াত)ও রাধারমনের ছেলে রঞ্জিতকুমার দাস কটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন।
সুনামগঞ্জ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) গঠিত হয় ১৮৭৭ সালে। ঠিক তার ৪১ বছর পর ১৯২৮ সালে টাউন মসজিদটি নির্মিত হয়। এই মসজিদ স্থাপনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন সাবরেজিস্ট্রার হাবিবুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন প্রশাসনের সেকেন্ড অফিসার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের প্রদত্ত চাঁদায় একটি টিনের ঘর তৈরি করে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম প্রথম পাঞ্জেগানা বা পাঁচ ওয়াক্তের নামাজে মাত্র ২০ জন মুসল্লি শরিক হতেন। আস্তে আস্তে সংখ্যা বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ আমলেই বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের দাদা আব্দুর রহিম সুনামগঞ্জের মহকুমা হাকিম হয়ে এলেন। তার ঐকান্তিক চেষ্টায় মসজিদটির ভিত পাকা হয়েছিল। তবে ষোলঘর ও আলিমাবাগ মসজিদের অস্তিত্ব ছিল আগে থেকেই।
দৃষ্টিনন্দন ষোলঘর মসজিদটি মোঘল আমলের ঐতিহ্য বহন করছে বলে কেউ কেউ দাবি করেন। কয়েক বছর আগে পুরনো মসজিদ ভেঙ্গে নতুন মসজিদ নির্মাণের সময় প্রাচীন দেওয়ালের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। মসজিদ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রউফের (মরহুম) উদ্যোগে ইটের নমুনা প্রতœতত্ত বিভাগে পাঠালে পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানানো হয়, এই স্থাপনা চার শ’ বছর আগের। ১৩৮৪ সালে হযরত শাহজালালের সিলেট বিজয়ের পর তার সঙ্গী হযরত শাহ কামাল কুহাফাহ-এর দ্বিতীয় ছেলে শাহ মোয়াজ্জম উদ্দিন কোরেশি জগন্নাথপুরের শাহপাড়া থেকে লাউড় রাজ্য শাসন করতেন। তখন তিনি বর্তমান সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরের নিকটে নিজগাঁও নামক স্থানে একটি দ্বিতীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তিনি বা তার কোনো বংশধর সেখানে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন কি না তার রেকর্ড নেই। আর যদি করে থাকেন তাহলে সেটাই কি ষোলঘর মসজিদ ? মনিপুরে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে ১৩৩৬ সালের ‘সাদা পানির বান’ এবং ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ‘বড় ভৈশাল’ বা বড় ভূমিকম্পে বর্তমান সিলেট বিভাগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমনও তো হতে পারে যে, ঐ সময় মসজিদটি ভূ-গর্ভে তলিয়ে যায়। আমার এই উক্তিটি সম্পূর্ণ অনুমানভিত্তিক; ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ নেই। তবে মাটির তলদেশ থেকে প্রাপ্ত ইটের আরও প্রতœতাত্তিক পরীক্ষা ও বিচারবিশ্লেষণ হলে সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। আর সেই সঙ্গে আবিষ্কৃত হবে ষোলঘর মসজিদের ইতিহাস।
১৮৮৪ সালে আলিমাবাগ মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন মুশাররফ আলী মোক্তার। তার বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর। কোর্টে উকিল-মোক্তারদের আনাগোনা বেশি হওয়ায় তিনি চলে যান প্রথমে কাছাড়ের হাইলাকান্দি ও পরে করিমগঞ্জ। মহকুমা আফিসার (এসডিও) যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জির অনুরোধে তিনি সুনামগঞ্জে বসতি স্থাপন করেন। এসডিওর সুপারিশে লক্ষণছিরির জমিদার মরমী কবি হাসন রাজা শহরে তাকে একখ- জমি দেন। স্ত্রী আলিমুন্নেসার নামে এর নামকরণ হয় ‘আলিমাবাগ’। তার ছেলে মুনাওওর আলী আসাম প্রদেশের মন্ত্রী ছিলেন। সম্ভবত ব্রিটিশ আমলেই মসজিদটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। কারণ পঞ্চাশের দশকে আমরা এর কোনো অস্তিত্ব দেখতে পাইনি। কয়েক বছর হল মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয়েছে। এটিই সুনামগঞ্জের একমাত্র মসজিদ যেখানে মহিলারা জামাতে নামাজ আদায় করেন।
