ইকবাল কাগজী
তিন \ মানুষকে পুঁজিবাদ পশুতে পরিণত করেছে
মানবপ্রজাতির সদস্য হিসেবে সকল মানুষ সমান। এই নিরিখে সকল মানুষের সামাজিক, রাজনীতিক ও আর্থনীতিক অধিকার সমান হতে হবে, সেই সঙ্গে সমান হতে হবে সামাজিক মর্যাদাও। কিন্তু বিদ্যমান সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত। এই বৈষম্যটির চারিত্র্যলক্ষণ কী ? একটু খতিয়ে দেখা যাক।
জাপানে তৈরি একটি ছোট আইসক্রিমের দাম কোটি টাকারও বেশি। গত ক’দিন আগে গণমাধ্যমে এ নিয়ে একটি লেখা পড়ে সেটা জানা গেলো। বিশেষ বিশেষ পুঁজিপতির শয্যাগুরুগণ নাকি রূপচর্চার অনুষঙ্গ হিসেবে সে—আইস ক্রিম ভক্ষণ করে থাকেন। এই আইস ক্রিমের এমন ধনী ভোক্তা পৃথিবীতে কোটিকে গুটিকেরও কম, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠিত মুক্তবাজার ব্যবস্থা ‘কোটিকে গুটিকেরও কম’ অর্থাৎ ‘কতিপয় তাঁদের’ জন্য দারুণ ভাবিত ও ব্যতিব্যস্ত। মুক্তবাজার ব্যবস্থা একদিকে এবংবিধ দামি পণ্য উৎপাদনে নিরত যখন, অন্যদিকে তখন খাদ্যাভাবে বিশে^র কোথাও না কোথায় অগণিত মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। সমগ্র মানবপ্রজাতির খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যস্ত না হয়ে পুঁজিবাদ দুয়েক জন পুঁজিপতির মনোরঞ্জনে ব্যস্ত রাখছে নিজেকে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের কোথাও না কোথাও পুঁজিসঞ্চয়ের পরিমাণটা এতোটাই বৃহৎবপুত্ব অর্জন করেছে যে, কেউ না কেউ সে—দামি আইস ক্রিম কেনার ক্ষমতা রাখে। পুঁজিবাদের তাতে কোনও পরোয়া নেই, সে—কোটি টাকার আইসক্রিম কিনে খাওয়ার লোকের তো আর অভাব হচ্ছে না। অনেকেই মুনাফার এই বাহাদুরির প্রশংসা না করে পারছেন না এবং এইভাবে প্রকারান্তরে এই কার্যক্রমের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা অমানবিকতার কৌন্দর্যতার মুখটি তাঁরা ঢেকে দিতে প্রতিনিয়ত পারঙ্গমতা প্রকাশ করেন। এই পারঙ্গতার জন্যে সত্যি তাঁদের প্রসংশা না করে পারা যায় না।
পুঁজির বিশ^জয়ী সা¤্রাজ্যে ইতোমধ্যে পৃথিবীটা আরও বেশি অমানবিক হয়ে উঠছে। ‘আরও বেশি’ বলছি তার কারণ আছে। পুঁজির প্রভুত্বকে সর্বশ্রেষ্ঠ, অপরাজেয় ও অপ্রতিরোধ্য প্রতিপন্ন করতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষাবধি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহর দু’টি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল, গণহত্যার শিকার হয়েছিল দুই লক্ষাধিক। পুঁজিবাদের এই অমানবিকতার দানবিকতা এখনও প্রকটিত হয় বিশ^জুড়ে সন্ত্রাস ও যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে নিজের অস্তিত্বকে সংহত করার কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বেশি বেশি পারদর্শিতা প্রদর্শনে।
