বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
তখনও পুরোপুরি সাব সেক্টরের কার্যক্রম শুরু হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা দেনদরবার করছেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে বিতারণের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেলা সাব সেক্টরে কোন বাঙালি অধিনায়ক নেই। আমরা তখন ভারতের রেঙ্গুয়া নামক স্থানের একটু ভেতরে বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান করছি। ছোট একটি ছন বাঁশের ঘর। পাশেই একটা ব্যরাক করা হয়েছে। আনসার, ই.পি.আর. মুজাহিদ ও মুক্তিযোদ্ধারা থাকেন এই ব্যরাকে। শহীদ চৌধুরী নামে এক উদ্যমী পুুরুষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন এখানে। সবকিছু চলছিল আগোছালোভাবে। কর্নেল বকসী নামে এক ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তার নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা হিট এন্ড রান পদ্ধতিতে পাকিস্তানী বাহিনির স্থাপনায় আঘাত হানছে। একদিন দেখা হল মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিছ আলীর সাথে। তার কাছেই শুনলাম এম.এন.এ. আব্দুল হক সাহেবের মাধ্যমে তারা ছাতক থেকে কয়েকজন প্রথম ব্যাচে ট্রেনিং নিতে যান। আব্দুল হক সাহেবের নাম শুনেছিলাম ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়। এক সময় তিনি আজিমপুর ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে এসেছিলেন অনেক আগে থেকেই। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তাকে ছাতক-জগন্নাথপুর আসনে জাতীয় পরিষদে প্রার্থী করেছিলেন। ছাতক-জগন্নাথপুরের মানুষ তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেন। এরই মাঝে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক আসায় তিনি সাধারণ মানুষের কাতারে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
১৫ আগস্ট ১৯৭১ সাল। সেলা সাব সেক্টরের কমান্ডার হিসাবে যোগদান করেন পাকিস্তানের শিয়ালকোট ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা তরুণ ক্যাপ্টেন হেলাল। তখন তিনি ২২ বছরের এক যুবক। রেঙ্গুয়ার পাশে আমাদের ক্যাম্পে এসে খবর নেন এই এলাকার রাজনৈতিক উপদেষ্টা আব্দুল হক এম.এন.এ সাহেবের। তার ইচ্ছা সাব সেক্টর হেড কোয়ার্টার একটি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া। যুদ্ধ করতে হবে কয়েক বছর। তিনি বললেন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে কয়েক বছর ধরে। আমাদেরকে একইভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এম.এন.এ আব্দুল হক সাহেবের সাথে আলাপ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সেলা সাব সেক্টরের হেড কোয়ার্টার সরিয়ে আনা হবে বাঁশতলায়। তার আগেই ছাতক দোয়ারাবাজারের মুক্ত এলাকায় বিভিন্ন বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ। হেমেন্দ্র দাস পুরকায়স্থ (দিঘলি), আব্দুল মোসাব্বির (বাঁশতলা), শামসুল হক, আব্দুল কাদির, আলী আহমদ (পূর্ব বাংলাবাজার), আব্দুল কাদির ও নয়ন ডাক্তার (নরসিংপুর), আহসান উল্লাহ, সোনাব আলী চকিদার (পশ্চিম বাংলাবাজার), আব্দুল হামিদ (টেংরাটিলা), মদনমোহন নন্দী (হাসাউড়া), আব্দুর রইছ চৌধুরী (লক্ষীপুর), একেএম আসকির মিয়া (দোয়ারাবাজার), উমেদ আলী মোড়ল, আব্দুল কাদির (কান্দাগাও) প্রমুখ বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করা সহ সংগ্রাম পরিষদের দায়িত্ব নিয়ে মুক্ত এলাকার প্রশাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সময়ই দেখতে পেলাম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আব্দুল হক এম.এন.এ মুক্ত এলাকার সংগ্রাম পরিষদের কাছে একটা নির্দেশনামা জারী করেছেন। নির্দেশনামাটি ছিল নিম্নরূপ
১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত থাকিয়া ন্যায়, সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করিয়া যাইতে হইবে।
২. কোন চাঁদা বা সাহায্য আদায় করিতে হইলে সাহায্য বা চাঁদাদাতার লিষ্ট প্রস্তত করিয়া সেই লিষ্ট পূর্বে আমার দ্বারা অনুমোদন করিয়া লইতে হইবে।
৩. চাঁদা বা সাহায্যকারীকে রশিদ দিতে হইবে এবং রশিদের এক কপি দাতার স্বাক্ষর সহ আদায়াকারীর নিকট রাখিতে হইবে।
৪. প্রতি আদায়কৃত সাহায্য হিসাব বহিতে জমা দিতে হইবে এবং প্রত্যেকটি ভাউচার দ্বারা সমর্থিত হইতে হইবে।
৫. কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকিলে তাহার নাম প্রথম আমার নিকট দাখিল করিতে হইবে এবং আমার পূর্ব উপদেশ ব্যতিত কোন ব্যবস্থা চলিবে না।
