চন্দ্রাহত শহরের মানুষেরা ভালো নেই

ইকবাল কাগজী
পূর্ব প্রকাশের পর
চার ॥ ‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরিবর্তনীয় প্রাণী’ : একটি ডাহা মিথ্যা কথা
সব মানুষ নয়, এই ধরুন, কীছু মানুষ পশু হয়ে পড়েছ এবং তাতে অবাক হওয়ার কোনও কারণ নেই । এবংবিধ প্রত্যয় স্বীকার করে নিলে, এই সত্যেকেও স্বীকার করে নিতে হয় যে, এই পশুবৎ কেউ কেউ রাজনীতিক কিংবা বাণিজ্যিক বা বারোয়ারি প্রশাসনের উচ্চাসনে আসীন হয়ে প্রভুত্বের অহংকারে চারদিক আলোকিত করে টেবিলের উপর পা তোলে রাষ্ট্রমালিক জনগণকে (তাঁরা প্রকৃতপ্রস্তাবে তথাকথিত মালিক) মস্তানির কেরদানি দেখাচ্ছে, এই প্রাপঞ্চিকতাটিও সত্য হয়ে উঠে এবং ভাবনার উদ্রেক করে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই ধরণের সমস্যার সমাধান কি আসলেই সম্ভব ?
সমাধান নিয়ে ভাবনাচিন্তা তো আর কম হয় নি। যুগে যুগে প্রচার করা হয়েছে এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে। মুসা, বুদ্ধ, যিশু ও মুহাম্মদ (স.) থেকে শুরু করে অনেক অনেক জ্ঞানী মহাজন এই প্রচারের কাজটি করেছেন। কিন্তু মানবের অমানবিক হয়ে উঠা একমুহূর্তের জন্যেও থমকে থাকে নি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে, সভ্য মানুষেরা বর্বর হয়ে উঠেছে বার বার। মানব ইতিহাসে সংঘটিত ছোট-বড় হাজার হাজার যুদ্ধ কিংবা অদূর অতীতের উপসাগরীয় যুদ্ধ ও বর্তমানে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া বনাম ন্যাটোর ছায়াযুদ্ধ তার প্রমাণ, এমন কি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ তো ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও। যার প্রত্যেকটিকে গণহত্যা ভিন্ন অন্য কোনও অভিধায় বিবৃত করা যায় না। এইসব যুদ্ধ পৃথিবীর কোনও উপকারে আসে নি, কিন্তু কতিপয় অস্ত্র ব্যাসায়ীর ধানভা-ার স্ফীত করেছে মাত্র, যাকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভাষায় ‘ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স’ বৃদ্ধি বলে। এই ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কিন্তু অলস বসে থাকে না, প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর প্রতিটি উপান্তে মুনাফা অর্জনের অভিযানে শিকারি কুকুর হয়ে উঠে, উদ্বৃত্তমূল্য শুকে শুকে মানুষকে জনে জেনে তাড়িয়ে বেড়ায়।
সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের পর সমস্যার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই দানবিকতার উৎস কোথায় ? জবাবে বলা হচ্ছে, এর উৎস মানুষের চেতনা ও আচরণ। এই চেতনা ও আচরণকে বদলানো গেলে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন, অবার কেউ কেউ এর বিপরীত মতাবস্থানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন যে, মানুষের চেতনায় স্থিত এই পশুত্বকে কিংবা অমানবিকতাকে মানবিকতায় পর্যবসিত করা যাবে না কখনও এবং কোনও প্রকারেই। যাঁরা ‘বদলানো যাবে’ বলে মনে করেন তাঁরা প্রগতিশীল এবং যারা ‘বদলানো যাবে না’ বলে মনে করেন প্রগতিশীলরা তাঁদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে নিন্দাবাদ করেন। এই প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া চিন্তকরা (সমাজবিদ ও নীতিবিদরা) মনে করেন, এই সমস্যা নিরসনযোগ্য নয়। তাঁরা