বিশেষ প্রতিনিধি
বিদ্যুৎ ভোগান্তিতে পড়েছেন সুনামগঞ্জের প্রায় চার লাখ গ্রাহক। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে শহর এলাকার অর্থাৎ পিডিবির গ্রাহকরা। শনিবার স্বাধীনতা দিবসের দিনে বিদ্যুৎ যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ছিলেন সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির ২৯ হাজার গ্রাহক। সুনামগঞ্জ শহরের বিদ্যুত লাইনের ছয় ফিডারের সব কয়টিতেই একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করেছে এদিন। কোন কোন সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিহীন ছিলেন হাজার হাজার গ্রাহক। বিদ্যুতের এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে সামনের রমজানে গ্রাহকদের আরও বেশি ভোগান্তি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বেকায়দায় পড়বেন বিদ্যুৎ বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারাও।
সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির হাজীপাড়ার বিদ্যুৎ অফিস থেকে ২৯ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা ছয় টি ফিডারে। এগুলো হচ্ছে, মল্লিকপুর ফিডার, দিরাই ফিডার, থানা ফিডার, বড়পাড়া ফিডার, আমবাড়ী ফিডার ও বেতগঞ্জ ফিডার।
বিদ্যুৎ অফিস থেকে জানানো হয়, শনিবার বেতগঞ্জ ও আমবাড়ী ফিডারে ছয়বার, বড়পাড়া, থানা, দিরাই ও মল্লিকপুর ফিডারে দুইবার করে বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করেছে। বিদ্যুৎ অফিস থেকে এমন হিসাব দেওয়া হলেও গ্রাহকরা বলেছেন, বেতগঞ্জ ও আমবাড়ী ফিডারে ১০ বার এবং অন্য ফিডারে ৪—৫ বার করে বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করেছে।
সুনামগঞ্জ শহরের বনানীপাড়ার বাসিন্দা লেখক ও গবেষক অ্যাড আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন বললেন, শহরের ওয়েজখালীতে শতকোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎ সাবস্টেশন হলেও এর সুফল আমরা ভোগ করতে পারছি না। শনিবার কমপক্ষে ১০ বার বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করেছে বনানীপাড়া এলাকায়। ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে আমবাড়ী ফিডার থেকে। এতো দীর্ঘ লাইন থেকে শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যায়। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিলে বলা হয় ‘ট্রিপ’ করেছে। এই ট্রিপ করার কথা শুনে আসছি বহুবছর ধরে। এই লাইনকে ছোট করার কাজ শুরু হয়েছে শুনে আসছি কয়েক বছর ধরে। এর কি কোন তদারকি নেই। সংশ্লিষ্ট কারো কাছেই সদোত্তর পাওয়া যায় না।
সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির সাবেক সভাপতি শহরের হাসননগরের বাসিন্দা চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বললেন, স্বাধীনতা দিবসে কতবার বিদ্যুৎ গেছে হিসাব করে বলতে হবে। এটি কিসের আলামত। দেশে বিদ্যুতের সংকট নেই শুনেছি, তাহলে এমন হচ্ছে কেন, আমাদের মনে হচ্ছে, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা করছে কেউ কেউ। এই বিষয়ে সরকারের উর্ধ্বতনদের নজর দেওয়া জরুরি। তিনি জানালেন, তাদের মহল্লায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় বেতগঞ্জ ফিডার থেকে। এই লাইনে সংস্কার এবং দুই ফিডার করণের কাজের কথা শুনছেন দুই বছর ধরে। এতেও জবাবদিহীতা নেই বলে মনে করছেন তিনি।
