‘ঘরও খানি নাই হাওরে কোনও কামও নাই’

বিশেষ প্রতিনিধি
‘১৫ কিয়ার ক্ষেত করছিলাম, বান ভাইঙা সব তলইছে। অকন কিতা করমু, এই চিন্তায় ঘুম অয়না। ঘরও খানি নাই, হাওরে কোনও কামও নাই। ধনী গরিব সব গিরস্ত এক লাকান বিপদও পড়ছে।’
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই নিজেদের দুর্ভোগের কথা জানালেন শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ছায়ার হাওরপারের সুলতানপুর গ্রামের কৃষক হাবিব মিয়া।
শুধু হাবিব মিয়া নন, দুর্বল বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের সব বোরো ফসলি হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর কৃষকরা নতুন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। হাওরের পানির ঢেউয়ে বাড়িঘর ভেঙে পড়ছে। সর্বশেষ তাহিরপুরের শনির হাওর ও জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওর তলিয়ে যাওয়ার সময় কৃষকরা কিছু কাঁচা ধান কাটলেও তা রোদের অভাবে শুকাতে পারছেন না। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রোদ থাকায় কিছু ধান শুকানো গেছে। তবে হাওরের পাড় তলিয়ে যাওয়ায় খলার অভাবে সবাই ধান শুকাতে পারেননি।
কৃষকরা জানিয়েছেন, পানিতে হাওরের ধান তলিয়ে গেছে। এর পর অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মাছের মড়ক দেখা দেওয়ায় হাওরে মাছও কমে গেছে। হাওরে বর্তমানে কোনো কাজ নেই, কৃষকের ঘরে খাদ্যও নেই। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে ধনী-গরিব গৃহস্থ পরিবারের। দিরাই-শাল্লা, জগন্নাথপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার হাওর এলাকায় এ পরিস্থিতির শিকার কৃষক পরিবারের সংখ্যা বেশি।
গতকাল এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জামালগঞ্জের পাগনার হাওরপারের হটামারা গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া বলেন, ‘এইবার মহাবিপদও আছি ভাই। ৮ কিয়ার ক্ষেত করছিলাম, বান ভাঙার দিন কোন রকমে ২ কিয়ার কাঁচা খেত কাটছিলাম। ১০-১৫ মণ ধান অইলনে। রইদ নাই, কাঁচা ধানও হুকানি যাইতাছে
 না। পইচ্চা গইল্লা সব শেষ।’
তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রামজীবনপুর গ্রামের স্বাবলম্বী কৃষক আলী আহমদ মুরাদ বলেন, ‘আমি ৬০ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। আশা ছিল অন্তত আড়াই হাজার মণ ধান পাব। কিন্তু শনির হাওর তলিয়ে যাওয়ায় আমি আড়াই কেজি ধানও পাইনি। ৯ শ্রমিকের বেতনের ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা যে কোনাভাবেই হোক পরিশোধ করতে হবে। ঢেউয়ের কবল থেকে বাড়িঘর রক্ষা করতে বাঁশ কেনার টাকাও নেই কারো হাতে। সব মিলিয়ে মহাদুর্ভোগে পড়েছি আমরা।’
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরপারের বুড়াখালী গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হক (বতাই) বলেন, ‘বান ভাইঙা ধান গেল তলইয়া, হাওরের হকল মাছ মইরা গেল। ঘর কোন খানি নাই। অকন আফালের ঢেউয়ে বাড়িঘর ভাঙতাছে। ইবার আমরা কিতা কইরা বাঁচমু বুঝরাম না।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ১০০০ টন চাল ও ৬৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা বিতরণ করেছি। আরও ৭০ টন চাল ও ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা আমাদের মজুদ আছে। বর্তমান সরকার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দেবে। সুনামগঞ্জের দেড় লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা করে দেয়া হবে। ওএমএস-এর চালের পরিমাণ ১ টনের স্থলে বাড়িয়ে ২ টন করা হয়েছে। আগামী ৩১ মে পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালু থাকবে।’