জানা কথা, অস্ত্র—বোমা কারও ক্ষুধা নিবৃতির ক্ষমতা রাখে না কিংবা কারও অসুখ সারাতে পারে না, কেবল পারে মানুষ মারতে ও ভূমিসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করতে। কিন্তু মানবসভ্যতার টিকে থাকার জন্য অপ্রয়োজনীয় কোটি টাকার আইসক্রিম কিংবা হাজার লক্ষ কোটি টাকার বিধ্বংসী অস্ত্র—বোমার উৎপাদন যেমন থেমে নেই এবং অর্থনীতির সামরিকায়নের প্রকরণে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে ন্যাটো ও রাশিয়ার ছায়াযুদ্ধ বাঁধানো হয়েছে, তেমনি অস্ত্র ও বোমা বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন ঠিকই অব্যাহত আছে। পুঁজিবাদের পারদরঙ্গমতা এখানেই, এখানেই তার অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্ব, যে—শ্রেষ্ঠত্ব চারিত্র্যলক্ষণে সে দানবীয় তো বটেই, বিশ^মানবতার ভয়ঙ্কর শত্রুও।
এই শ্রেষ্ঠত্ব আদতে সম্পদে ব্যক্তিমালিকানার এক দানবীয় বিগ্রহায়ণ। এই অতুলনীয় দানবিকতা বিশ^পরিসরে যুগে যুগে সাধারণ মানুষকে নিপীড়িত করেছে। ভারতবর্ষ তার ব্যতিক্রম নয়। যেমন ভারতবর্ষের তাজমহলের কোনও প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু একজন প্রেমিক বাদশাহ তাঁর পত্নীপ্রেমের মহিমা জাহিরের বাহানায় আসলে নিজের রাজনীতিক ক্ষমতাসঞ্জাত অহঙ্কারের অসীমতাকে প্রস্ফোটিত করেছেন তাজমহলের শুভ্রসমোজ্জ্বলতায়। এই তাজমহল বানানোর খরচ জুগাতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ কৃষকের কাছ থেকে উচ্চহারে খাজনা আদায় করতে হয়েছে বছরের পর বছর এবং কৃষকরা ক্রমাগত নিঃস্ব হয়েছে। ইতিহাস বলছে, তাজমহল তৈরি হয়েছে ২২ বছর ধরে এবং প্রকারান্তরে এই সময়ের পরিসরে ভারতবর্ষের খদ্যনিরাপত্তা গুঁড়িয়ে গেছে। প্রবল দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়ে অনিবার্য মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। একমাত্র সম্পদে ব্যক্তিমালিকানার অধিকারের দর্পÑ সামন্তবাদী অর্থব্যবস্থার সারৎসারÑ জাহির করতে গিয়েই বিপুল সম্পদ—আহরণমুখি হয়েছিলেন বাদশা শাহজাহান এবং আসলে সামন্তবাদের মূলমর্ম মোতাবেক সিংহাসনে বসে অহঙ্কারের আলো ছড়ানো ছাড়া তাঁর অন্য কোনও কাজ ছিল না । মূলত রাজা—বাদশারাÑ ব্যতিক্রম বাদেÑ এবংবিধ জীবন যাপনেই ছিলেন অভ্যস্ত, এমন কি অনৈতিক যৌনাচারে ছিলেন নিমজ্জিত। যেমন ‘চীনের সম্্রাটগণ তাদের প্রাসাদ নিষিদ্ধ নগরীতে (ঋড়ৎনরফফবহ ঈরঃু) কঙ্কুবাইনদের রাখতেন। কুইং রাজবংশের শাসনামলে এই নিষিদ্ধ নগরীতে ২০,০০০—এর বেশি কঙ্কুবাইন ছিল। এ কঙ্কুবাইন রাখার দুটি উদ্দেশ্য ছিল, যার প্রথমটি হলো অন্তত একজন উত্তরাধিকারী (অবশ্যই পুত্রসন্তান) রেখে যাওয়া আর তার সীমাহীন অনৈতিক যৌনাচারে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া।’ (আশরাফ উল ময়েজ, রক্ষিতা আখ্যান কঙ্কুবাইন, রোদেলা ঢাকা : একুশের বইমেলা ২০১৫, পৃষ্ঠা : ৪৫Ñ৪৬)। এই নারীরা একমাত্র সম্্রাটের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট হতে পারতেন। বুঝুন এবার, সম্পদপ্রাচুর্যের অত্যাচার—ব্যভিচার আর কাকে বলে। স¤্রাট হলে আপনিও এমন করতে পারতেন।
