ঘুম ভেঙেই শোকের মাতম

স্টাফ রিপোর্টার
সিলেটের নাজিরবাজারে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ট্রাক-পিকআপের সংঘর্ষে নিহত ১৪ জনের ছয়জনেই দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এই ছয়জন সহ সুনামগঞ্জের দিরাই ও শান্তিগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
নিহতদের সকলেই হতদরিদ্র-দিনমজুর। গ্রামে অভাব অনটন থাকায় রাজমিস্ত্রির সঙ্গে ঢালাই শ্রমিক হিসেবে সিলেটে থাকতেন ভাটিপাড়ার ছয় শ্রমিক। এই গ্রামের নিহতদের কারো কারো মাথাগুজার ঠাঁই-ই নেই। কেউ কেউ অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আছে। দুর্ঘটনার পর পুরো গ্রামে শোকের মাতম বিরাজ করছে। নিহতদের স্বজনদের বেশিরভাগই দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সিলেটে চলে গেছেন।
গ্রামে থাকা নিহতদের স্বজনরা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কেবল আহাজারী করছেন। বলছেন, এমন সর্বনাশ কীভাবে সইবেন তারা।
গ্রামের মফিজ আলীর ছেলে সায়েদ নূর (৫৫)। বিয়ে করেছেন দুটি, প্রথম স্ত্রী’র দুই মেয়ে ও দুই ছেলে গ্রামে থাকলেও বাড়িতে নিজের ভিটেমাটিও নেই তাদের। গ্রামের আরেক ধনাঢ্য পরিবারের বাড়ির এক কোনে ছোট্ট কুঁড়েঘরেই এদের বাস। সায়েদ নূরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে পরিবারের সকলেই চলে গেছেন সিলেটে।
গ্রামের বাসিন্দা ফার্মেসী ব্যবসায়ী রিপাল আহমদ বললেন, বড় পরিবার, গ্রামে আয় রোজগার করে সংসার চালানো কষ্ট হওয়ায় সায়েদ নূর দ্বিতীয় স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে সিলেটে কাজের সন্ধানে যান। ওখানে স্বামী, স্ত্রী ও এক ছেলে রোজগার করে নিজেরা চলতো, বাড়িতেও কিছু টাকা পাঠাতো। খবর পাওয়ার পর অসহায় এই পরিবারের লোকজনের কান্নায় গ্রামের অন্যরাও কেঁদেছেন।
গ্রামের মাহিম উদ্দিনের ছেলে আব্দুল হারিছ (৫২)’র মৃত্যুতে এই পরিবারটিও অসহায় হয়ে গেছে জানালেন গ্রামবাসী। দিনমজুর মাহিম উদ্দিনের আয় রোজগারেই চলতো চার মেয়ে ও এক ছেলের সংসার। নিজের ভিটেমাটিও নেই আব্দুল হারিছের। এই পরিবারও অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকছে। এছাড়া গ্রামের সেজুফা বেগমের ছেলে বাদশা মিয়া (১৮), সজিব আলীর ছেলে আব্দুর রশিদ (৪৫) ও সিরাজ নূরের ছেলে সৌরভ মিয়াকে (২৬) হারিয়ে শোকার্ত এই গ্রামের হাজারো মানুষ।
গ্রামের ইউপি সদস্য সামিন নূর বললেন, গ্রামের মানুষ শোকে কাতর। সকলেই নিহতদের স্মরণ করে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। তিনি জানালেন, গ্রামের কবরস্তানে পাঁচজনের লাশ দাফন হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় লাশ গ্রামে এসে পৌঁছেছে।
এছাড়া, দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের গছিয়া গ্রামের বারিক উল্লার ছেলে সিজিল মিয়া, মধুপুরের সোনা মিয়ার ছেলে দুদু মিয়া এবং রফিনগর ইউনিয়নের রফিনগর গ্রামের ছলিম উদ্দিনের ছেলে একলিম হোসেনের এই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এলাকাবাসী।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান মামুন মামুন বললেন, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ, নিহতদের স্বজনসহ বিভিন্ন সূত্রে দিরাই উপজেলার নয় বাসিন্দা সিলেটের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এরমধ্যে ভাটিপাড়া গ্রামের ছয়জন, রাজানগরের দুই জন এবং রফিনগরের একজন। নিহতদেরকে সরকারের পক্ষ থেকেই সিলেটেই নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছে। দিরাইয়ে যাদের মরদেহ এসেছে তাদেরকে নগদ ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এই দুর্ঘটনায় জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার আরও তিন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। এরা হলেন- উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে দুলাল মিয়া (২৬), তলেরবন্দ গ্রামের মৃত আমান উল্লার ছেলে আওলাদ তালুকদার (৫০), বীরগাঁও গ্রামের ওয়াহাব উল্লার ছেলে শাহিনুর রহমান (৪৫)।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি খালেদ চৌধুরী জানালেন, দুর্ঘটনায় শান্তিগঞ্জের কতজন মারা গেছেন বিকাল পৌঁনে ছয়টা পর্যন্ত অফিসিয়েলি কোন তথ্য পান নি তারা।