গণ-রাজনীতিক ডা. এম.এ করিম আর নেই

সু.খবর রিপোর্ট
দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সভাপতি ও সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার সম্পাদক ডা. এম এ করিম আর নেই।
বৃহষ্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আসগর আলি হাসপাতালে লাইফসাপোর্টে থাকা অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।
ডা . এম এ করিম এদেশের একজন প্রতিথযশা চিকিৎসক ছিলেন। শুধু চিকিৎসাশাস্ত্রকেই তিনি আত্তিকরণ করেননি। একইসঙ্গে এই অসম সমাজের উৎপীড়িত ও নিপীড়িত জনমানুষ তাদের সুখ দুঃখ, বেদনা-বঞ্চনাকে নিজের বলে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন । জনগণের স্বাস্থ্যসেবা এবং গণমুক্তির দর্শন ও সংগ্রামকে জীবনের ব্রত হিসাবে নিয়েছেন সেই তরুণ বয়স থেকেই । তাই তাঁর পেশা-পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার সমাজ বিপ্লবীর পরিচয় । ১৯২৪ সালের ১৫ জুলাই চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার উচ্চঙ্গা গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর নানা ছিলেন চাঁদপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী, বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক । তাঁর বাবার নাম আবদুল হাকিম, মায়ের নাম মেহের নিগার । ১৯৪৩ সালে তৎকালীন মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন এমএ করিম । সে সময়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের সহায়তার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল । কমিউনিস্টদের নিঃস্বার্থ কর্মতৎপরতা তরুণ করিম কে আকৃষ্ট করে । তাঁর ঘনিষ্টতা হয় তৎকালীন ছাত্রনেতা মোহাম্মদ তোয়াহার সাথে । করিমও দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান । একই সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য সংগ্রামী মানুষ হিসেবে। পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে গিয়ে পরিচিত হন কমরউদ্দিন আহমেদ, শামসুল হক, অলি আহাদ, তাজউদ্দিন আহমদ, ে ব্যারিস্টার শওকত আলী প্রমুখ তরুণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে । ১৯৫০ সালে জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়নকালে ঐ কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । ভিপি থাকাকালীন একই সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাপীড়িত জনসাধারণের সাহায্যার্থে জগন্নাথ কলেজে ত্রাণ শিবির খোলেন এবং দাঙ্গা প্রতিরোধে সক্রিয় অংশ নেন । এর আগে ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় বিহারের মুঙ্গের, পাটনা প্রভৃতি জায়গায দাঙ্গাপীড়িত মানুষদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য পূর্ব বাংলা থেকে বিহারে গিয়েছিলেন মেডিকেল টিম নিয়ে । মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রভৃতি দল গঠনের উদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে কাজ করে যান । তিনি মওলানা ভাসানীর সফরসঙ্গী হিসেবে চীন ও জাপান ভ্রমণ করেন । এ সময়ে মওলানা ভাসানী ও তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান কমরেড মাও সেতুং এবং প্রধানমন্ত্রী কমরেড চৌ এন লাই- এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন । গত শতকের ৫০ দশকের গোড়ার দিকে ঢাকার ১১৯ নবাবপুর রোডে প্রতিষ্ঠা করেন “কিশোর মেডিকেল হল” – যা ছিল সে সময়ে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির অঘোষিত কার্যালয় । ১৯৬২ সালে বিনা পরোয়ানায় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে । এ সময় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বিনা বিচারে পাঁচ মাস তাঁকে আটকে রাখা হয় । ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে গণসংগ্রামে ডা. করিম রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থেকেছেন । তিনি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি । এদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নির্ভীক মুখপত্র সাপ্তাহিক সেবা’র সম্পাদক। তিনি দুইটি আত্মজীবনীমূলক বই লিখেছেন। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় তাঁর নানা স্মৃতির সংকলন ‘ ঢাকা সেন্ট্রাল জেল : নানা রঙের দিনগুলি। তবে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ হলেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক অজানা কাহিনী এখানে বিবৃত হয়েছে। তার লেখা আর একটি বই ‘ কাসিমবাজার থেকে আগরতলা।
তাঁর মৃত্যুতে পৃথক পৃথক ভাবে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, কৃষক সংগ্রাম সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ, বারকি শ্রমিক সংঘ, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি শ্রমিক সংঘ, স’মিল শ্রমিক সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ।