‘ঘরতো ভাইসসা গেছেগি কোনানো গিয়া ওঠতাম’

বিশেষ প্রতিনিধি
বাড়ি’র পানি নেমেছে, কিন্তু বহুকষ্টের তৈরি বসত ঘরটি যে নেই, ঢলের পানি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সেটি, সন্তান সন্ততিদের নিয়ে নীড়ে ফেরার কোন উপায় নেই, হাতে টাকাও নেই, আশ্রয় কেন্দ্রে থাকায় কিছু শুকনো খাবার এবং কিছু ত্রাণও মিলেছে, এখন কোথায় যাবেন বানভাসি দরিদ্র মানুষেরা, নিজে কিভাবে খেয়ে বেঁচে থাকবেন, সন্তানদেরই বা কি খাওয়াবেন এমন নানা দুশ্চিন্তা সুনামগঞ্জের কমপক্ষে ১০ হাজার পরিবারের।
সুনামগঞ্জ শহরতলির কোরবাননগর ইউনিয়নের হাছনবাহার গ্রামের পঙ্গু (দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছেন) মকদ্দুছ মিয়ার তিন ছেলে, এক মেয়ে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) গভীর রাতে বসতঘরে গলা সমান পানি হলে স্ত্রী—পুত্রকে নিয়ে নৌকায় করে কয়েক কিলোমিটার দূরের সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের দু’তলায় গিয়ে আশ্রয় নেন। শনিবার নিজের বাড়ি ভেসে ওঠেছে শুনে ছোট একটি নৌকায় বাড়ী দেখতে গিয়েছিলেন মকদ্দুছ মিয়া। ওখানে যেয়ে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় পড়লেন তিনি। ঢলের পানি তার ঘরের সবকয়টি টিনের বেড়া ভেঙেছে ঘরটিও হেলে পড়েছে। এই অবস্থায় স্ত্রী—সন্তানদের নিয়ে কোথায় ওঠবেন, এই দুশ্চিন্তা ভর করেছে তাকে।
এই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মানিক মিয়া, সাজিদুর, আব্দুল খালিক ও খালিক মিয়ারও একই অবস্থা। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরার কোন উপায় নেই তাদের।
গ্রামের বাসিন্দা নূর আহমদ বললেন, গ্রামে সাত’শ পরিবারের বাস। ক্ষতি হয়েছে সকলেরই। একটি বাড়ি ছাড়া সকলের বাড়িতে গলা সমান পানি ছিল। তবে পাঁচ পরিবার একেবারে ফিরতেই পারবে না।
এমন অবস্থা জেলার দুই হাজার আটশ সাতাশি গ্রামের কমপক্ষে দুই হাজারটিরই। সেই হিসাবে এবারের বন্যায় সুনামগঞ্জের কমপক্ষে ১৫ হাজার পরিবার আশ্রয় হারিয়েছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার কেজাউড়ার বাসিন্দা রঞ্জিত দাস, স্ত্রীকে নিয়ে নতুনপাড়ার এক আত্মীয়ের বাড়িতে দু’তলায় ওঠেছেন তিনি। জানালেন, হাতের ঋণ, এনজিওর ঋণ এবং কয়েক বছরের পরিশ্রমের আয় দিয়ে সামান্য কিছু জমি কিনে বসত ঘর করেছিলেন, ঘরটির কোন অস্তিতই এখন নেই। টিনের চাল—বেড়া ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, পানির ট্যাংকি ভেসে গেছে। বললেন, আমারে কতদিন মাইনসে যেগা দিব ভাই, আমি কোনানো গিয়া ওঠতাম।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে আশ্রয় নেওয়া পশ্চিম সুলতানপুরের হাজেরা খাতুন বললেন, ‘আমারে ইখান (আশ্রয় কেন্দ্র) ছাইড়া যাইবার কইলে, পথের মাঝে পইড়া থাকা ছাড়া উপায় নাই, ঘর ডাবি গেছে, দরজা ভাসাইয়া নিছেগি।’

বন্যায় সুনামগঞ্জের ১০ হাজার পরিবারের ঘর ভেসে গেছে


সরকারি কলেজে আশ্রয় নেওয়া আপ্তাব নগরের শফাত আলী ও রামশ^রপুরের নবী হোসেনও একই ধরণের আকুতি জানালেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম বললেন, ত্রাণ বিতরণ শেষ হলে দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে। তখন বলা যাবে কতগুলো ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। তবে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষের বাড়ি থাকার উপযোগী থাকবে না।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ভয়াবহ বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষের অনেকেরই ঘরবাড়ি ভেসে গেছে, যতদিন পর্যন্ত তাদের বসতবাড়ি থাকার উপযোগী না হবে, তারা আশ্রয় কেন্দ্রেই থাকবে, সরকার তাদের সহযোগিতা দেবে।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে গেল বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা বন্যা কবলিত হয়। শুক্রবার ভোর তিনটায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যায় জেলার ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা। এই তিন উপজেলার বেশিরভাগেরই ছাল ছুঁয়েছে ঢলের পানি। অন্যান্য উপজেলার মানুষও পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তালা দেওয়া অনেক দু’তলা গুরুত্বপূর্ণ অফিস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের তালা ভেঙে জীবন বাঁচিয়েছেন লাখো মানুষ। ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডবে ঘরে থাকা ধান—চাল, গৃহপালিত পশু, জমিতে থাকা সবজি, পুকুরের মাছ সবই ভেসে গেছে। এখনো হাজারো মানুষের ঘরে খাবার নেই, বাইরে কাজ নেই, সিংহভাগ এলাকা বন্যা কবলিত।