সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের প্রতিটি হাওরে পানি আসায় ধান কেনাবেচা বেড়েছে। বর্ষার পানি বিলম্বে এলেও এখন কৃষকের ঘাটে ভিড়ছে ‘ব্যাপারির নাও’ (ধান কেনার ক্রেতাদের নৌকা)। এতে ধান পরিবহনে ক্রেতা-বিক্রেতার খরচ কমেছে।
গেল কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে এখন পরিপূর্ণ বর্ষা। রূপবতী হাওর তার রূপে ফিরেছে। হাওরের চারদিকে এখন বর্ষার চিরচেনা রূপ, থৈথৈ পানি। সহজ হয়েছে নৌপথ ও ধান পরিবহনে। বর্ষায় এই সময়ে কৃষকের বাড়ি’র ঘাটে নৌকা ভিড়ছে। যাওয়া যাচ্ছে হাটে। এতে কৃষক ও ক্রেতাদের ধান কেনাবেচা বেড়েছে।
জেলার সবচেয়ে বড় ধানের মোকাম মধ্যনগর উপজেলায়। মধ্যনগর বাজারের চারপাশে রয়েছে এসব মোকাম। সারাদিন খুচরা ক্রেতারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে ধান কেনে মোকামে এনে বিক্রয় করেন।
এই উপজেলার দক্ষিণ বংশিকুন্ডা ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া। তিনি কৃষক ও খুচরা ধান ক্রেতা ও বিক্রেতা। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে ধান কেনেন। সারাদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মণ ধান কিনতে পারেন তিনি। পরে তা মধ্যনগর বাজারের মোকামে বিক্রয় করেন।
তিনি বললেন, আগে ধান কেনার নৌকা নদীতে রেখে গ্রাম থেকে গাড়ি দিয়ে ধান আনতে হয়েছে। এতে যেমন ভোগান্তি হতো, তেমনি অতিরিক্ত টাকাও খরচ হতো। এখন হাওরে পানি আসায় গ্রামে কৃষকের ঘাটে চলে যায় নৌকা। কৃষক সরাসরি বস্তা করে আমাদের নৌকায় ধান দিচ্ছেন। এতে মণ প্রতি অতিরিক্ত ৪০ টাকা কম খরচ হচ্ছে আমাদের।
কলমাকান্দার বিশেরপাশা ইউনিয়নের বিশেরপাশা গ্রামের বাসিন্দা মাঝারি কৃষক শহিদ মিয়া। তিনি ধর্মপাশা ও কলমাকান্দা এলাকার সোনাডুবি হাওরে এবার ১১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। বাম্পার ফলনও পেয়েছেন। ১৫০ মণ ধান পেয়ে সুখি কৃষক তিনি। কিছুদিন ধরে পারিবারিক অন্যান্য খরচের জন্য ধান বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু হাওর শুকনো থাকায় ধান বিক্রি করতে পারছিলেন না। গেল কয়েক দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে পানি এসেছে। শনিবার ৫০ মণ ধান ফড়িয়ার কাছে বিক্রি করেছেন।
এই প্রতিবেদকের কাছে তিনি বললেন, এবার হাওরে সময় মতো পানি আসেনি। তাই ধানও বিক্রি করতে পারছিলাম না। কয়েকদিন হলো হাওর ডুবে বাড়ির ঘাটে পানি এসেছে। এখন ৫০ মণ ধান বিক্রি করছি ফড়িয়ার কাছে। ধানের দামও ভালো। ১ হাজার ১৩০ টাকা মণে ধান বিক্রয় করেছি।
ধানের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম শনিবার দুপুরে এ প্রতিবেদককে বললেন, কাইজ্জানুর, রৌহা গ্রাম থেকে সকাল থেকে এই পর্যন্ত একশ’ মণ ধান কিনেছি। পানি থাকায় একদম বাড়ির ঘাটে নৌকা নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে। এতে যারা ধান বেঁচতে (বিক্রয়) চান তারা সহজেই আমাদের কাছে বিক্রি করতে পারছেন। আমাদেরও পরিবহন খরচ কম হচ্ছে।
মধ্যনগর বাজারের ধানের বড় আড়ৎদার সম্বু রায় বললেন, পানি বাড়ার আগে প্রতিদিন তিন থেকে চারশ’ মণ ধান কিনতে পারছি। এখন হাওরে পানি আসায় ১১৪০ থেকে ১১৫০ টাকা দরে ধান কিনেছি। প্রতিদিন ১ হাজার থেকে পনেরোশ’ মণ ধান আসছে মোকামে।
তিনি বলেন, হাওরের অনেক দুর্গম গ্রাম রয়েছে যেখানে সড়ক পথও ভালো নয়। সেখানে বর্ষায় ধান পরিবহন করতে সুবিধা হয়। বাড়ির ঘাটে পানি আসায় এসব গ্রামের মানুষ এখন ধান বিক্রি করতে পারছেন। আগের থেকে কয়েকগুণ বেশি ধান কেনাবেচা হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলার বাহারা ইউনিয়নের বাহারা গ্রামের বাসিন্দা গিরিশ দাস বললেন, আমাদের এলাকায় এখনও পুরোপুরি বর্ষার পানি হয় নি। আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। হাওরের বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। তবে আগের থেকে কিছুটা ধান কেনাবেচা বেড়েছে। সহজেই ধান পরিবহন করা যাচ্ছে। কয়েকদিন পর পানি বাড়লে কেনাবেচা আরও বাড়বে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম ভুঞা বললেন, কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য দিতে চেষ্টা করি আমরা। আমাদের যে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সে অনুযায়ী ধান কেনা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবো।


