হিরন্ময় রায়
ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রস্তাবিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালে আগস্টের ১৪ ও ১৫ তারিখে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুইটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হলেও পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ববঙ্গের মধ্যে ধর্ম ছাড়া আর কোন কিছুতেই মিল ছিলো না। ভাষা, জীবনধারা, সংস্কৃতি, দৈহিক অবয়ব, পোশাক, সামাজিকতা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের খাঁটি মুসলমান মনে করতো না। যেমন, মালিক ফিরোজ খাঁ নুন একবার প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা সব ধর্মান্তরিত হিন্দু। পশ্চিম পাকিস্তানীরা এই পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে মনে করতো। এদেশের মানুষকে তাঁরা আপন করে নেয়নি। পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই তাঁরা শোষন করতে থাকে পূর্ব বাংলাকে। এই সা¤্রাজ্যবাদের মুখোশ উন্মোচনের জন্য আওয়ামী লীগ ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত “কেন পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসন চাই” নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের কর্তৃক শোষনের চিত্র উপস্থাপন করে-
সরকারি কর্মচারীদের শতকরা ভাগ :
বিভাগ / পশ্চিম পাকিস্তানী / পূর্ববঙ্গীয়
প্রতিরক্ষা- / ৯১.৯% / ৮.১%
স্বরাষ্ট্র – / ৭৭.৫% / ২২.৫%
কৃষি – / ৭৯% / ২১%
শিল্প- / ৭৪.৩% / ২৫.৭%
শিক্ষা – / ৭২.৭% / ২৭.৩%
স্বাস্থ্য – / ৮১% / ১৯%
সোনার বাংলা শ্মশান কেন
বৈষম্য বিষয় / পূর্ববঙ্গে( বাংলাদেশ) / পশ্চিম পাকিস্তান
রাজস্ব খাতে ব্যয় – / ১৫০০ কোটি / ৫০০০ কোটি
উন্নয়ন খাতে ব্যয়- / ৩০০০ কোটি / ৬০০০ কোটি
বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহার – / ২০% / ৮০%
বৈদেশিক দ্রব্য আমদানী – / ২৫% / ৭৫%
কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি – / ১৫% / ৮৫%
সামরিক বিভাগে চাকরি – / ১০% / ৯০%
চাউলের মূল্য – / ৫০ টাকা / ২৫ টাকা
আটা মণ প্রতি – / ৩০ টাকা / ১৫ টাকা
সরিষার তেল সের প্রতি – / ৫ টাকা / ২.৫০ টাকা
স্বর্ণ প্রতি ভরি- / ১৭০ টাকা / ১৩৫ টাকা
পূর্ব বাংলার জনসাধারণের আয় ও বৈদেশিক সাহায্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়নমূলক কাজ হতো। মিলিটারী কলেজ, প্রি-ক্যাডেট স্কুল ও অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির সবকিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে তৈরী করা হয়। আদমজী, মির্জা, বাওয়ানী, ইস্পাহানী ইত্যাদি পশ্চিম পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের হাতে পূর্ব বাংলার সকল বড় বড় ব্যবসা বাণিজ্য চলে যায়।
তারও আগে আরো একটা শোষণের কথা না বললে পশ্চিম পাকিস্তানের হীন উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয় না। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের দুটো অংশের মধ্যে দূরত্ব ছিলো বারোশ মাইল। মধ্যে অন্য একটি রাষ্ট্র। ভৌগলিক দূরত্ব এবং জীবনাচরণের পার্থক্য নিয়ে রাষ্ট্রটি অদূর ভবিষ্যতে অখন্ড থাকবে না, তা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন বিদায়ী ইংরেজ গভর্নর লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ও কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। এটি উপলব্ধিতে ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানিদের। তাই তাঁরা প্রথমেই পূর্ব বাংলার জাতীয়তার ঐক্যের প্রতীক বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করে। তাঁরা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার পায়তারা করে। তখন পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিবাদ করেন। ভাষাবিদ ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা থেকে প্রকাশিত “পূর্ববাংলার জনমত” নামে একটি সাপ্তাহিকে “বাংলা ভাষা” নামে প্রবন্ধে বাংলা ভাষাকে হেয় করার বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন। সম্ভবত পাকিস্তানের চক্রান্তের গোড়ায় জল ঢালার দায়েই হয়তো বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকিস্তানী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণ-পরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও পরিচালনার জন্য কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই বলে প্রস্তাব নাকচ করেন-Pakistan as a Muslim state must have lingua franca language of Muslim nation and that can only be Urdu and no other language.
কিন্তু খেয়াল করুন তখন পাকিস্তানের উভয় অংশের নাগরিকরা যে ভাষায় কথা বলতো তার শতকরা হার ছিলো নিম্নরূপ :
বাংলা – ৫৪.৬%, পাঞ্জাবী – ২৭.১%, উর্দু – ৬%, পস্তু – ৬.১%, সিন্ধী- ৪.৮% এবং ইংরেজি – ১.৪%।
সুস্পষ্টভাবেই বাঙালিকে পদানত করতে এটা ছিলো তাদের কূটচাল।
সংশোধন প্রস্তাব আনার দায়ে পাকিস্তানিরা শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং নির্মম নির্যাতন করে তারা তাঁকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা করেছিল। ১৯৪৮ সালে মার্চে ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে মি: জিন্নাহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানি দের পূর্ব সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেন, Let me make it very clear to you that the State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Any one who tries to mislead is really the enemy of Pakistan.