ষোলঘর গম্বুজওয়ালা মসজিদেরও একটি কাহিনি আছে। ল-ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট মাওলানা মোবারক আলী খুব পরহেজগার লোক ছিলেন। সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত গৌরীপুরের কাছারির অনতিদূরে ম্যানেজারের বাসভবনে তিনি থাকতেন। তার আট দশ জন সন্তানকে নিয়ে বাসার ড্রয়িংরুমেই জামায়াতে নামাজ পড়তেন। পাড়ার তিন স্কুলছাত্র মামুনূর রশীদ চৌধুরী, আজিজুর রহমান ও সাজিদুর রহমান উৎসাহিত হয়ে তাদের সঙ্গে নামাজে শরিক হত। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব প্রায়ই মাগরিবের নামাজের পর তার বাসায় জিকির-আসকার ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন। বিভিন্ন স্থান থেকে তার ভক্তরা আসতেন। মাসকয়েকের মধ্যেই তিনি তার বাসার দক্ষিণের ডোবায় (সরকারি খাসজমি) মাচাং বেঁধে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি নিজেই ইমামতি করতেন। তবে মুয়াজ্জিন এনেছিলেন তার নিজের জেলা নোয়াখালি থেকে। জামিনপ্রার্থী আসামিদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে দুই বছরের মধ্যেই তিনি সেখানে পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন। মহল্লাবাসীরা এর নাম দেয় ‘মাওলানা মোবারক আলী গম্বুজওয়ালা মসজিদ’। তবে তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পর মহল্লাবাসীরা ‘মাওলানা মোবারক আলী’ শব্দটি বাদ দিয়ে দেন। এখন এর নাম ‘গম্বুজওয়ালা মসজিদ’।
আরফিন নগর ও তেঘরিয়া মসজিদও বেশ পুরনো। সুনামগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে পূর্ব বাজার মসজিদটি আমাদের চোখের সামনেই স্থাপিত হয় ১৯৫৬ সালের ১৩ মার্চ। অনেক বছর আগে হাসন নগরে পৌরসভার পুকুরের দক্ষিণÑপশ্চিম পাড়ে মসজিদ নির্মাণে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছিলেন ঐ পাড়ার জৈনউদ্দিন আহমদ, আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, কাজী শামসু মিয়া, আব্দুর রইস, আসকর আলী, আঞ্জব আলী, আবু নসর মুহাম্মদ ইয়াহিয়া, আফতাব আালী খান, ফারুক চৌধুরী, শাহবাজুর রহমান চৌধুরী, সাদিরউদ্দিন আহমদ মন্তু মিয়া ও আব্দুল মুকিত প্রমুখ। মসজিদটিকে বড় ও দৃষ্টিনন্দন করার লক্ষ্যে ভরাটকৃত পুকুরের এক খ- জমি বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মেয়র আইয়ুব বখত জগলুল। কিন্তু তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
আমাদের বাল্যকালে শহরে কোনো ঈদগাহ ছিল না। ফলে টাউন মসজিদেই দুই ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হত। শবে বরাতের সময় শত শত লোকের সমাগম হত মসজিদে। আমাদের মতো ছেলেদের প্রধান আকর্ষণ ছিল ঐ ঐতিহ্যবাহী তোষা শিরনি। তখন মসজিদের ইমাম ছিলেন সৈয়দপুরের সৈয়দ আলকাব আলী। জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর গ্রামের সবাই সৈয়দ। পিতৃতুল্য ইমাম সাহেব অত্যন্ত পরহেজগার ও আলেম ছিলেন। পরবর্তীকালে তার জামাতা সৈয়দ আফতাব আলী ও নাতি সৈয়দ নজরুল ইসলামও এই মসজিদে ইমামতি করেন। জকিগঞ্জ থেকেও একাধিক ইমাম এসেছেন এই মসজিদে। মুয়াজ্জিন ছিলেন আরফিন নগর লম্বাহাটির মকসুদ আলী। তিনি আইনজীবী আলহাজ মফিজ চৌধুরীর মুহরি বা অ্যাডভোকেট ক্লার্ক ছিলেন। অত্যন্ত অমায়িক প্রকৃতির লোক ছিলেন মুয়াজ্জিন সাহেব। তখনকার দিনে মসজিদে কোনো মাইকের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে তাকে উঁচু মিনারের চূড়ায় উঠে আজান দিতে হত। হাসন নগর থেকেও আমরা তার সুললিত কণ্ঠে আজানের ধ্বনি শুনতে পেতাম। ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেই কাকডাকা ভোরে ফজরের নামাজের আজান দেওয়ার জন্য মাইল দুয়েক পথ পায়ে হেঁটে তিনি মসজিদে আসতেন। মাইকের বদৌলতে এখন তো মুয়াজ্জিন মসজিদের ভেতর থেকেই আজান দেন, সিড়ি বেয়ে মিনারের চূড়ায় উঠতে হয় না। বর্তমানে অধিকাংশ মসজিদেই ইমাম ও মুয়াজ্জিনের থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে।
