জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক ভূমিকা প্রয়োজন

সোমবার দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী সভা সমাবেশ মানববন্ধন পালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচীর মাধ্যমে দেশব্যাপী মাথা চাড়া দেয়া সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ বিরোধী সচেতনতা তৈরির প্রয়াস চালানো হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসমাজ আজ এক গভীর লজ্জায় পতিত হয়েছেন।  যদিও ব্যক্তি বিশেষের কোন বিচ্যুতির দায় প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারে না এবং এটি অনুচিতও, তারপরেও বলা যায় দেশের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে সাধারণের মাঝে এক ধরনের কৌতুহল তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে নতুন জ্ঞান তৈরির জায়গা। এখানে নিত্যনতুন নানা বিষয়ে গবেষণা হবে, এর মধ্য দিয়ে মানবসমাজের কল্যাণে বেরিয়ে আসবে বিভিন্ন পথ। সেই জ্ঞান বিকাশের জায়গায় যদি জঙ্গিবাদী তৎপরতা শিকড় গেঁড়ে বসে তখন জাতির আতংকিত হওয়ার অবকাশ থাকে বৈকি। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা হলো দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম। এরা এক সময়ে দেশকে নেতৃত্ব দেবে। এই প্রজন্মের মধ্যে যখন খারাপ কোন অনুষঙ্গ প্রবেশ করে তখন সেটি জাতিকে বিকলাঙ্গ করার মতোই ভয়াবহ বিষয় বটে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সচেতনতা তৈরির উদ্যোগটি একান্তই প্রয়োজনীয় ছিল। সারা দেশে একই দিনে এই ধরনের কর্মসূচী পালনের জন্য আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
জঙ্গিবাদের যে দর্শন আমাদের দেশে আজ তরুণদের বিপথগামী করছে সেখান থেকে উদ্ধার পেতে হলে অনুষ্ঠানসর্বস্ব কিংবা প্রচারনির্ভর কর্মসূচীর সাথে ব্যাপকভাবে নৈমিত্তিক কাজের অংশ হিসাবে নানাবিধ তৎপরতা শুরু করতে হবে। আমাদের যে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা সেখানে কোথায় ঘাটতি রয়েছে যে কারণে তরুণরা বিভ্রান্ত হচ্ছে সেটি খুঁজে বের করা জরুরি প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যকার গলদ অপরিবর্তিত রেখে জঙ্গিবাদ রুখা কিছুতেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকে। অধিত বিষয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে যখন বিষয়গুলো চলে আসে তখন শ্রেণি শিক্ষককে এর ভয়াবহতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। আমরা জানি বহু শিক্ষক রয়েছেন যারা মনে মনে প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা পোষণ করেন, বাহ্যিকভাবে এদেরকে চিহ্নিত করা কঠিন। এরা কৌশলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। ওইসব শিক্ষককে চিহ্নিত করে হয় তাদের সংশোধন করতে হবে নতুবা শিক্ষকতার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। ঘরে ইদুর রেখে ধানের গোলা রক্ষা করা যেমন সম্ভব নয় তেমনি প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার শিক্ষক রেখে ছাত্র-ছাত্রীদের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মনন গঠন করাও সম্ভব নয়।  
দেশে বিভিন্ন সেক্টরে এখন জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যে জাগরণ তৈরি হয়েছে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। সরকার এককভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশটির অপার সম্ভাবনাকে কিছুতেই নষ্ট হতে দেওয়া চলবে না। যে দেশ শিল্প-শিক্ষায়, কৃষি-উৎপাদনে, মানবসম্পদ-প্রযুক্তিতে ক্রমশ উন্নতি করছে সেই দেশটিকে আজ স্থবির ও মৃতপুরীতে পরিণত করা যাবে না। দেশের শান্তি বজায় না থাকলে আমাদের সন্তানেরাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সন্মুখীন হবে যেখানে তাদের জীবন ও জীবিকার কোন নিশ্চয়তা থাকবে না।  অতএব আসুন আমরা সকলে মাতৃভূমির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে যে যার অবস্থান থেকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য চেষ্টা করি।