গণিতের বিস্ময় বালক : রামানুজন

অনুপ নারায়ণ তালুকদার
যে কোন বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত সব সময় সমান ও একই ধ্রুবসংখ্যা। এই ধ্রুবসংখ্যাটিকে গ্রীক বর্ন  (পাই) দ্বারা প্রকাশ করা হয়।  (পাই) একটি অমূলদ সংখ্যা এবং দশমিকে প্রকাশ করলে এটি একটি অন্তহীন অপৌণ:পুণিক সংখ্যা।  (পাই) এর আসন্ন মান দশমিকের পর মিলিয়ন ঘর পর্যন্ত সঠিকভাবে বের করেন গণিতের বিস্ময় বালক শ্রীনিবাস রামানুজন।
ভারতের বর্তমান তামিলনাডু রাজ্যের ইরোড শহরে অবস্থিত মামার বাড়ীতে ১৮৮৭ সালের ২২ ডিসেম্বর রামানুজনের জন্ম। তাঁর পিতা কুপুস্বামী শ্রীনিবাস আয়েঙ্গাঁর ছিলেন স্থানীয় এক দোকানের কর্মচারী এবং মা কোমল তাম্মল ছিলেন  গৃহিণী। রামানুজনের বিদ্যালয় জীবন শুরু হয় পাঁচ বছর বয়সে। প্রাথমিক  শেষ পরীক্ষায় বর্তমান তামিলনাডু রাজ্যের তাঞ্জোর জেলার পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি প্রথম হন। ভর্তি হন কুম্ভকোনম টাউন হাইস্কুলে। ১৯০৩ সালে টাউন হাইস্কুলের শেষ পরীক্ষায় গণিতের বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তিনি ‘রঙ্গনাথ রাও পুরস্কার’ পান। এই বছর তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯০৪ সালে তিনি কুম্ভকোনম সরকারি কলেজে এফ.এ কোর্সে ভর্তি হন। কলেজে এসে রামানুজনের গণিতের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে লাগল। গণিত হয়ে উঠল তাঁর জীবনের সঙ্গী এবং একমাত্র অধ্যয়নের বিষয়। ফলে ইংরেজীতে কম নম্বর পাওয়ায় এফ.এ কোর্সের ২য় বর্ষে উঠা হলো না। ১৯০৬ সালে মাদ্রাজ পাপাইয়াচ্চা কলেজে আবার এফ.এ ক্লাসে ভর্তি হন। এখানেও তিনি ছিলেন গণিতের ক্লাসে উজ্জ্বলতম ও অনন্য। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে বাড়ি ফিরে আসতে হলো। পরে বাবার আগ্রহে প্রাইভেটে এফ.এ পরীক্ষা দেন কিন্তু গণিতে একশোর মধ্যে একশো পেয়েও অন্য বিষয়ে পাশ নম্বর না পাওয়ায় তাঁর কপালে এফ.এ ডিগ্রী জুটল না।
এফ.এ পরীক্ষায় ফেল করে রামানুজনকে কঠিন সময় পার করতে হলো। পর্যাপ্ত সময় পেয়ে তার গণিত সাধনা আরও গতি পায়। সংসারে মতি ফেরানোর জন্য ১৯০৯ সালে জানকী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হলো। বিয়ের পর চাকরির সন্ধানে মন দেন। এরমধ্যে রামানুজনের পাঠানো গাণিতিক সমস্যা ও সমস্যার কিছু সমাধান সহ তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র ইন্ডিয়ান ম্যাথেম্যাটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেই সময়ের মাদ্রাজের গণিত পরিমন্ডলের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা রামানুজনের অসামান্য গণিত প্রতিভার কথা ততদিনে জেনে গিয়েছেন। তাঁরা তাঁর শুভানুধ্যায়িতে পরিণত হয়েছেন। তাঁদের চেষ্টায় মাদ্রাজ পোর্ট অব ট্রাস্ট অফিসে রামানুজন কেরানির চাকরি নেন। চাকরিতে ঢুকেও তাঁর গণিত গবেষণা অব্যাহত থাকে। নিজের গণিত প্রতিভার দৌলতে তিনি পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং এর শুধু সুনজরে আসেন নি তার ¯েœহধন্য হয়ে উঠেন। আর ম্যানেজার নারায়ণ আয়ার ক্রমে তাঁর শুভার্থী ও বন্ধুতে পরিণত হন। একদা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক যেশু আয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ়তর হয়। তাঁর (যেশু আয়ার) পরামর্শে তিনি কেমব্রিজ ট্রিটিনি কলেজের খ্যাতিমান অধ্যাপক জি.এইচ হার্ডিকে চিঠি লিখেন। তারিখটি ছিল ১৯১৩ সালের ১৬ জানুয়ারী। চিঠিটি গণিত ইতিহাসের বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ। চিঠিটির সঙ্গে রামানুজন নিজের আবিস্কৃত বেশকিছু সূত্র ও উপপাদ্য হার্ডিকে পাঠিয়েছেন। অজানা এক কেরানির কাছ থেকে প্রমাণহীন একগাদা উপপাদ্য পেয়ে হার্ডি আদ্যে খুশি হননি। তবে সেদিন সন্ধ্যায় সহকর্মী অধ্যাপক জে.ই লিটল উডকে সঙ্গে নিয়ে উপপাদ্যগুলো মূল্যায়ণ করতে বসেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিচার বিশ্লেষণ চলতে থাকে। তবে মধ্য রাত্রির আগে তারা নিশ্চিত হন এই পান্ডুলিপির লেখক হচ্ছেন ধ সংহ ড়ভ মবহরঁং.