আমাদের ছেলেবেলায় শহরে হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ ছিল। পাঞ্জেগানা নামাজে সবাই মসজিদে আসতে পারতেন না। তবে জুমার দিনে টাউন মসজিদে স্থান সংকুলান হত না। মহকুমা হাকিম বা অন্য সরকারি কর্মকর্তারা ছাড়া আর যারা এই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন তারা হলেন জননেতা আলহাজ মফিজ চৌধুরী, মকবুল হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হান্নান চৌধুরী, আব্দুল খালেক আহমদ ও দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী; কলেজের অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ও উপাধ্যক্ষ নজিরউদ্দিন চৌধুরী; আইনজীবী সৈয়দ আওসাফ হোসেন, রফিকুল বারী চৌধুরী ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী; ডা. আহমেদ রেজা (বিহারি ডাক্তার) ও ভাটিপাড়ার জমিদার গোলাম সারওয়ার চৌধুরী (কাচা মিয়া) প্রমুখ। টাউন কমিটির (বর্তমানে পৌরসভা) চেয়ারম্যান আবু হানিফা আহমদ (নওয়াব মিয়া) ষোলঘর মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। এই বিদগ্ধজনেরা জুমার নামাজের পরে মসজিদের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতেন। মসজিদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন আলহাজ মফিজ চৌধুরী ও সৈয়দ আওসাফ হোসেন মোক্তার।
টাউন মসজিদের গা ঘেঁষে আছে ফুটবল খেলার মাঠ ‘এ’ টিম ফিল্ড। এছাড়া ছিল দু’টি চায়ের স্টল এবং অনতিদূরে কাজি অফিস। একটি স্টলের মালিক ছিলেন আব্দুল আহাদ মিয়া। অন্যটি চালাতেন জকিগঞ্জের কোনো এক ব্যক্তি। এর নিচে ছিল একটি ডোবা। এই ডোবার পানি ছিল দুর্গন্ধময় এবং পরিবেশ ছিল নোংরা। উভয় স্টলেই পাওয়া যেত সুস্বাদু পরোটা, রসগোল্লা, বুন্দিয়া, বালুশাই, আমিত্রি, জিলাপি, ছানার সন্দেশসহ ভাত, মাছ এবং মুরগি ও খাসির মাংস। মাঝে মাঝে গরুর মাংসও পাওয়া যেত। দুই চা-স্টলের দোতলায় সস্তায় থাকার ব্যবস্থাও ছিল। মফঃস্বল থেকে আগত মক্কেলদের অনেকে সেখানে রাত কাটাতেন। আহাদ মিয়ার চায়ের দোকানের একটি ঘটনা এখনও ভুলিনি। একদিন মরাটিলার মাঠে ফুটবল খেলা শেষে কয়েকজন বন্ধু বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি পাঁচ টাকার একটি নোট রাস্তায় পড়ে আছে। পথচারী সবাইকে এই নোটের কথা জিজ্ঞেস করলাম। কেউ এই টাকার দাবিদার হল না। আমি টাকাটা রাস্তায়ই রেখে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলাম। কিন্তু অন্যরা বলল, রাস্তায় ফেলে রাখলে কেউ নিয়ে যাবে। এর চেয়ে কারো কাছে এটি রাখ, কি করতে হবে কাল সিদ্ধান্ত নেব। পরদিন আহাদ মিয়ার চায়ের স্টলে এই টাকা দিয়ে সবাই মিলে পরোটা-মিষ্টি খাই। আহাদ মিয়া আমাদের পাড়ায়ই থাকতেন। তিনি কথাচ্ছলে আমার বাবাকে বললেন, ‘গতকাল আপনার ছোট ছেলে ও তার বন্ধুরা আমার দোকানে এসে মিষ্টি খেয়ে গেছে।’ বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলে পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললাম। তার প্রশ্ন ছিল : ‘এই টাকার মালিক কি তোমরা ছিলে ?’ বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তাহলে পরের টাকা নিলে কেন ? এটা তো চুরির সমান।’ এরপর লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করলেন বাবা। শেষে বললেন, ‘জীবনে কোনোদিন পরের জিনিষে হাত দিবে না।’ এই প্রহার আমার জীবনে কাজে লেগেছে। সেই থেকে আমার নিজের না হলে আমি অন্যের জিনিষে হাত দিই না। কয়েকবারই এরকম টাকা আমার সামনে এসেছে; কিন্তু আমি স্পর্শও করিনি। এই ঘটনা ছিল আমার চরম শিক্ষা, জীবন গঠনে কাজে লেগেছে।
