পুলক রাজ
১৮০০ সালের শুরুর দিকে জমিদার রাজেন্দ্র কুমার চৌধুরী ও রাকেশ রঞ্জন চৌধুরী গৌরারং জমিদারি পত্তন করেন । এরপর সময়ের পরিবর্তনের সাথে তাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে নগেন্দ্র কুমার চৌধুরীর হাত ধরে জমিদারী বিস্তৃতি লাভ করে। তিনি ছিলেন সর্বশেষ জমিদার। তাঁর পুত্র নিরঞ্জন চৌধুরী। নিরঞ্জন চৌধুরীর পরিবারের মধ্যে ছেলে অঞ্জন চৌধুরী বর্তমানে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় কর্মরত। জমিদারদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কেউ আর ত্রখানে থাকেন না। ২ শ’ বছরের পুরনো হলেও গৌরারং জমিদার বাড়ির শিল্পসম্মত স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে ৬ টি আলাদা ভবন, রংমহলের দেওয়ালে নর-নারী ও লতাপাতার ছবি, অন্দরমহল, সিংহাসন, জলসা ঘর ইত্যাদি। এসব মানুষকে আকৃষ্ট করে। বাড়ির অধিকাংশ দালানের গায়ে শ্যাওলা জমে নষ্ট হয়ে গেছে, যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। জমিদারবাড়ির মূল ভবনের ভিতরে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। রংমহলের সম্মুখভাগে রয়েছে বিশাল আকৃতির ত্রকটি পুকুর, মূল ভবনের ডান পাশে রয়েছে আরো একটি দীঘি। জমিদারী ঘাট আজও আছে। বাড়িঘেরা অসংখ্য ছোট বড় গাছগাছালি পুরাতন এই বাড়িটিকে যেন আগলে রেখেছে।
তবে পর্যটকদের সাথে খারাপ আচরণ ও অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে দিনদিন এখানে পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও গৌরারং জমিদার বাড়ি দর্শন করার জন্য দেশ বিদেশ থেকে পর্যটকরা আসতেন। বর্তমানে সেখানকার কিছু মানুষের ভয়ে পর্যটকদের যাওয়া আসা কমে যাচ্ছে। পর্যটকদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয়।
জানা যায়, প্রথমে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জমিদার বাড়িটিকে সরকারি তত্ত্বাবধানে নেয়ার প্রচেষ্টা শুরু করেন। পরবর্তিতে জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বিপ্লব এই প্রচেষ্টা আরো অনেক এগিয়ে নিয়ে যান। ঐতিহ্য যাদুঘর ট্রাষ্টে এই জমিদার বাড়িকে অন্তর্ভূক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। ২০১৮ সালে জমিদার বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বলেছিলেন, গৌরারং জমিদার বাড়ি প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘর হতে পারে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতœবস্তু এই স্থানে সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা গেলে ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষা পাবে। স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিলে চমৎকার এক পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি।
ফাহমিদা জাহান আঁখি বলেন, গৌরারং জমিদার বাড়ি ঢুকলেই ঘুরতে আসা নারী পুরুষদের সাথে খারাপ ভাষায় কথা বলে একটি চক্র। গৌরারং জমিদার বাড়ির ভিতরে মাদক ও জুয়ার আসর বসে সন্ধ্যার পর। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইউসুফ রহমান বলেন, এলাকার ভালো মানুষের নিরবতার সুযোগে সন্ধ্যার পর নেশার আড্ডা বসে এখানে। এদেরকে চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
উজ্জ্বল তালুকদার বলেন. পরিবার পরিজন নিয়ে এক সাথে জমিদার বাড়ি ঘুরতে গেলেও কিছু মানুষ বিরক্ত করে। খারাপ খারাপ ভাষায় কথা বলে। পর্যটকরা এখানে অনেক আগ্রহ নিয়ে আসলেও ফিরে যাচ্ছে হতাশ হয়ে।
গৌরারং জমিদার বাড়ির প্রতিবেশী ফজল মিয়া বলেন, মানুষ জমিদার বাড়ি এসে উল্টাপাল্টা কাজকর্ম করে। এজন্য বাধা দেওয়া হয় ।
গৌরারং জমিদার বাড়ির বর্তমান মালিক পক্ষের বিমল দাস বলেন, মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরতে আসে জমিদার বাড়ি। কিন্তু একটু নিরব দেখলে খারাপ কাজ করে। জমিদার বাড়ি দেখতে আসবে মানুষ, কিন্তু ছবি কেন উঠবে। ছবি তুলে অনলাইনে ছেড়ে দেয় এটা তো ঠিক না।
জাহাঙ্গির আলম বলেন, গৌরারং এর জমিদার বাড়ি আমাদের প্রাচীন নিদর্শনের অংশ তাই এই বাড়িটি অবিকৃতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ জরুরী। অভিযোগ আছে যে, ক্রয়সূত্রে মালিক পক্ষ পর্যটকরা দেখতে এলে বাধা সৃষ্টি করে এবং অসহযোগিতা করে থাকেন। যেহেতু এই বাড়ি দেখতে প্রতিদিন বহু পর্যটক আসেন তাই আমার দাবি থাকবে এই স্থাপনাটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পর্যটকবান্ধব করা হোক। যারা পর্যটকদের বাধা সৃষ্টি করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
জমিদার নিরঞ্জন চৌধুরী খোকন’র পুত্র অঞ্জন চৌধুরী বলেন, এই বাড়িতে এখন আমার নিজের বলতে দুর্গা মন্দির ও পাশের ছোট বিষ্ণু মন্দিরটি আছে। সরকারের প্রয়োজনে মন্দির দুটি প্রদান করতে আমার কোন আপত্তি নেই। আমি ও আমার পরিবার এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত এই বাড়ির অন্যন্য অংশীদারগণের একই মত। তিনি বলেন, আমি অনেক দর্শনার্থীর কাছ থেকে শুনেছি বাড়ির দক্ষিণ অংশের বর্তমান মালিকদের কেউ কেউ দর্শনার্থীদের জমিদার বাড়িতে প্রবেশ বাধা দেন।


