গীতি আলেখ্য ‘ইতিহাস কথা কও’

প্রসেনজিৎ দে
গীতি গবেষক মাহমুদ সেলিমের লেখা গীতি আলেখ্য ইতিহাস কথা কও, বাংলার স্বাধীন সূর্য পলাশীর আম্র কাননে অস্তমিত হওয়ার সময় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা নীল আকাশে পত পত করে ওড়ার পরবর্তী আরও বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। একজন বয়াতী এবং মূল গায়েন সংগে দোহারী দল নিয়ে এই গীতি আলেখ্যটি গাওয়া হয়। শুরুতে ধন ধান্য পুষ্প ভরা গানটির পর মূল গায়েন গেয়ে ওঠেন- তবু শোনেন বাংলার কথা শোনেন ভাইরে মন দিয়া, বাংলাদেশের সোনার দিনে মন চলে ফিরিয়া। সত্যিই সুরে সুরে আমাদের মন বাংলাদেশের সোনার দিনে ফিরে চলে পুঁথির সুরে,  আ…..আলী বলে হারামজাদা ক্যায়সা জোরওয়ার আমারো বেটারো পরে চালায় তলোয়ার, (আরে) লহু নদী বহাইব দুনিয়ার উপরে, এলাহী এতেক দু:খ দিয়াছে আমারে। এইভাবে বয়াতী যখন মূল গায়েনকে স্মরণ করিয়ে দেয় ভাটির টানে নৌকা ছাড়ি যাইত কত দূর গলা ছাইরা ধরত মাঝি ভাটিয়ালি সুর। আমাদের স্মৃতি পটে ভেসে ওঠে পাল তোলা নৌকায় হাল ধরে বসে থাকা মাঝি ভাইকে। বয়াতী আবার মূল গায়েন কে মনে করিয়ে দেন, আরে কীর্তনিয়া গাহিত গান সারা রাত্র ধরি, ঢোল করতাল মন্দিরাতে প্রাণটা নিত কাড়ি। মূল গায়েন তখন উদাত্ত গলায় গেয়ে উঠেন, আমি মানব ধরমে মানব করমে সপিনু এ প্রাণ মন… মানব জাতি শ্রেষ্ঠ ভবে এমন দিন আসবে কবে…. একই ধারাবাহিকতায় গীত হয়, বল মানুষো মধুর নাম, এ ধরা আনন্দধাম, স্বর্গ রচিব ধরণীতে। কিন্তু স্বর্গ রচনা তো দূরস্ত। ব্রিটিশ শাসকদের চেহারা উন্মোচন করতে গিয়ে মূল গায়েন বলে, কি চক্রান্ত করে তারা টাকা কড়ি দিয়া, আর হিন্দু মুসলমানে দিল রায়ট লাগাইয়া, হায়রে কি যে বিষ হায় ব্রিটিশ ঢুকাইল প্রাণে, এখনো বিষ জমা আছে বাঙালির মনে। এই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সূর্য্যসেন, তীতুমীর, ক্ষুদিরাম অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। মূল গায়েন দেখিয়ে যায়, তারপরেতে দুইখানা দেশ স্বাধীন হইয়া গেল, আদমজীরা পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসিল। বাংলার মানুষ ভেবেছিল ব্রিটিশ গেল এখন তারা সুখ শান্তির জোয়ারে ভাসবে, কিন্তু তা আর হলো না। তাইতো গীতিকারের খেদ, দু:খ গেল না, স্বাধীন হইলাম মুক্তি পাইলাম না। গায়েন এর সুরে সুরে উঠে আসে ১৯৪৮ থেকে ৬৯ইং এর গনঅভ্যুত্থান পর্যন্ত, আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা। মূল গায়েন গর্জে ওঠেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাতে ফেলিয়া, সিংহরে বান্ধিয়া রাখে বাঁশের খাঁচা দিয়া। কি যথার্থ উপমা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কে কারাগারে প্রেরণ তো বাঁশের খাঁচায় সিংহকে আটকানোর মতই। ৭১এর ২৫শে মার্চের হৃদয়গ্রাহী বর্ণনায় চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। মূল গায়েন গেয়ে ওঠেন, জাগেরে সিংহনাদে বাংলাদেশের জনতা, স্বাধীনতা স্বাধীনতা সবার মুখে এক কথা,……..ইয়াহিয়ার অত্যাচারে, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরে, দেশের নামে শপথ করে আনবোরে স্বাধীনতা। মুক্তি পাগল মুক্তি সেনার দল মাটির স্পর্শ নিয়ে এই প্রত্যয়ই যেন ব্যক্ত করে জীবনানন্দের ভাষায়, আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়। জীবন বাজী রেখে বাংলার দামাল সন্তানেরা পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে। যুদ্ধের ময়দানে অকুতোভয় মুক্তিসেনারা যেমন এম. আর. আক্তার মুকুলের চরমপত্র শুনে ঊজ্জীবিত হয়, তেমনি নির্যাতিত বোনের চিঠি মুক্তি পাগল ভাইয়ের হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পৌঁছুলে সেই চিঠি পাঠ শুনে চোখের পানি মনের অজান্তে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। চিঠির ভাষা ও বর্ণনা যেমন ক্রোধের উদ্রেক করে তেমনি আবার দৃঢ় প্রত্যয়ে লৌহকঠিন হয় মুক্তিসেনা। এইভাবে নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণের বিনিময়ে আসে বাংলার স্বাধীনতা। বাংলার মানুষ আনন্দ উল্লাসে জেগে উঠে কিন্তু সেই উল্লাস স্পর্শ করেনা সন্তান হারানো মা, বাবা কিংবা মুক্তিযুদ্ধে সব হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারানো সেই লোকটিকে, তাইতো তিনি বাংলার ইতিহাসের বর্ণনা শুনে উঠে আসেন মঞ্চে, চিৎকার করে বলেন বন্ধ কর, এইসব কি কইতাছস, সঠিক ইতিহাস বল, বল্্ মুক্তিযুদ্ধে কোন্্ কোন্্ দেশের বুলেট ব্যবহার হয়েছে? কে দিয়েছে বাংলার মানুষকে হত্যার নীল নকশা? কার ষড়যন্ত্রে দেশটা বিরান হয়েছে? এখনও কেন রাজাকার আলবদর স্বাধীনদেশে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়? কেন যুদ্ধ অপরাধীর বিচার মাঝপথে থেমে গিয়েছিল? আরও হাজারও প্রশ্ন অহর্নিশি আমাদের প্রত্যেকের মনে ঘুরপাক খায়, যার উত্তর জেনেও আমরা বলতে পারিনা। অনবদ্য গীতসৃষ্টা, অসমসাহসী লেখক মাহমুদ সেলিমের ইতিহাস কথা কও গীতি আলেখ্যটি, যা আগামী ৪টা সেপ্টেম্বর অর্থাৎ আগামীকাল সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সুনামগঞ্জ জেলা সংসদ নতুন শিল্পকলা মিলনায়তনে মঞ্চস্থ করবে। সুধী দর্শকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনাদের আমরা বহু পুরাতন কিন্তু এই ধাবমান বর্তমানেও যা অত্যন্ত সময়োপযোগী, এমন কিছু শোনাতে চাচ্ছি। যদি পারেন একবার এসে দেখে যেতে পারেন। আশাকরি হতাশ হবেন না।
লেখক: আইনজীবী।