কলেজ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সুনামগঞ্জ জেলা সভাপতি শুভঙ্কর তালুকদার মান্না বললেন, কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎ যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গ্রাহকেরা। শনিবার দিনটি এমনভাবে গেছে, মনে হচ্ছে বিদ্যুৎ না থাকলেই ভালো হতো।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুহুল তুহিন বললেন, গত কয়েকদিনের ভোগান্তিতে অসহ্য অবস্থা তৈরি হয়েছে। সামনে রমজান, এর আগে বিদ্যুৎ ভোগন্তি দূর না করলে জনমনে ক্ষোভ বাড়বে।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের একজন প্রকৌশলী বললেন, নতুন লাইন নির্মাণকারী ও মেরামতের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজে গাফিলতি করছে। কাজে বিলম্ব করায় গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে। লাইনে কিছু আছে স্টিলের খঁুটা, কিছু ঢালাইয়ের খুঁটা। অর্ধেক কাজ করে রেখেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। পুরাতন লাইন চালু আছে, নতুন লাইন বন্ধ আছে। বাতাসে চালু লাইন বন্ধ লাইনের কাছে গেলেই শর্ট সার্কিট হয়, আপনা আপনি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। লাইনের আপগ্রেডের কাজ দ্রুত শেষ না করলে এই ভোগান্তি থাকবেই বলে মন্তব্য করেন এই প্রকৌশলী।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির পুরাতন বিদ্যুৎ লাইন মেরামত ও সংস্কারের কাজ হচ্ছে প্রায় চার বছর ধরে। প্রথম দফায় এক কোটি টাকার কাজ হয়েছে ২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফায় এক বছর মেয়াদি কাজ ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হলেও এখনো ঢিমেতালে কাজ চলছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিলেটের জেড এম এন্টার প্রাইজের পক্ষে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা রাসেল আহমেদ দাবি করলেন, তাদের কাজ শেষের দিকে, এখন মেইন্টেন্সের কাজ চলছে।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মসিউর রহমান বিদ্যুৎ ভোগান্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, আমবাড়ী ফিডার ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ঝড় বৃষ্টি হলে লাইনে ত্রুটি দেখা দেয়। আপনা আপনি লাইন ট্রিপ করে অর্থাৎ সরবরাহ কেন্দ্রের স্লুইস বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের লোকজন দ্রুত কাজে লাগলেও ত্রুটি শনাক্তে সময় লাগে। একই অবস্থা বেতগঞ্জ ফিডারেও। গত দুই দিন হয় ঝড়ো হাওয়ায় বিদ্যুৎ লাইন বার বার ট্রিপ করছে বলে জানান তিনি। এছাড়া গত ১৯ মার্চ থেকে সিলেটের কুমারগাঁওয়ের ২২৫ মেঘাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু হচ্ছে না। একারণে সুনামগঞ্জ পিডিবি চাহিদার ১৩ মেঘাওয়াটের স্থলে ৮ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে। এজন্য লোডশেডিংও করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান জানালেন, কোভিডের কারণে ঠিকাদারের কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে। উন্নয়ন কাজ করার সময় সকল ক্ষেত্রেই কিছু যন্ত্রণা সইতে হয় মন্তব্য করে এই প্রকৌশলী বললেন, এই বছরের শেষ নাগাদ কাজ শেষ হয়ে যাবে।
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের জিএম সুদীপ বিশ^াস জানালেন, সিলেটের কুমারগাঁওয়ের ২২৫ মেঘাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পুনরায় সরবরাহ শুরু না হলে সামনের রমজান মাসে সুনামগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের তিন লাখ ৫৮ হাজার গ্রাহককে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়তে হবে। তখন বিদ্যুতের চাহিদা থাকবে এই জেলায় ৬৫ মেঘাওয়াট। তিনিদিন আগে ৪৫ মেঘাওয়াট চাহিদার স্থলে ২৬ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়েছেন তারা। গত দুইদিন আবহাওয়া মেঘাচ্ছন্ন থাকায় গরম কম ছিল। কম বিদ্যুৎ (৩৬ মেঘাওয়াট) পেলেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে।
- পণতীর্থে গঙ্গাস্নান আগামীকাল, শাহ আরেফিনের ওরস শুরু আজ
- পণতীর্থ ও শাহ আরেফিন (রহ:) এর ওরস পুন্যার্থীদের শুভেচ্ছা