বলেন, ‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরিবর্তনীয় প্রাণী। দু’হাজার বছর ধরে তাকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে : হত্যা করো না, অপহরণ করো না, প্রতারণা করো না, কিন্তু দুনিয়ায় আগের মতোই রক্তের ধারা বইছে, রাহাজানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিশ^াসঘাতকতা করছে। মানুষকে অবশ্যই কিছু পরিমাণে সমাজজীবনের উপযোগী করে তোলা যায়, তাকে বাহ্য শিষ্টাচার পালনের পরিধির মধ্যে শিক্ষা দেওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে তার মধ্য থেকে পশুত্বকে উন্মুলিত করা এবং অসৎ স্বভাবকে দূর করা কখনই সম্ভব হবে না।’ (…, সমাজবিদ্যা, অনুবাদক : অরুণ সোম, প্রগতি প্রকাশন মস্কো : ১৯৭৭, পৃষ্ঠা : ৪৬১)। তারপর উপরোক্ত ভাষ্যসাপেক্ষে রক্ষণশীলতার চর্চা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সিদ্ধান্ত টানতেই হয় যে, মানবের ভেতরের দানবটিকে হত্যা করা যাবে না, কখনওই এবং ঘুরে ফিরে ‘মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণ করা’র নির্মম দানবিকতা কখনওই বন্ধ হবে না। যথারীতি প্রত্যক্ষ উৎপাদকের শ্রমজাত দ্রব্যসমাগ্রী বিনামূল্যে আত্মীকরণ কিংবা চুরি অব্যাহব থাকেবে এবং ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলচ্যুতি (দখল করে নেওয়ার প্রক্রিয়াÑ ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি অনুসরণ, এমনকি যুদ্ধ করে হলেও) ইত্যাদির মতো প্রকরণের হাজারটা অনুষঙ্গের একটু অন্যরকম একটি উপানুষঙ্গ ‘মাদকাসক্ত’দের কর্মকা-ে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হতেই পারেন, তাতে বিচিত্র কী। এই মাদকবাণিজ্যেরও মাফিয়াতন্ত্রের গোপন কার্যক্রমের পরিসরে একটি বাজারদখলের প্রক্রিয়া আছে, সেটাও একধরণের যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। সে-আর এক মুনাফার মৃগয়াক্ষেত্রÑ ভয়ঙ্কর হিং¯্র ও রক্তাক্ত পাতালের জগত, ভীষণ অমানবিক। মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধবাণিজ্যনীতির পরিসরে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক এবং এই স্বাভাবিকতাকে কখনওই অস্বাভাবিক করে তোলা যাবে না, পুঁজিবাদ স্বস্বার্থে তাই (‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরিবর্তনীয় প্রাণী’) প্রচার করে এবং প্রকারান্তরে শোষণের আর্থসামাজিক প্রক্রিয়াটিকে অমরত্ব দান কারার পর্যায়ক্রমিক মিথ্যাচারে নিরত থাকে। যেহেতু যে-কোনও বস্তু, অবস্তু (ভাব, ধারণা) এমনকি সমাজ ইত্যাদি যাবতীয় প্রাঞ্চিকতার ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয়তার নীতি কার্যকর ও সুস্থির (যদিও সেটা কখনওই ‘সুস্থির’ থাকে না, মহাজাগতিক দ্বান্দ্বিকতার নিয়মানুসারে প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে প্রকারান্তরে অস্থির হয়ে উঠে) থাকা, আসলে অধ্যাসাকারে সমাজমানসে কার্যকর ও সুস্থির থাকা, পুঁজিবাদের পক্ষে অতীব জরুরি ও যৎপরোনাস্তি সুবিধাজনক। সুবিধাটা এই যে, এতে করে উদ্বৃত্তমূল্যশোষণ নির্বিঘেœ অব্যাহত রাখা যায় এবং কোটি টাকায় একটি আইসক্রিম বিক্রি করার পথ উন্মুচিত থাকে কিংবা যুদ্ধ বাঁধিয়ে অস্ত্রব্যবসায় চাঙ্গা করতে বেগ পেতে হয় না, পরিশেষে মুনাফা লুণ্ঠনের পরিসর আরও ব্যাপকাকারে প্রশস্ত হয়। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে জগতে যে-কোনও বস্তুক কিংবা নির্বস্তুক অস্তিত্বেরÑ এতৎসঙ্গে সমাজেরওÑ বিকাশ সম্পন্ন হয় দ্বান্দ্বিকতার নীতির সাপেক্ষে। সেখানে পরিবর্তন এবং একমাত্র পরিবর্তনই সর্বপ্রকরণের সার। স্বয়ং পুঁজিবাদ আদিমসম্প্রদায়ধর্মী সমাজ থেকে ক্রীতদাসভিত্তিক সমাজে, ক্রীতদাসভিত্তিক সমাজ থেকে সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে পর্যবসিত হয়েছে। সমাজের ক্রমবিবর্তনের এই ঐতিহাসিকতাকে অস্বীকার করা প্রকৃতপ্রস্তাবে মানবসভ্যতার ইতিহাসকে অস্বীকার করে নিজেকে মূর্খ ঘোষণা করার নামান্তর, যখন কেউ ‘তত্ত্বে বিজ্ঞ নয় সাধারণ মানুষ’-এর মতো ‘এমনটাই প্রকৃতপ্রস্তাবে সত্য’ বলে মেনে নেবেন। কিন্তু এর বিপরীতে যখন জেনেবুঝে কেউ সমাজবিকাশের নিয়মকে অস্বীকার করবেন, তখন তিনি মিথ্যাবাদী প্রতারক হয়ে উঠবেন সমাজের বাকিসব মানুষের কাছে, যাঁরা সমাজবিকাশের তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর কাছে জানতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষাপর এবং এই করে প্রকারান্তরে তিনি মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণের অমানবিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে মানবদেহধারী হয়েও অন্তরে দানব হয়ে উঠেন।
মানুষ নিয়ে কোনও বক্তব্য রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সমাজ বিকাশের প্রতিটি স্তরে মানুষের কর্মপ্রয়োগের প্রকৃতি বদলে গিয়ে মানুষকেও বদলে দেয়, প্রকারান্তরে বিপ্লব ঘটায়। প্রতিক্রিয়াশীল মতপ্রবক্তাপ্রবরগণ যখন বলেন, ‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরিবর্তনীয় প্রাণী’ তখন প্রকৃতপ্রস্তাবে বৈজ্ঞানিক ধারণার বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে মিথ্যাচার করেন এবং মানুষের সঙ্গে প্রতারণায় প্রবৃত্ত হয়ে নিজেকে ভ- ও শয়তান করে তোলেন। মানুষের এই শয়তানীই সমাজ পরিসরে প্রতিবিপ্লবীর প্রতিকল্পরূপে আবির্ভূত হয়ে যুগে যুগে সাধারণ মানুষের উপর শোষণ-নির্যাতনকে ভয়ঙ্কর হিং¯্র, সংহারক, দানবীয় করে তোলেছে এবং সময়ের প্রেক্ষিতে দীর্ঘ। তাঁরা স্বীকার করতে চান না যে, সমাজের অনিবার্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজসদস্য হিসেবে ব্যক্তি মানুষেরও পরিবর্তন হয়, কারণ সমাজ গঠনের উপাদান একক হলো ব্যক্তি মানুষ। প্রয়োজনে মনুষের পরিবর্তনের হাজারটা দৃষ্টান্ত হাজির করা যায়, যদিও এখানে সে-সব দৃষ্টান্ত উপস্থাপানের অবকাশ নেই। কিন্তু অপরদিকে বক্ষ্যমান প্রবন্ধের বক্তব্য প্রতিপন্নকরণের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ পরিবর্তনের যৌক্তিকতা প্রমাণের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।
একটু খতিয়ে দেখা যাক। একটি পুস্তকে লেখা হয়েছে, “প্রাচ্যের মহান চিন্তানয়ক ইব্ন রুশদ (আভেরোস) ও ইব্ন সিনাও (আভিৎসেন্না) অনুরূপ অভিমত পোষণ করতেন। প্রথমোক্তজন মনে করতেন যে গতি চিরন্তন ও অপরাজেয়। আত্মপ্রকাশ, পরিবর্তন ও বিকাশ সবই বস্তুতে রয়েছে এক সম্ভাবনা হিসাবে, কেননা বিকাশ পুনরুৎপাদনের মতোই একটি ক্রিয়া। গর্ভস্থ যে কোনো সত্তার মধ্যেই ক্ষয় থাকে এক সম্ভাবনা হিসেবে। তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তিরা যাঁকে ‘দর্শনের যুবরাজ’ নামে অভিহিত করতেন, সেই আভিৎসেন্নাও মনে করতেন যে গতি বিভবরূপে অনুস্যূত আছে বস্তুর মধ্যে এবং তা তার রূপান্তরিত হওয়ার সামর্থ্যরে সমতুল।” (গ. কিরিলেঙ্কো, ল. করশুনোভো ॥ দর্শন কী, অনুবাদ : প্রফুল্ল রায়, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা : ১১৯Ñ১২০) এখানে বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গতির প্রসঙ্গে প্রাচ্য চিন্তকদের চিন্তাধারার বয়ার্ণনা উপস্থাপন করা হয়েছে। এককথায় যাকে বিকাশের নীতি বলে অভিহিত করা যায় এবং পৃথিবীর চিন্তাবীরগণ তাই করেছেন। তাঁরা প্রকৃতি, সমাজ ও জ্ঞানের ইতিহাস ব্যাখ্যার হাতিয়ার হিসেবে বিকাশের এই নীতিকে একটি সার্বিক নীতি করে তোলেছেন। এই বিকাশের নীতির দ্বান্দ্বিকভাবে আন্তঃসংযুক্ত দুটি দিক আছে : ক্রমবিকাশমূলক ও বৈপ্লবিক নীতি। ক্রমবিকাশমূলক নীতির লক্ষণ হল বিষয়টিতে ক্রমান্বিত গুণগত পরিবর্তন এবং বৈপ্লবিক নীতির লক্ষণ হল বিষয়টির গঠনকাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন। পৃথিবীর যেখানে যতোগুলো সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছে তার প্রত্যেকটিতে এইরূপ পরিবর্তন ঘটেছে এবং তদানুরূপ এই পরিবর্তনের নীতিপ্রবক্তা চিন্তকদের আবির্ভাব ঘটেছে। চীন, ভারত কিংবা কোনও পাশ্চাত্য সভ্যতা তার ব্যতিক্রম নয় এবং অনুসন্ধিৎসুজনের কাছে সে-তথ্য দুষ্প্রাপ্য কীছুও নয়।
ইতিহাস বলছে উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদনসম্পর্কের অনিবার্য দ্বন্দ্বের ফল স্বরূপ সমাজকাঠামোর পরিবর্তন সাধিত হয়। একজন লিখেছেন, ‘বিপরীত সব শ্রেণী-সংবলিত শোষণভিত্তিক সমাজগুলিতে এক প্রস্ত উৎপাদন-সম্পর্কের প্রতিকল্প হিসাবে আর এক প্রস্ত উৎপাদন-সম্পর্ক স্থাপতি হয় সমাজবিপ্লবের মধ্য দিয়ে।’ (স. ইলিন, আ. মতিলেভ, অর্থশাস্ত্র কী, অনুবাদ : প্রফুল্ল রায়, প্রগতি প্রকাশন মস্কো : ১৯৮৮, পৃষ্ঠা : ৩৮)। এটাই সমাজ বিকাশের নিয়ম, এর কোনও অন্যথা হয় না, এর কোনও প্রতিকল্প নেই। সমাজ বিকাশের বা পরিবর্তনের এই অবিকল্প সার্বিক নীতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একজন লিখেছেন, ‘এই সংস্থিতিগুলি (আদিম সম্প্রদায়গত, দাসপ্রথাধীন, সামন্ততান্ত্রিক, পুঁজিতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট) মানুষের ইচ্ছা বা চেতনা নিরপেক্ষ, উৎপাদনী শক্তির বিকাশের তাড়নায় একটি বিষয়গত প্রক্রিয়ায় পর্যায়ক্রমিকভাবে একে অন্যের স্থানাপন্ন হয়। উৎপাদনী শক্তি যখনই উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে দ্বন্দ্বলিপ্ত হয়, শেষোক্ত প্রথমোক্তকে শৃঙ্খলিত করে তখনই একটি সংস্থিতির পরবর্তীটিতে বৈপ্লবিক রূপান্তর অনিবার্য হয়ে উঠে। ঠিক এটাই পুঁজিতন্ত্রের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। সামন্ততন্ত্রের উপর বুর্জোয়া বিপ্লব চরম আঘাত হেনেছিল হল্যান্ডে ১৬শ শতকের শেষে, ইংল্যান্ডে ১৭শ শতকে ও ফ্রান্সে ১৮শ শতকে আর সেগুলি এইসব দেশে বুর্জোয়ার বিজয় ঘোষণা করেছিল। অতপর পুঁজিতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় জার্মানি, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে। (আ. বুজুয়েভ, পুঁজিতন্ত্র কী, অনুবাদ : দ্বিজেন শর্মা, প্রগতি প্রকাশন মস্কো : ১৯৮৮, পৃষ্ঠা : ১৪)।