শহরে আর যত মসজিদই স্থাপিত হোক না কেন, টাউন মসজিদের গুরুত্ব কখনও হ্রাস পাবে না। সম্প্রতি কোর্টভবন অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। তারপরও টাউন মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় কমেনি। মহকুমা বা জেলা প্রশাসকগণ ছাড়াও জননেতারা এই মসজিদের উন্নয়নের জন্য অর্থের সংস্থান করেছেন। একবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ (এখন মরহুম) নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে গেলে শহরের মুরব্বিরা মসজিদের উন্নয়নের জন্য তার সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি কোনোরকম আশ্বাস না দেওয়ায় উপস্থিত অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন। পরবর্তী সফরে তিনি আবার মসজিতে যান এবং নামাজের পর গণ্যমান্যদের ডেকে একত্রিত করেন। তিনি পকেট থেকে পাঁচ লাখার টাকার একটি চেক বের করে দিলেন। ‘কোনো এক সদাশয় ব্যক্তি এই চেকটি মসজিদের উন্নয়নের জন্য দিয়েছেন,’ এই উক্তি করে তিনি বললেন, ‘এই টাকা আমার নয়, সরকারেরও নয়। দাতা তার নাম প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। যার মাল তার যকাত।’ এরকম অনেকেই গোপনে মসজিদে দান করেন।
আমি সাধারণত বকরা ঈদে (কোরবানির ঈদ) সুনামগঞ্জ যাই এবং ঈদগাহে নামাজ আদায় করি। কিন্তু অনেকদিন টাউন মসজিদে নামাজ পড়ার সুযোগ হয়নি। গত বছর বকরা ঈদের পরপরই শিক্ষানুরাগী আকিকুর রেজা চৌধুরীর স্ত্রী আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী মঈদুল হক চৌধুরীর আম্মা ইন্তেকাল করলে আমি নামাজে জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য টাউন মসজিদে যাই এবং সেখানে জোহরের নামাজ আদায় করি। স্বাভাবিকভাবেই এই মসজিদের প্রতি আমার কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। সরকারি জুবিলি হাইস্কুলে যখন পড়তাম তখন অনতিদূরের এই মসজিদে জোহরের নামাজ পড়া আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। নামাজ না পড়লে সহকারি প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী স্যার কাউকে ছাড় দিতেন না। আমাদের ক্লাসের যারা নামাজ আদায় করেছে তাদের একটি তালিকা রোজ তাকে দিতে হত। এবং এই গুরু দায়িত্ব বর্তে ছিল আমার উপর। সহপাঠী দেওয়ান শামসুল আবেদিন (সাবেক সাংসদ) আজও আমাকে বলে, ‘তোর জন্যই স্যারের হাতে মার খেতাম।’ মসজিদের সামনের গর্ত ভরাট করার পর ঈদগাহ হয়েছে। কয়েক হাজার লোক নামাজ আদায় করতে পারেন। একটি বোর্ডিংও নির্মাণ করা হয়েছে। ভাড়া পায় মসজিদ। লাইনের পানি না থাকলে মুসল্লিরা পুকুরের পানিতে ওজু করেন। যখন লাইনের পানি ছিল না, তখন তো এই পুকুরের স্বচ্ছ পানিতেই সবাই ওজু করতেন। এখন পুকুরটি অত্যন্ত নোংরা ও অস্বচ্ছ। পুকুরে মাছ চাষ হয় বলে শুনেছি। মসজিদটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার যথেষ্ট সুযোগ আছে। অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান যদি এদিকে দৃষ্টি দেন তাহলে অচিরেই তা সম্ভব। মসজিদে তার নেক নজর পড়লে আর কাউকে চিন্তা করতে হবে না। তার অকৃত্রিম চেষ্টায় টাউন মসজিদটি অচিরেই দৃষ্টিনন্দন হবে এই আশা করছি। আল্লাহর রহমতে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক মসজিদে নামাজ আদায় করার সুযোগ আমার হয়েছে, কিন্তু আহামরি কিছু না হলেও আমার ছেলেবেলার এই প্রিয় মসজিদটির কথা আমি কোনোদিন ভুলিনি। টাউন মসজিদের স্থান আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে।
হাসান শাহরিয়ার : প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস।


