জন্মদিন-কবি ইকবাল কাগজী মঙ্গলদীপ জ্বালো কলমে তোমার

কুমার সৌরভ
কবি ইকবাল কাগজী এখন আর কবিতা লিখেন না। কবি কবিতা লিখা ছেড়ে দিলে কবিসত্বাকে হত্যা করা হয়। কবি নিজেকে নিজে হত্যা করে চলেছেন নাকি নিশ্চল ও পদভজা মগজি আমরাই হন্তারক? এই প্রশ্নের জবাবে কবি মুখে কুলুপ এঁটে রাখবেন, নিশ্চিত। আমরাও মুখের অর্গল খুলব না খুলব না বলেই পণ করে বসে থাকব। কবি বিসন্ন হলে আকাশ কাঁদে, কবি বিমর্ষ হলে নদী শুকায়, কবি কলমের মুখ বন্ধ করলে জগৎ অন্ধকার হয়। কবিকে জাগিয়ে আমাদের আকাশ, নদী, জগৎ সকলকে প্রসন্ন রাখতে হবে। দোহাই কবি, আপনি কবিতাকে নির্বাসিত করবেন না। সকলে না হোক কিছু মানুষ আছেন যারা এখনও হৃদয়ের উঠোনে সুন্দরের বীজ রোপণ করে জলসিঞ্চনের মধ্য দিয়ে পরম মমতায় বের করে আনেন সবুজ বৃক্ষ। তাদের জন্য আপনি কবিতার নীরবতা ভাঙুন।
কবি, আপনি অভিমানভরে উচ্চারণ করেছিলেন‘কেমন আছি জানতে চেয়ো না। সূর্যের মর্মজ্বালা চন্দ্রের/ তো বুঝবার কথা নয়’ (তিয়েস্তি রাধিকেষু), আমরা বুঝি না বলেই গাঙের ঢেউয়ের মতো আঁচড়ে পড়তে চাই আপনার উদোম বুকের প্রশস্ততায়। ঠিক আপনার বন্ধু কবি আশরাফ আহমদের আকুতির মতো‘যে থাকে আপাদ-মাথা/ তোমার সত্তায় লীন/ মহান সুন্দরতর যে থাকে গোপন যতেœ /আলুথালু স্বচ্ছ আয়নায় থাকে ছায়া/ যে থাকে সিন্দুকে,/ চোখের কিনারে থাকে ভাসমান জলের উপরে/ যে থাকে স্মৃতিতে জেগে/নিশীথে নিদ্রায় থাকে জাগরণে/আড়ালে অন্তরে থাকে/সে আমার কঠিন অসুখ আর তোমার আপন,’   (গোপন মানুষ)।
কবি, আপনি প্রেমের পূজারি, আপনি ভালোবাসার কাঙাল। আপনি সময়ের দুর্জন-ত্রাসে ক্রুদ্ধ, আপনি জীবনের জয়গানে মুখরিত, আপনি ভবিষ্যৎকালকে নিজের মতো করে পেতে উদগ্রীব। সেই যে ‘ক্ষেত্রকরের হৃৎপি- বিদ্ধ করা/ বহুব্রীহির তীক্ষè বল্লম হতে ঝরে পড়া/ রক্ত সিঁদুরে আরক্ত তার মাথার সীমান্ত’ (বিসন্ন ফেরা), তাঁর ‘চোখে অভ্র আভার কাজল’ না পড়িয়ে কোন বিজনে যাবেন আপনি? আপনি বিজনে গেলে তো ‘অসৎরা সব রাজার হালে জীবন কাটায় মন্দ না,/রাস্তাঘাটে আদাব-সালাম উপরি মেলে একটানা।/সৎ মানুষের ঘাড়ে গদা, লাইড়ে লাত্তি, গঞ্জনা’ ( কাগজীর কারচুবি ৫) দশা হবে। সুতরাং হে কবি ‘নষ্ট হওয়ার কষ্ট’ নয় আপনি আমাদেরকে সেই কষ্টই দিতে থাকুন ‘যে কষ্টের নিভৃত গভীরে আছে উসখুস মিছিলের প্রেম’ (দিতে পারি)।
কবি, আপনি ষাট অতিক্রম করছেন আজ। ষাটে এখন কারো কুঁজ ন্যুব্জ  হয় না। এখন ষাটেও যৌবন ছলছল ঝরনার মতন বেগবান থাকে। এখন ষাটেরাও ষাঠ ষাঠ করে অমঙ্গল হঠায়। অতএব ষাটের ঘাটে ল্যাপ্টে থাকা নয়, সত্তর আশিকে বরণ করতে তৈরি করুন কাব্য মায়াঞ্জন। আপনাকে জন্মদিনে অভিবাদন অভিনন্দন নয়, আমরা আবাহন করি শঙ্কনিনাদে কাব্যের ভুবনে আসন গ্রহণ করার ।
ভালবাসা লও