সন্নিবেশিত সমাজ পরিবর্তনের সামগ্রিক বিষয়টি কারও কারও কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও যৎপরোনাস্তি জটিল মনে হতেই পারে, কেননা প্রচলিত জ্ঞানচর্চার একদেশদর্শিতাসহ বিভিন্ন নিষেধ-নির্দেশের প্রতিবন্ধকতা তাঁকে সমাজবিকাশের নিয়মের বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে দিতে পুরোপুরিই অক্ষম অথবা মোটেও আগ্রহী নয়। প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ নিয়ন্ত্রকরা তাই তাঁদের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানচর্চায় ‘বিপ্লব’ সম্পর্কে হয় নীরব থাকেন, প্রসঙ্গটিকে সযতেœ এড়িয়ে যান অথবা সম্পূর্ণ প্রসঙ্গবহির্ভূত করে রাখেন। তাঁরা যে-কোনও পরিবর্তনকে এতোটাই ভয় পান যে, ক্ষেত্র বিশেষে পরিবর্তন তথা বিপ্লব যাতে সংঘটিত না হয় তার জন্যে জ্ঞনচর্চাকে বিপ্লবের বিপরীত নিয়মের অনুবর্তী করে তোলেন। সে-জন্য প্রচলিত এই নিয়মের বিপরীতে অবস্থন গ্রহণ করে সমাজবিকাশের নিয়ম বিপ্লবের বিয়য়ে আরও স্পষ্ট ধারণা প্রকাশের বাসনায় আর একটি উদ্ধৃতির সন্নিবেশ করছি। একজন বলেছেন, “বিপ্লবের প্রধান নিয়মটা সম্বন্ধে লেনিনের চিরায়ত সূত্রটা এই : ‘বিপ্লব ঘটার জন্যে শোষিত এবং উৎপীড়িত জনগণের পুরন কায়দায় জীবনযাপনের অসাধ্যতা উপলব্ধি করা এবং পরিবর্তন দাবি করা যথেষ্টে নয়; বিপ্লব ঘটার জন্যে এটা অবশ্যপ্রয়োজনীয় যে, শোষকরা পুরন কায়দায় জীবনযাপন করতে এবং শাসন চালাতে অপারগ হবে। একমাত্র যখন ‘নি¤œতর শ্রেণীগুলি’ পুরন কায়দায় জীবনযাত্রা চালাতে চায় না, আর ‘উচ্চতর শ্রেণীগুলি’ পুরন কায়দায় চালিয়ে যেতে পারে না, তখনই বিপ্লব জয়যুক্ত হতে পারে। এই সত্যটাকে প্রকাশ করা যেতে পারে অন্য কথায় : দেশজোড়া সংকট (যা শোষিত এবং শোষক উভয়ের উপর ক্রিয়াশীল হয়) ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব।” (… (অনুল্লেখিত), দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের অ-আ-ক-খ, অনুবাদ ; বিষ্ণু মুখোপাধ্যায়, প্রগতি প্রকাশন মস্কো : ১৯৭৮, পৃষ্ঠা : ৪০৭-৪০৮)
‘মানুষকে অবশ্যই কিছু পরিমাণে সমাজজীবনের উপযোগী করে তোলা যায়, তাকে বাহ্য শিষ্টাচার পালনের পরিধির মধ্যে শিক্ষা দেওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে তার মধ্য থেকে পশুত্বকে উন্মুলিত করা এবং অসৎ স্বভাবকে দূর করা কখনই সম্ভব হবে না।’ উপরোক্ত বাক্যটির মাধ্যমে পরিবর্তনে সমর্থন নেই এমন চিন্তকরা পরিবর্তনের অনিবার্য পদ্ধতিকে অস্বীকার করছেন। তাঁরা যে-কোনও স্ববচনে সচরাচর তাই করে থাকেন। তাঁরা বিশ^ব্রহ্মা-ের সর্বত্র সৃষ্টির শুরু থেকে কার্যকর পরিবর্তনের এই সত্যকে মানতে চান না এবং বিপরীতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের অনুবর্তী চিন্তকেরা মনে করেন, এই পরিবর্তনের নীতিই কেবল পরিবর্তিত হয় না। জাগতিক সকল মূর্তবিমূর্ত অস্থিত্বের সঙ্গে অনিবার্যভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে অপরিবর্তনীয়তার নীতির বিপরীতে পরিবর্তনীয়তার নীতি, অর্থাৎ কেবল পরিবর্তনই কার্যকর থাকে যে-কোন মূর্ত-বিমূর্ত প্রাপঞ্চিকতার ক্ষেত্রেই। মানুষ জীবন পায়, ছোট থেকে বড় হয়ে উঠে ও মৃত্যুবরণ করে; ক্রমবিকাশের এই সূত্র সর্বত্রই কার্যকর, তা জীব ও জড় যা-ই হোক না কেন অথবা সমাজ। ‘মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অপরিবর্তনীয় প্রাণী’ একটি ডাহা মিথ্যা কথা, সত্যের লেশ মাত্র এতে উপস্থিত নেই, সত্যের অপলাপ মাত্র।
(চলবে)