খুলেছে পর্যটনের দুয়ার/ জেলার পর্যটন স্পটগুলো আগের রূপে ফিরেনি

স্টাফ রিপোর্টার
খুলেছে পর্যটনের দুয়ার, প্রায় দেড়মাস পর দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক) সহ সীমান্তের পর্যটন স্পটগুলোর নিরবতা ভেঙেছে পর্যটকদের উপস্থিতিতে। ছুটির দিনে ভ্রমণ পিপাসুরা আসছেন সুনামগঞ্জ সীমান্তের প্রকৃতির লীলাভূমিতে। তবে এখনো সেভাবে জমেনি পর্যটন স্পটগুলো, ফিরেনি আগের রূপে। বন্যার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর আটকে পড়া, বেশ কিছুদিন টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক প্রবেশে বাধা নিষেধ থাকায় হাওরের ‘রাজধানী খ্যাত’ সুনামগঞ্জে পর্যটক আগমন কমেছে।
রূপে-গুণে অনন্য টাঙ্গুয়ার হাওর। পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয়। প্রাকৃতিক বন, পরিযায়ী ও দেশি পাখির নিরাপদ আবাসস্থলও এটি। দেশের অন্যতম সুন্দর ও জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ সম্ভাবনাময় একটি জলাভূমি। অপার সৌন্দর্যের টাঙ্গুয়ার হাওর ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হাওরের সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি রয়েছে বেসরকারি উদ্যোগও। সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার বিশাল এলাকা নিয়ে এই হাওরের অবস্থান। ২টি উপজেলার ৪ ইউনিয়নের ১৮টি মৌজা মিলে হাওরের আয়তন ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। হাওরে ছোট বড় ১০৯টি বিল আছে। তবে প্রধান বিল ৫৪ টি। হাওরের ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য খাল ও নালা। বর্ষায় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ওই সময় হাওর রূপ নেয় সমুদ্রে। হাওর এলাকার ৮৮টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ হাওরের ওপর নির্ভরশীল। হাওরের উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। এই পাহাড় থেকে ৩৮টি ঝরনা নেমে এসে মিশেছে টাঙ্গুয়ার হাওরে।
টাঙ্গুয়ার হাওরে ঢোকার একাধিক প্রবেশ পথ আছে। যারা তাহিরপুরের লাউড়েরগড় হয়ে যাবেন তাদের জন্য বাড়তি পাওয়া আছে। এই পথে আছে পাহাড়ের বুক ছিড়ে নেমে আসা অপরূপা যাদুকাটা ও শহীদ সিরাজ লেক, আছে শিমুল বাগানও।
গত ১৬ জুনের প্রলয়ংকরী বন্যার সময় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের বেশ কিছু শিক্ষার্থীসহ সারা দেশ থেকে আসা পর্যটকেরা তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জে আটকা পড়েছিলেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও স্থানীয় গণ্যমান্যদের প্রচেষ্টায় দুইদিন পর সুনামগঞ্জ থেকে লঞ্চে সিলেট পৌঁছানো হয় এসব পর্যটকদের।

১৬ জুনের পর এক মাসেরও বেশি সময় হাওরে অস্বাভাবিক পানি থাকায় পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।
ভয়াবহ বন্যার পানি সরার পর বুধবার (৩ আগস্ট) পর্যটনের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের কিছু নির্দেশনা মেনে হাওরে যেতে হবে পর্যটকদের। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, হাওরে ভ্রমণকালে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নিতে হবে, হাওরে রওয়ানা হবার আগে তাহিরপুর থানায় নিরাপত্তার জন্য জিডি করা, যে কোন কিছু কেনার আগে দামাদামি করে নেওয়া, একসাথে গ্রুপ করে যাওয়া, হাওরে বজ্রপাত হলে নৈাকার ছৈয়ের নীচে অবস্থান করা, খাবারের উচ্ছিষ্ট পানিতে না ফেলা, উচ্চ শব্দ ব্যবহারকারী মাইক বা যন্ত্র পরিহার করা, রাতের বেলা অতিরিক্ত আলো না জ্বালানো, টাঙ্গুয়ার জীববৈচিত্র হুমকির মধ্যে পড়ে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা, নৌযানকে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে, নিবন্ধনপত্র হস্তান্তরযোগ্য নয়, নিবন্ধনপত্র সার্বক্ষণিক নৌযানে দর্শনীয় স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। এসব শর্ত মেনে পর্যটক এবং পর্যটকবাহী নৌ-চলাচল করতে হবে।
রবিবার সকালে টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা হবিগঞ্জের পর্যটক ধ্রুব বলছিলেন, ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জের অন্য পেশাজীবীদের মতো পর্যটনের সঙ্গে জড়িতরা সংকটে পড়েছেন। পর্যটকরা আসা শুরু হয়েছে। পর্যটকরা আসতে থাকলে এই পেশার সঙ্গে জড়িতদের সংকট কেটে যাবে।
একই এলাকা থেকে আসা রোকন মিয়া বললেন, করোনার কারণে নিষেধাজ্ঞা ছিল বহুদিন, এরপর বন্যার কারণে পর্যটকদের আসতে দেওয়া হয় নি। এখন আসছেন পর্যটকেরা, পর্যটক যতই বাড়বে, এখানকার বেকার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে সকলকে পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন থাকার আহ্বান জানালেন এই পর্যটক।
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবিকুল ইসলাম বললেন, অন্যান্য বছর এই সময়ে পর্যটকদের ভিড় থাকতো। পর্যটকবাহী নৌকা আগে থেকেই বুকিং থাকতো, ভাড়া করে অন্যান্য এলাকা থেকে ট্রলার এনে পর্যটকদের দেওয়া লাগতো। এবার ঘাটের ট্রলারগুলোই বসা আছে। তিনি জানালেন, বন্যার সময় কিছু লোকজন আটকাপড়ায় ভীতি ছড়িয়েছে। এরপর কিছুদিন প্রশাসন পর্যটকদের টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে বাধা দেওয়ায় পর্যটক আগমনে ভাটা পড়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানালেন, বন্যার সময় পর্যটক আটকে পড়া এবং পরে বেশি পানি, ঢেউ এবং বজ্রপাতের কারণে পর্যটক প্রবেশ কয়েকদিন নিষেধ করা হয়েছিল। এখন শর্ত মেনে পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা শুরু করেছেন। এখন পর্যটক আসা ক্রমেই বাড়বে।