এরপর বুদ্ধি খরচ করে বুঝতে হয় না যে, মানুষের মধ্যে মানুষের ‘শ্রেষ্ঠত্ব আদতে সম্পদে ব্যক্তিমালিকানার এক দানবীয় বিগ্রহায়ণ’। এই উচ্চারণের একটা ব্যাখা প্রদান জরুরি। কীভাবে সম্ভব একটু খতিয়ে দেখা দরকার। মানুষের মধ্যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত ও নির্ণিত হতে পারে। কেউ ভাবতে পারেন, এই বিশেষ উচ্চারণটি একদেশদর্শিতা দোষে দুষ্ট। তা তিনি ভাবতেই পারেন, এমনকি বলতেও পারেন। আপত্তি করবো না। কিন্তু সে—বিতর্কে আপাতত জড়াচ্ছি না। পরিপ্রেক্ষিতের নিরিখে জড়ানো সমীচীন হবে ন। কিন্তু ভুলে না যাবার অনুরোধ করছি যে, এখানে ঘুষ না দিতে পারলে কোনও পদ—পদবি—আসন—মর্যাদা পাওয়া যায় না। এমনকি কেউ কেউ পদ বাগাবার বা পদোন্নতির অভিসন্ধিতে নিজের স্ত্রীকে পর্যন্ত উপরওয়ালর সঙ্গে নির্জনবাসে নির্বাসিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পিছ পা হন না, কিংবা সাংসদ পদে প্রার্থিতার পদটি পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যায় ‘প্রকাশ্য গোপনে’। সুতরাং কেবল বলে রাখছি, এখানে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিটি ‘সম্পদে মালিকানা’র বহরবপুত্ব ভিন্ন অন্য কীছু নয় এবং আলোচনা সে—সাপেক্ষেই আগ্রসর হবে, এই কথা মনে রেখে যে, মানব ইতিহাসে সম্পদের মালিকানা দু’রকম : সামাজিক ও ব্যক্তিগত। আসলে উত্থাপিত বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণের খাতিরে এখানে ব্যখ্যার বয়ার্ণনার চেয়ে যথোপযুক্ত যুক্তি প্রদর্শন করাই অধিক সমীচীন বোধ করছি, আপাতত সেটাই জরুরি। সে জন্য কার্ল মাক্সের্র শরণাপন্ন হতেই হবে এবং যথাসময়ে হবো।
এই প্রবন্ধের অন্যতম একটি প্রতিপাদ্য ‘আমি ভলো নেই’। তেকারণে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে যে, আমি যে পৃথিবীর বাসিন্দা সে—পৃথিবীটা ভালো নেই এবং তার প্রমাণ হলো, বিজ্ঞানিরা ইতোমধ্যে বলে দিয়েছেন পৃথিবী নামক গ্রহটি মরণাপন্ন একটি গ্রহ। মরণাপন্ন গ্রহ ভালো হতে পারে না। এই যুক্তিতে বলা যায়, মরণাপন্ন গ্রহের বাসিন্দারাও, অর্থাৎ জীবজগৎ, বাস্তবত বিপন্ন এবং তারা ভালো নেই। মানবপ্রজাতি এই জীবজগতের জীবপ্রজাতিসমূহের অন্যতম সদস্য, তাই মানুষ এখানে ভালো নেই। এইটুকু স্বীকার করে নিলে, এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরের কোনও দেশ নয়, সুতরাং বাংলাদেশের বাসিন্দরা ভলো নেই এবং অনিবার্যভাবে সুনামগঞ্জের বাসিন্দারও ভালো নেই। চূড়ান্ত বিচারে সমগ্র পৃথিবী, সমগ্র মানবসভ্যতা ভালো নেই। তো আমিই বা কী করে ভালো থাকি, আমিও ভালো নেই।
একটি কথা এখানে ফলাও করে বলে রাখছি, পুঁজিবাদ সম্পত্তিতে সামাজিক মালিকনাকে প্রত্যাহার করে ব্যক্তি মালিকানাকে প্রতিস্থাপিত করেছে উদ্বৃত্তমূল্য আত্মসাতের সূত্রকৌশল আবিষ্কার করতে পেরে। এটাই মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এমনকি নিউটন—আইনস্টাইনের সকল আবিষ্কারের চেয়েও গুরুত্ববহ। যদিও এমন দাবি করার পেছনে একটু ঔদ্ধত্যের অহমিকা পেছনে একটি লম্বা লেজের মতো লেপ্টে থাকে, তারপরেও এই অবিষ্কারকেই শ্রেষ্ঠ বলছি নির্দ্বিধায়।
