সাইদুর রহমান আসাদ
দুই দিন ধরে না খেয়ে আছি। পরিবারের লোকজনও না খেয়ে আছে। পেট তো মানে না। তাই পেটের জ¦ালায় গাড়ি নিয়ে বের হইছি। কথাগুলো ভাঙ্গারি টোকাই জালাল মিয়ার। বয়সে তরুণ মাত্র ২৪ বছর বয়সেই সুনামগঞ্জের অলিগলিতে পড়ে থাকা বোতল, প্লাস্টিক সংগ্রহ করে সে। করোনা সক্রমন ঠেকাতে সরকারের এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউনে অন্য আট দশজনের মতো সেও বেকায়দায় পড়েছে। গেল ৩ দিন ধরে প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে তার ভ্যানগাড়ি নিয়ে বের হতে পারে নি। তাই কোনো আয় রোজগার হয় নি।
জালাল মিয়া বললেন, ৪ ভাই ২ বোনের সংসার তার। বয়সের ভারে বাবা অনেক আগেই কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। এই ৮ জনের পরিবার চালাতে তার অন্য ভাইয়েরা রিকশা চালায়। এজন্যে অভাব অনটনের সংসার নামকাওয়াস্তেÍ চলতো আগে থেকেই। কিন্তু করোনা এসে টানাটানির সংসারে দুর্দশা বেড়েছে। জীবন চালানোই যন্ত্রণা হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ কঠোর লকডাউনের ফলে একেবারে শূন্য হাত হয়েগেছে সবার। লকডাউনের প্রথম দিন টেনেটুনে চলা গেলেও গত দ্বিতীয় দিনে একদম চুলায় হাঁড়ি বসে নি তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের দেয়া একসপ্তাহ লকডাউনে বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর শ্রমজীবী লোকজন। অনেকে কাজ হারিয়েছেন। আবার অনেক দিনমজুর নিজের কাজে ফিরতে চাইলেও কাজ মিলছে না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দিন শেষে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর থানার বাসিন্দা কালাগাজি। ১২ বছর ধরে সুনামগঞ্জে বাস করে ফেরি করে ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন মাঝ বয়সি কালাগাজির কাঁদে উঠে তাঁর বয়সের চেয়েও দ্বিগুণ নতুন নতুন হাঁড়ি পাতিলের ভার। পা টিপে টিপে চলে, মানুষের বাড়ি বাড়ি এসব জিনিসপত্র বিক্রি করতেন তিনি। এতে ভালোই আয় হতো তাঁর। শহরে ১৫শ’ টাকা বাসা ভাড়া ও থাকা খাওয়ার খরচ মিটিয়ে মাস শেষে কিছু টাকা পরিবারের কাছে পাঠাতেন। কিন্তু গেল চার দিন ধরে তিনি বাসা থেকে বের হতে পারেন নি। এতে আয়- রোজগারও হয়নি।
কালাগাজি বললেন, হাঁড়ি পাতিল প্রতিদিন মহাজনের কাছ থেকে নিয়ে ফেরি করে বিক্রি করতাম। দিন শেষে যা হতো মহাজনকে দিয়ে আমার ভালোই থাকতো। এখন কঠোর লকডাউনের ফলে এক সপ্তাহ বের হতে পারি নি। উল্টো মহাজনের কাছ থেকে ঋণ করে চলছি। এই কয়দিনে মহাজনের কাছে ১৫শ’ টাকা ঋণী হয়েছি। তাই লকডাউন অমান্য করে আজকে হাঁড়ি পাতিলের ভার নিয়ে বের হয়েছি। তবে এখনও একটাকাও বিক্রি করতে পারি নি।
রিকশা, সাইকেলের মেকার মো. আব্দুল সালাম। পৌর শহরের মল্লিকপুরের বাসিন্দা তিনি। তিনি বললেন, ‘লকডাউন দিয়েছেন ভালো। ভাইরাসের প্রকৌপ কমুক এইটাও আমরা চাই। তবে আমরা খাবো কি? কেউ তো এখনও কোনো সাহায্য সহযোগিতা করছেন না। আমরা কিভাবে চলমু, কিভাবে খাইমু এনিয়ে কেউ কিছু বলে না। এখন ধারদেনা করে কোনোবায় কোনোবায় চলতাছি। এই লকডাউনে আমরারে একেবারে জানে মারিলিছে।’
রিকশা চালক গোলচান্দ বললেন, আমার ৫ ছেলে মেয়ে। সবাই ছোট। কেউ এখনও কাজ করবার উপযুক্ত হয়নি। তাই আমি একাই রিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। রিকশার চাকা ঘুরলে পেট চলে। লকডাউনের আগে যে রোজি করছি তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলছে। আর এখন সারাদিনে দুইশ’ টাকাই রোজি করতে পারি না। বউ বাচ্চা নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন যাইতেছে।
রিকশা চালক জয়নাল আবেদীন বললেন, লকডাউনে চলতে পারছি না। বাচ্চা কাচ্চাদের খাওয়াইতে পারছি না। আমরারতো এখন জীবন বাঁচানো ধমারধম (কষ্ট)! যাদের সরকারি চাকরি আছে তাদের তো সমস্যা নেই। বেতন ঠিক মতো পায়। আমরা কষ্ট করে মেহনত করে খাই। শান্তি যা ছিলো চলে গেছে, এখন লকডাউনে অশান্তির দিন আসছে।
হাছন নগরের বাসিন্দা হেলেনা বললেন, তিনি মানুষের বাসায় কাজ করতেন। করোনা ভাইরাসের কারণে বাসায় কাজ হারিয়েছেন তিনি। এখন সারাদিন মানুষের বাসায় বাসায় কাজের জন্য ঘুরেন। দিন শেষে কাজ না পেয়ে খালি হাতে বাসায় ফিরতে হয় থাকে।
এবিষয়ে সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি অ্যাড. খলিল রহমান বললেন, সরকার এর আগে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এবার এখনও সাহায্য সহযোগিতা দেবার কোনো কার্যক্রম আমরা দেখছি না। যাদের লকডাউনের আওতায় বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান নেই তাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের স্বচ্ছল মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
লকডাউনে বিপাকে পড়া মানুষদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাহায্য সহযোগিতা রয়েছে কিনা? এবিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, দুই একদিনের মধ্যেই আমরা ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করবো। আগামীকাল সাচনা বাজারে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে। আমি সেখানে যাবো। এভাবে পর্যায়ক্রমে সব জায়গায় বিপাকে পড়া মানুষদের মানবিক ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে।


