স্টাফ রিপোর্টার
শ্রীশ্রী অদ্বৈত জন্মধাম পণতীর্থে গঙ্গাস্নান আগামীকাল বুধবার। ঐ দিন ভোর ৬ টা ৬ মিনিট ৯ সেকেন্ড থেকে ১১টা ২৩ মিনিট ৫ সেকেন্ড পর্যন্ত মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে (মহাবারুণী) গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হবে। চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিকে বারুণী যোগ বলা হয়। যদি ত্রয়োদশী তিথির সঙ্গে শতভিষা নক্ষত্র যোগ হয়, তবে সেটাকে মহাবারুণী যোগ বলা হয়। আর মহাবারুণী যোগ শনিবারে পড়লে সেটাকে মহা—মহা—বারুণী যোগ বলা হয়। প্রতি বছর চৈত্র মাসে তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের যাদুকাটা নদীর রাজারগাঁও সংলগ্ন স্থানে গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা এখানে তর্পণও করেন। এ উপলক্ষে এখানে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এবং মেলা বসে।
এদিকে রাজারগাঁওয়ের নিকটবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় শাহ আরেফিনের মোকামে হযরত শাহজালালের (র.) সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিনের (র.) বার্ষিক ওরস মোবারক শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। চলবে আগামী ৩ দিন।
আনুমানিক ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দের মাঘ মাসে শ্রীশ্রীঅদ্বৈত আচার্য তাহিরপুর উপজেলার লাউড় পরগণার অন্তর্গত নবগ্রামে আবির্ভূত হন। তবে নবগ্রাম যাদুকাটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু আগেই। বর্তমানে অদ্বৈত আচার্য প্রভুর মন্দির গড়ে উঠেছে নবগ্রাম সংলগ্ন রাজারগাঁওয়ে। ‘অদ্বৈত প্রকাশ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, একদিন রাত্রিতে অদ্বৈত জননী নাভাদেবী স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি নানা তীর্থ জলে স্নান করছেন। প্রভাতে তিনি স্বপ্নের কথা স্মরণ করে ও তীর্থ গমনের নানান অসুবিধার বিষয় চিন্তা করে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এমন সময়ে পুত্র অদ্বৈতাচার্য সেখানে উপস্থিত হয়ে মাতার বিমর্ষতার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁর মাতা তাঁকে স্বপ্ন দর্শনের কথা অবহিত করেন এবং তীর্থযাত্রায় অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। অদ্বৈাতাচার্য্য মাকে বিষন্ন দেখে পণ করলেন যে, এই স্থানেই সকল তীর্থের আবির্ভাব করাবেন। অদ্বৈতাচার্য মন:শক্তির অসীম প্রভাব ও যোগবলের অসাধারণ শক্তিতে তীর্থ সমূহকে আকর্ষণ করে লাউড়ের এক শৈলের উপর আনয়ন করেন। ঐ শৈল খণ্ডের একটি ঝরণাতীর্থবারি পরিপূরিত হয়ে ঝরঝর করে পড়লে লাগলো। অদ্বৈত জননী তাতে স্নান করে পরিতৃপ্তা হলেন। এইভাবে লাউড়ে এই তীর্থের উৎপত্তি হয়। অদ্বৈতের ন্যায় তীর্থ সমূহও পণ করেছিলো যে, প্রতি বারুণীতেই এই স্থানে তাঁদের আবির্ভাব হবে। এই পণ শব্দ থেকেই নাম হয়েছে পণাতীর্থ।
এছাড়াও রাজারগাঁওয়ের নিকটবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় শাহ আরেফিনের মোকামে হযরত শাহজালালের (র.) সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিনের (র.) বার্ষিক ওরস মোবারক শুরু হচ্ছে আজ। ৩৬০ আউলিয়াদের মধ্যে হযরত শাহ আরেফিন (র.) হলেন একজন। প্রকৃতপক্ষে হযরত শাহ আরেফিনের (র.) মোকাম সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে অবস্থিত হলেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলমান নর—নারী ওরস মোবারকে আসেন এবং দূর থেকে মোকাম জিয়ারত করেন। দু’উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকার হিন্দু —মুসলমানদের মধ্যে এক মহামিলনমেলা দেখা যায়। শাহ আরেফিন (র.) অনেকের কাছে জিন্দাপীর হিসেবে পরিচতি। প্রতি বছর ওরস মোবারককে কেন্দ্র করে ভক্ত আশেকানের সমাগমে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ওরস মোবারক। সাধারণ দর্শনার্থীরা আসেন শাহ আরেফিনের স্মৃতি বিজড়িত বাংলাদেশ আস্তানায় এবং সেখান থেকেই একবার চোখ দিয়ে পরখ করে নেন অদূরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে অবস্থিত শাহ আরেফিনের আস্তানার স্মৃতি চিহ্ন দিকে। কেউ আসেন মানত নিয়ে, আবার কেউ দোয়া নেন, কেউবা মোকাম জিয়ারত করেন।
শ্রীশ্রী অদ্বৈত জন্মধাম পণতীর্থে গঙ্গাস্নান ও শাহ আরেফিন (রা:) বার্ষিক ওরস মোবারক উপলক্ষে আব্দুল জহুর সেতু থেকে পণতীর্থ ও শাহ আরেফিনের মেলা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরের আব্দুল জহুর সেতু থেকে পণতীর্থ ও শাহ আরেফিনের মেলা পর্যন্ত মোটরসাইকেল ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা এবং লেগুনা ও সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয় ১৫০ টাকা।
সুনামগঞ্জ আব্দুল জহুর সেতু থেকে চালবন্দ—পলাশ—ধনপুর—মমিনবাজার হয়ে বারুনী মেলা ও শাহ আরেফিনের মেলা পর্যন্ত ওয়ান—ওয়ে সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে। ফিরতি পথে পথে স্বরূপগঞ্জ—চিনাকান্দি—মথুরকান্দি হয়ে সুনামগঞ্জ আব্দুল জহুর সেতুতে যানবাহন চলাচল করবে।
এছাড়াও যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি পয়েন্টে পুলিশ বাহিনী নিয়োজিত থাকবে। নৌ পথে পুলিশ টহল এবং স্বাস্থ্য সেবাসহ বিশেষ আইন শৃংখলার ব্যবস্থা করা হবে।
তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল লতিফ তরফদার জানান, আখড়াবাড়ী, পণাতীর্থ গঙ্গাস্নান, গড়কাটি ইসকন মন্দির, বারুণী মেলা ও ওরস মোবারক আস্তানায় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব সদস্যদের সমন্বয়ে অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হবে।
এছাড়াও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ নজরদারী, মেডিকেলটিম এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোতে দিবারাত্রী যাতায়াতকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই প্রতিরোধে আইনশৃংখলাবাহিনীর টহলদল জোরদার থাকবে।