‘উদ্বৃত্তমূল্য আত্মসাতের সূত্র’ সমাজপরিসরে কার্যকর কিংবা চলিতকর্মের সঙ্গে ওতপ্রোত থাকলে মানবপ্রজাতির অস্থিত্বের মর্মে মানবসত্তা কিংবা মানুষ কোনও প্রকার প্রকরণ অবলম্বন করেই শান্তি অর্জনে সমর্থ হতে পারে না। প্রকারান্তরে আনয়াসে ও নির্দ্বিধায় বলা যায়, শান্তির বিপরীতে অশান্তি জীবননির্বাহের পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ে, একান্ত ব্যতিক্রম বাদে, সমাজসদস্যের কাউকেই ভালো থাকতে দেয় না। আমি তার ব্যতিক্রম নই, সুতরাং আমি ভালো নেই। প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রতিষ্ঠিত সমাজসংস্থিতি আমাকে একেবারেই হতভাগ্য করে তোলেছে, যথার্থ অর্থে করে তোলেছে লুম্পেনÑ প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রের ভাড়াটে হাতিয়ার। আমি কেন, যে—কেউ অনায়াসে এমন উচ্চারণ করতেই পারেন। বলেছিলাম, ‘কার্ল মাক্সের্র শরণাপন্ন হতেই হবে’, কথা প্রসঙ্গে এখন তাঁর শরণ নিচ্ছি। একজন লিখেছেন, ‘মার্কস বলেছেন যে ব্যক্তিগত মালিকানার উদ্ভব এবং শ্রম বিভাজনের কারণে যারা দরিদ্র ও নিঃস্ব, তারা তাদের পুঁজিপতি প্রভুদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পণ্যে রূপান্তরিত হয়, যে পণ্য আবার সব পণ্যসামগ্রীর মধ্যেও সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও হতভাগ্য।’ (মুহাম্মদ তানিম নওশাদ, বিচ্ছিন্নতার বয়ান : বাইবেলীয় ধারণার মাক্সর্বাদী তত্ত্বে উত্তরণ, প্রতিচিন্তা : নবম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, অক্টোবর—ডিিসেম্বর, প্রথমা প্রকাশন : ২০১৯, পৃষ্ঠা : ১০৯) এখানে লেখক কোনও ঘুরপেচের অবকাশ না রেখে সহজ করেই বলেছেন যে, মানুষ বাজারের পণ্য হয়ে উঠে মুড়িমুড়কির মতো নিকৃষ্ট দ্রব্যে পরিণত হয়, তার অভিধা হয়ে উঠে ‘হতভাগ্য’। পুঁজিবাদ মানুষকে নিয়ে বাণিজ্য করে, শ্রমিক যখন তাঁর শ্রম বিক্রি করেন তখন তিনি নিজেই পণ্য হয়ে উঠেন। কয়েক শতাব্দী আগে দাস ব্যবসায়ীরা মানুষকে বাজারে নিলামে তোলে বিক্রি করে দিতো। আর এখন স্বাধীন শ্রমিক শরীরস্থিত শ্রমশক্তি বিক্রির জন্যে নিজেকে নিজেই বাজারের পণ্য করে তোলছেন।
মধ্যযুগের পূর্বাপর সময়ে দাস হিসেবে আস্ত মানুষটাই বিক্রি হতো আর এখন নিঃস্ব (এখানে মার্কসের মতে শ্রমশক্তি ভিন্ন উৎপাদনের অন্য কোনও উপকরণের মালিক নয় এমন মানুষ) শ্রমিক বিক্রি করছেন দেহাশ্রিত শ্রমশক্তি এবং শ্রমশক্তি সংলগ্ন শরীরটাকেও প্রকারান্তরে নির্দষ্ট সময়ের জন্যে বিক্রির নামান্তর করে তোলছেন। কারণ শ্রমশক্তি প্রয়োগের পুরো সময়টায় তিনি কার্যত স্বাধীন থাকতে পারছেন না। সুনামগঞ্জ ডিএস রোডের যেখানে কালিবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা সড়কটি তেমাথার সৃষ্টি করেছে সেখানে প্রতিদিন সকালে সড়কের পূর্বপাশে একটি শ্রমবাজারেরÑ অর্থাৎ আধুনিক দাসবাজারেরÑ সৃষ্টি হয়। এখানে হতভাগ্য নরীপুরুষেরা শ্রমিকরূপে বিক্র হওয়ার জন্যে জটলা বেঁধে অপেক্ষা করেন। এই ‘হতভাগ্য’ হয়ে পড়া অবস্থায় জীবন ধারণ করাকে ভালো যিনি বলেন তিনি অবশ্য অবশ্যই মিথ্যাচার করেন। পুঁজিবাদ মানবসভ্যতাকে এই সংকটে নিপতিত করে পুঁজিপতিদের হাতে মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণের হাতিয়ার কিংবা করণকৌশল তোলে দিয়েছে। এমন সমাজসংস্থিতিতেই এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষ জীবন যাপন করছেন। এমন খতরনাক সংস্থিতিকে কোনও যুক্তিেই ভালো বলা যায় না। এই নিরিখেও পৃথিবী, বাংলাদেশ, সুনামগঞ্জ কিংবা কোনও ব্যক্তিবিশেষ ভালো নেই। এই বিপন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বরং তাঁর মানবসত্তার নিশ্চিত অবনমন ঘটেছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান এবংবিধ অবস্থা অর্থাৎ ‘পশুবৎ বৈশিষ্ট্য’ বিশেষের একটি বয়ান রচনা করেছেন একজন। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো অন্য প্রাণী থেকে তাকে আলাদা করে, সেগুলো ইতিমধ্যেই তার কাছ থেকে লোপ পেয়েছে। যা পশুর বৈশিষ্ট্য, তা—ই হয়েছে মানুষের এবং এই পশুবৎ বৈশিষ্ট্য সে লালন করতে ও অনুভব করতে শুরু করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে যদি তাকাই, তবে দেখব, কেন মাক্সের্র এই সব বয়ান এখনো প্রাসঙ্গিক। এই সব চাকরিতে মানুষ তার প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও স্বকীয়তা থেকে বিযুক্ত। কিছু টাকার বিনিময়ে গৎবাঁধা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন শ্রমিক, ফলে তিনি তার শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন। এমনকি তাঁর দেহও এখন তাঁর নয়, কারণ তাঁর শারীরিক ব্যয় হয় অন্যের প্রয়োজনে বা ইচ্ছায়। তাঁর সার্বিক সত্তা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন। কারণ, তিনি তো এখন আর তাঁর নিজের নন, তিনি এখন অপরেরÑ কোনো ব্যক্তির, গোষ্ঠীর বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের।’ (মুহাম্মদ তানিম নওশাদ, বিচ্ছিন্নতার বয়ান : বাইবেলীয় ধারণার মাক্সর্বাদী তত্ত্বে উত্তরণ, প্রতিচিন্তা : নবম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, অক্টোবর—ডিিসেম্বর, প্রথমা প্রকাশন : ২০১৯, পৃষ্ঠা : ১১০Ñ১১১)। এই বয়ানের নিরিখে যে—কেউ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতেই পারেন যে, মানুষ বহুবিধ বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত একটি প্রাণি। পুঁজিবাদের পরিসরে সে তার শ্রম, প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও স্বকীয়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রকারান্তরে মানুষের মনুষ্যবৎ বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। লোপ পেয়েছে তার মানবিকতা অর্থাৎ মানুষকে পুঁজিবাদ পশুতে পরিণত করেছে। তারপরও কেউ যদি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে এখানে, মানুষ ভালো আছে, সমাজব্যবস্থাটিকে বদলানোর কোনও আবশ্যকতা আপাতত নেই, এবং যারা এই ব্যবস্থাটিকে বদলে দিতে চায় তাদের বিপক্ষে অবস্থান করেন, তিনি অবশ্যই দুর্বুদ্ধির অধিকারী হয়ে নিজেকে দানবীয় মতবাদী করে তোলছেন, তাতে কোনও সন্দেহ থাকে না। এমন হলে, তাঁর তথাকথিত সুবুদ্ধিসঞ্জাত রক্ষণশীলতার বিশেষভাবে তারিফ করতেই হয় বই কি। না করে থাকা যায় না।
(চলবে)