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন তাদের নেতৃত্বে ছাত্ররা প্রতিবাদের ঝড়ে ও বিক্ষোভ মিছিলে সেই কথা ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাকিস্তানিদের এই চক্রান্ত পাকিস্তানিদের জন্য বুমেরাং হয়ে যায়। ঢাকার জাতীয় নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলাকে শোষনের পথে হাঁটছে। তাঁরা ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিপরীতে বিকল্প দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন নারায়নগঞ্জে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সম্পাদক এবং কারাবন্দী বঙ্গবন্ধু হন সহ সাধারণ সম্পাদক।
এর আগে বাংলা ভাষার অবমাননায় ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের মধ্যে ভাঙ্গন ধরে। ১৯৪৮ সালের ২৫ বৈশাখ সারা পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন হয়। এতে অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার। বাংলা ভাষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকায় মিছিল হয় আব্দুস সামাদ আজাদ, হাবিবুর রহমান, আব্দুল মতিনদের নেতৃত্বে। পুলিশ গুলি চালালে শহীদ হন সালাম, রফিক, বরকত। এই হত্যাকান্ডে সারা বাংলায় আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা পিছু হটে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
সেই যে অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনের স্ফুরণ ঘটে এর রেশ পড়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। ভাসানী-মুজিব নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ লীগ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক দল, মাহমুদ আলী – আব্দুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী পার্টি, নেজামে ইসলামসহ কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট এর কাছে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ধরাশায়ী হয়। কিন্তু পূর্ব বাংলায় বাঙালির নির্বাচিত সরকার শপথ নেয় ১৯৫৪ সালের ৩রা এপ্রিল যেখানে প্রধানমন্ত্রী হন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও বঙ্গবন্ধু হন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। নানা অজুহাতে সেই সরকারকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার বরখাস্ত করে একই বছর ৩০ মে। কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন জারি হয়।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব বাংলা ছিলো সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এ দেশীয় নেতারা নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন বাঙালিকে কোন অধিকার দিবে না পশ্চিম পাকিস্তানীরা। তাই বাঙালির স্ব-শাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনকে জোরদার করার মানসে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষনের চিত্র তুলে ধরার জন্য ছয় দফা প্রণয়ন করেন ও আওয়ামী লীগ এই প্রস্তাবনা অনুমোদন করেন।
ছয় দফা :
১) সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পুন:প্রবর্তন ও সর্বজনীন ভোটাধিকার ; ২) প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ব্যতীত সকল বিষয়সমূহ প্রদেশসমূহের নিকট ন্যস্ত করা; ৩) পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য পৃথক মুদ্রা প্রবর্তন বা পৃথক কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থাপন; ৪) করারোপের সকল ক্ষমতা প্রদেশসমূহের উপর অর্পন; ৫) আন্তর্জাতিক বানিজ্যে প্রদেশসমূহের স্বাধীনতা এবং ৬) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বনির্ভরতা অর্জন।
১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত দুদিন ব্যাপী বিরোধীদলীয় সম্মেলনের সময় মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাবজেক্ট কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু ছয় দফা উত্থাপন করেন, কিন্তু বিরোধীদলগুলো এটি গ্রহণ করেনি। ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পত্রিকাগুলো ৬ দফাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র হিসাবে সমালোচনা করে। বঙ্গবন্ধু ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনে ৬ দফার ব্যাখ্যা দেন। ৬ দফা কী কোন ষড়যন্ত্র ছিল?
৬ দফাতে মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মূলভাবকে ধারণ করা হয়। পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে এর প্রদেশ সমূহের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ের প্রস্তাবনা ছিলো। এতে অভিন্ন ফেডারেল রাষ্ট্র পাকিস্তানের অধীনে প্রদেশসমূহ স্বীয় স্বীয় স্বার্থরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব ছিলো। এ ধরণের শাসন ব্যবস্থা উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে তখন বিদ্যমান ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী শোষকরা শোষনের সুযোগ ছাড়তে চায়নি। তাই তারা একে ষড়যন্ত্র আখ্যা দেয়।
১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা প্রস্তাব এবং দাবী আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন কর্মসূচী গৃহীত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদের ভূমিকা সম্বলিত ছয় দফা কর্মসূচীর একটি পুস্তিকা প্রকাশ হয় একই মাসে। ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ৬ দফা অনুমোদন হয় এবং বঙ্গবন্ধুর নামে “আমাদের বাঁচার দাবি : ৬- দফা কর্মসূচি” প্রকাশ করা হয়। ২৩ মার্চ অনানুষ্ঠানিক ভাবে ছয় দফা উত্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু সারাদেশে ছয় দফার অনুকূলে গণসংযোগ শুরু করেন। মানুষ সাড়া দেয়। পাকিস্তানী শাসকের ভিত নড়ে উঠে। তারা বঙ্গবন্ধুকে লাগাতার গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। কিন্তু মানুষ ফুসে উঠে। ১৯৬৬ সালে ৭ জুন ৬ দফা দাবি আদায়ের জন্য হরতালের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও টঙ্গীতে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে ১১ জন নিহত হন। প্রথম শহীদ হন সিলেটের মনু মিয়া। এই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে সারা দেশে। কার্যত ৬ দফাতে বাঙালি মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। ছয় দফা ছিলো বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বা মুক্তির সনদ। এই আন্দোলনই পাকিস্তানী শাসনের কবর রচনা করেছিল।
তথ্যসূত্র :
১) ভারত স্বাধীন হল- মৌলানা আবুল কালাম আজাদ
২) মধ্য রাতের স্বাধীনতা- দ্যুমেনিক ল্যাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্স
৩) সাংবাদিকদের চোখ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত
৪) অনলাইনে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত সূত্র।