অধ্যাপক হার্ডি বুঝতে পারলেন স্বশিক্ষিত এই ভারতীয় কেরানির গণিত প্রতিভা যথার্থ বিকাশের জন্য কেমব্রিজে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা একান্ত জরুরী। সে ব্যাপারে তিনি সচেষ্ট হলেন। তখন একটি কথার প্রচলন ছিল কালা পানির দেশে (ইংল্যান্ড) কেউ গেলে ফিরে আসে না তাই মায়ের তখন প্রবল আপত্তি। ফলে প্রথম দফায় তার ইংল্যান্ড যাত্রা বাধাগ্রস্ত হলো। একদিন রামানুজনের মা স্বপ্নে দেখলেন যে, কয়েকজন ইউরোপীয় রামানুজনকে ঘিরে বসে আছে আর নামগিরি কোমলতাকে আদেশ দিচ্ছেন তিনি যেন ছেলের আকাঙ্খাপূরনে বাধা হয়ে না দাঁড়ান। মা রামানুজনকে ইংল্যান্ডে যাবার অনুমতি দিলেন। এদিকে প্রথা ভেঙ্গে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ.এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও রামানুজনকে গণিত গবেষণা করার জন্য বৃত্তি প্রদান করে, তবে তার জন্য অনেকের সদর্থক ভূমিকা ও প্রভাব কাজ করছিল। অবশেষে ১৯১৪ সালের ১৭ মার্চ রামানুজন এস.এস নেভাসা নামক জাহাজে যাত্রা শুরু করে ১৪ এপ্রিল লন্ডনে এসে পৌঁছান।
ইংল্যান্ড থাকার সময় রামানুজন নানা উপাধি ও সম্মানের অধিকারী হন। তাঁর উচ্চমানের এক গবেষণা পত্রের জন্য ১৯১৬ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বি.এ ডিগ্রী প্রদান করে। ১৯১৭ সালে তিনি লন্ডন ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন।
এ বছরই তিনি “ফেলো অব রয়্যাল সোসাইটি” ও ফেলো অব ট্রিটিনি কলেজ” এ দুটি বিরল সম্মানে অধিকারী হন। কিন্তু ১৯১৭ সালেই হঠাৎ তিনি অসুস্থ  হয়ে পড়েন। ইংল্যান্ডে বাকী সময় মূলত নার্সিং হোম বা  স্যানাটোরিয়ামে অতিবাহিত হয়েছে। এদিকে অসুস্থ অবস্থায় রামানুজন যখন নার্সিং হোমে তখন অধ্যাপক হার্ডি তাঁকে দেখতে যান। তিনি একটি ট্যাক্সি করে এসেছেন, এর নম্বর হলো ১৭২৯। সংখ্যাটির তেমন কোন বৈশিষ্ট্য হার্ডির চোখে ধরা পড়েনি। কিন্তু হার্ডির কাছ থেকে সংখ্যাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রামানুজনের চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং তিনি বললেন, সংখ্যাটি অনন্য। তিনি আরও বললেন, ১৭২৯ হলো ক্ষুদ্রতম ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা যাকে দুটি ঘর এর সমষ্টি হিসাবে দুটি ভিন্নভাবে প্রকাশ করা যাবে। বাস্তবিকই ১৭২৯ = ১০৩+৯৩ = ১২৩+ ১৩।
১৯১৯ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারী ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা করে রামানুজন ২৭ মার্চ ভারতে এসে পৌঁছান। ১৯২০ সালের ২৬ এপ্রিল এই
মহান গণিতজ্ঞের মহাপ্রস্থান ঘটে মাদ্রাজের চেতপাট নামক স্থানে। সমগ্র গণিত জগত তাঁর তিরোধানে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
তথ্যসূত্র:
১.The man who knew infinity: A Life of Genius Ramanujan
২. উদ্বোধন, কলকাতা ২০১৪
৩. গণিত, অষ্টম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।