৬. শত্রুপক্ষের সংবাদ সতর্কতার সহিত সংগ্রহ করিয়া সম্ভাব্য দ্রুততার সহিত আমার নিকট পৌছাইতে হইবে।
স্বাক্ষর :-
আব্দুল হক এম.এন.এ ১৯.০৭.১৯৭১
(নির্দেশনামাটি জয় বাংলা সিলযুক্ত বাংলাদেশ সরকারের প্যাডে ছিল)
উপরোক্ত নির্দেশনামাটি পড়লেই বুঝা যায় কতটুকু বিচক্ষণ হলে এ ধরনের নির্দেশনামা তার অনুসারীদের নিকট প্রেরণ করা যায়। এম.এন.এ আব্দুল হককে দেখার বা তাঁর সাথে পরিচয় হওয়ার বাসনা তখন থেকেই আমার জাগ্রত হতে থাকে। বাঁশতলাতে সাব সেক্টর হেড কোয়ার্টার তৈরীতে প্রতিদিন ক্যাপ্টেন হেলালের সাথে থাকি। একদিন ক্যাপ্টেন হেলাল বললেন তোমাকে এখনই সেলাতে যেতে হবে। একটি চিঠি দিয়ে বললেন আমাদের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আব্দুল হক এম.এন.এ সাহেবের কাছে চিঠিটা পৌছাতে হবে। এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করার কোন কারণ নেই। সোজা রওয়ানা হলাম সেলা বাজারের পথে। বাংলাদেশের গণপরিষদের সদস্যকে সেলার ডাক বাংলোতে পাব ভেবে সোজা চলে গেলাম সেলা নদী পার হয়ে বাজারের দিকে। জিজ্ঞাসা করতে যে উত্তর পেলাম তাতে আমি আশ্চর্যান্বিত হয়েছি। তিনি নাকি শরণার্থী শিবিরে থাকেন। অগত্যা আবার সেলা নদী পার হয়ে শরণার্থী শিবিরে আসলাম। একটা ছোট্ট কুড়ে ঘরে থাকেন আব্দুল হক সাহেব। যেভাবে তাঁর এলাকার মানুষজন শরণার্থী শিবিরে থাকছেন তিনি সেভাবেই থাকেন। শরণার্থীদের মত রেশন নিয়ে খাওয়া দাওয়া করেন। একজন জাতীয় পরিষদ সদস্য হিসাবে আলাদা কোন সুবিধা নিতে তিনি রাজী নন। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। মনে হল আমরা সঠিক নেতৃত্বেই একটা মুক্তির সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করছি। সামান্য সময়ের আলাপে আমাদের সুবিধা অসুবিধার খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। বললেন অন্ধকারের পরেই আলো আসে। আর অন্ধকার না থাকলে আলো নামে কোন শব্দ অভিধানে থাকত না। সামান্য সময়ের মাঝে তাঁর নিজের খাবারের মাঝে আমাকে ভাগ বসিয়ে দিলেন। বললেন তোমার খাওয়াটাই আজ আমাকে কাজ করতে প্রেরণা জোগাবে। এটাই ছিল আব্দুল হক সাহেবের সাথে আমার প্রথম দেখা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের কমান্ডাররা তাঁর সম্পর্কে যেরূপ উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন তাতে আমি তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে দিল একটি দুর্ঘটনায়। শেষবার যখন তাঁকে দেখি তখন তিনি চলে গেছেন অন্য জগতে। সিলেট পুরাতন হাসপাতালে প্রচুর জনসমাগম। স্বাধীনতার আনন্দ যেন ম্লান করে দিয়েছে সিলেটবাসীকে। জননেতার লাশটাকে দেখে আমি ভাবি এই ১৯ ডিসেম্বর না আসলে কি হত ?
সদ্য স্বাধীন দেশে জনাব আব্দুল হককে সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। একটি জিপে করে আসছিলেন তিনি সুনামগঞ্জ। জিপটা চালাচ্ছিলেন চা বাগানের ম্যানেজার গোলাম মোস্তফা। এই গোলাম মোস্তফা মুক্তিযুদ্ধের সময় ৫ নং সেক্টরের এডজুটেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জিপে বসা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হারুন (ক্যাডেট কলেজের ছাত্র) ও ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতিক। জিপের চালকের পাশেই ছিলেন জনাব আব্দুল হক এম.এন.এ। সিলেট থেকে আসার পথে গোপাল নামক জায়গায় একটি গাছের সাথে ধাক্কা খায় জিপটি। আব্দুল হক সাহেবের মুখমন্ডল ও নাকে আঘাত পেলে তাঁর প্রচুর রক্তপাত হয়। সেখান থেকে তিনি আর ফিরতে পারেননি। আমরা হারাই একজন প্রতিশ্রুতিশীল জননেতাকে। যাকে হয়তো আমরা বাংলাদেশের অনেক উচ্চ পর্যায়ে দেখতে পারতাম।
রাজনৈতিক মঞ্চে তিনি নিজেকে অত্যন্ত সাধারণ বেশভুষায় উপস্থাপন করতেন। মানব কল্যাণে জীবন উৎসর্গকারী এই জননেতাকে ছাতকবাসী ভুলেননি। দলমত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে জনাব আব্দুল হকের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য গোবিন্দগঞ্জে প্রতিষ্ঠা হয় আব্দুল হক স্মৃতি কলেজ। বাঁশতলার নাম হয়েছে হকনগর। শুধু তাই নয় আব্দুল হকের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাই আবুল হাসনাতকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেন ছাতকবাসী। এটা ছিল মরহুম আব্দুল হকের প্রতি ছাতকবাসীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার বহি:প্রকাশ।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র আইনজীবী।