কবি বড় বেশি ভালোবাসার কাঙাল। কবিতার ছত্রে লিখছেন ‘দীপ্রস্বরে বলে যাও কবি/ পৃথিবীর বড় বেশি ভালোবাসা চাই/ বোমায় সবুজ পোড়ে বৃক্ষ লতা ফুল/ গাভিন ফসলি মাঠ মাটি/ কৃষকের দগ্ধ লাশ কাস্তে হাতে ভীষণ বীভৎস স্ট্যাচু/ অপরসায়নে নষ্ট জলবতী জল/ বিষবাষ্পে বিষানো আকাশ জুড়ে উৎকীর্ণ পাষাণ ক্রুশ/ পালাবে সভ্যতা যিশু জাতিসংঘ জায়গা দিবে না’  (ঘোষণা)। কবির এই ভালোবাসার আকুতি ব্যক্তিক সীমা অতিক্রম করে দেশ-কাল ডিঙিয়ে বিশ্বজনীন সার্বজনীন এক মঙ্গল আকাক্সক্ষার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে। কবি নিজে সুবিধাবঞ্চিত অথবা বলা যায় অসাম্যের শিকার। তাই কবিতায় তিনি আক্ষেপ করে বলতে পারেন‘বঙ্গভবন শহীদ মিনার এই পতাকা/ সংবিধানের বাক্যগুলো টাকশালের একটি টাকা/কেউ নয় তার/ ভুবনভরা ভালোবাসা সোহাগি হাত/ তখন ঝড়ে চুলোর পাড়ে বনলতা সেন/ সোনা হাতে এক কাপ চা একটি লুচি/ কেউ নয় তার’ (অনধিকার)। কবি যখন সমষ্টির প্রতিনিধি হয়ে উঠেন তখন তার ব্যক্তিগত আক্ষেপ হয়ে যায় সকলের। বিভ্রান্ত সময়ের জটিল ঘুর্ণিবলয়ে মানুষের দিশেহারা ভাব প্রকাশে কবি যখন বলেন‘এ পৃথিবী অরণ্য আগুনে পোড়া/সেই কবে কপালকু-লা বন ছেড়ে গেছে/ আর আমি দশদিক দগ্ধ বনে/পথভ্রষ্ট  বিভ্রান্ত পথিক’ (অনির্দেশ)। তখন কবিই বিভ্রান্তির অবসানে পথনির্দেশ করেন অমোঘ আশাবাদের মধ্য দিয়ে‘ তার পর পর আছে/মানবিক ঝড়/আপোষের একটি বাক্যও হবে না উচ্চার/তিমির কালের কোলে শুয়ে থাকা এক শিশু বিদ্রোহে দুর্বার’ (ভবিষ্যৎ)। তবে কবি জগতের অসাম্য, অসুন্দর, অপ্রাপ্তি, দুঃখবোধ আর কষ্টকে যতটা অবলীলায় কাব্যবর্ণনায় স্থান করে দিয়েছেন ততটাই উপেক্ষা করে গেছেন এ থেকে উত্তরণের পথনির্দেশে। কবিকে বিপ্লবী কিংবা সংস্কারক হতে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি।  কিন্তু সমকালীনতার দাবিকে কলমের সুচাগ্র দিয়ে তরল কালির প্রপাতে কাগজের বুক না ভাসালে তাকে কর্তব্যবিচ্যুত বললে অত্যুক্তি করা হবে না।
6tvএবার নিরেট গদ্য আক্ষেপের আগুনে পোড়া
গদ্য লিখছেন তিনি দীর্ঘকাল ধরেই। প্রথমে ফরমায়েশি পরে নিজের তাগিদেই লিখছেন। আশির দশক থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জের এমন কোন পত্রিকা নেই যেখানে ইকবাল কাগজী লিখেননি। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলকে দিয়ে এইচএমভি যেমন প্রায় জোর করে গান লিখিয়ে নিয়েছিল তেমনি কবি কাগজীকে দিয়েও অনেকে গদ্য লিখিয়েছেন, কলাম লিখিয়েছেন। কাগজী নিজের মতো করেও অনেক লিখেছেন। ‘বাঙালি মুসলমানের নামায়ন’ নামের তাঁর একটি প্রবন্ধ-সংকলন ইতোমধ্যে প্রকাশিতও হয়েছে। তিনি বাংলায় বিভাষার আক্রমণ ও আধিপত্য কায়েমের বিষয়ে লিখেছেন দীর্ঘ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণাত্বক প্রবন্ধ। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত তাঁর ধারাবাহিক প্রবন্ধ-সাহিত্য ‘প্রতিবিধিৎসাপ্রকরণ’ ও ‘নামায়ন’ বিদগ্ধমহলে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। পাঠকমহলের একটি সাধারণ অভিযোগ ইকবাল কাগজীর প্রবন্ধ কিছুটা দুর্বোধ্য এবং কঠিন শব্দ ব্যবহারে আক্রান্ত। এরকম হয় অনেকের ক্ষেত্রে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্য যেমন ঝরঝরে ও সহজ-সরল মনে হয় তেমনি আহমদ শরীফের গদ্যকে অনেক কটমটে দুর্বোধ্য ঠেকে। বিষয়বস্তুর জটিলতা অনেক সময় লিখিত প্রকাশভঙ্গিকে কঠিন করে আবার লেখকের নিজস্ব রচনাশৈলির কারণেও এটি হয়। তবে সকল লেখকের মূল উদ্দিষ্ট যেহেতু পাঠক সমাজ তাই পাঠকরা বুঝতে পারেন এমন শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করাই উচিত।  
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত গদ্য একত্রিত করলে একাধিক পুস্তক প্রকাশ করা সম্ভব। তিনি যে পরিমাণ কবিতা লিখেছেন তা একমাত্র প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘নষ্ট কুসুমের কষ্ট’ ধারণ করতে অক্ষম, তাই কবির অধিকাংশ কবিতাই এখন মোটা মোটা খাতার পাতায় বন্দী। তিনি যেসব লিমেরিক, কারচুবি নামায়িত চতুর্পদী লিখেছেন তা শুধু একটি ‘কাগজীর কারচুবি’ আশ্রয় দিতে পারে না। আর তাঁর লিখা গত ত্রিশ বছরের গদ্য কলাম, প্রবন্ধ, নিবন্ধগুলো তো সংশ্লিষ্ট পত্রিকা-সংকলনের বা-িলেই দমবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ‘ইকবাল কাগজী সমগ্র’ আমরা তাঁর জীবদ্দশায় পাব কিনা জানি না, তবে যদি পাঠকদের কাছে আসতো তাহলে নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যই এতে উপকৃত হতো। কিন্তু প্রচারকুণ্ঠ, যোগাযোগে অনভ্যস্থ, অভাবে কাতর কবির এই অমূল্য রতœরাজিকে কে আনবেন হিরণয় উঠোনে?
তিনি বাংলা ভাষা, ব্যাকরণ, বাংলা ভাষায় প্রবিষ্ট নতুন শব্দ, আঞ্চলিক শব্দ এমনসব কাঠখোট্টা বিষয়ে ভীষণ আগ্রহী। বাংলা ভাষায় ব্যবহার করা নতুন নতুন শব্দের তালিকা, প্রয়োজনীয় তথ্যপঞ্জিকাসহকারে, কয়েকটি ঢাউস সাইজের খাতা পরিপূর্ণ হয়ে আছে তাঁর। প্রতিনিয়তই এতে যুক্ত হচ্ছে নতুন শব্দ আর এর ব্যবহারের উৎস। শুধু এই কাজটি তিনি করে যেতে পারলে ভাষাবিদদের তালিকায় আমরা একজন ইকবাল কাগজীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা দেখতাম। কিন্তু হাওরের মাঝে শাপলা ফুল হয়ে ফুটে থাকা সুনামগঞ্জের এই কবি, প্রাবন্ধিক, ভাষাবিদকে রাজধানীর প্রাণহীন প্রান্তরে পৌঁছে দিবে কে? আমরা তো মধুকর হতে পারিনি, তাই ফুলের মধু অনাস্বাদিত থেকে যায় এমন করেই। আফসোস।
প্রেরণার উৎস কবিপতœী নাসিমা কাগজী আর দুই নয়নের তারা ত্বিষা-ঈষাকে নিয়ে কবির তৃপ্ত সংসার । এই সংসারী কবির স্বপ্ন একটি উপন্যাস লিখা। কবির নিজের ভাষায়Ñ ‘এজন্য আমার জীবনের স্থিতিশীলতা দরকার, নিজের জন্য কিছুটা নির্জনতারও প্রয়োজন রয়েছে। হয়তো এই ইচ্ছা কোনদিনই পূরণ হবে না। কারণ জীবনের ঘানি টানতে টানতেই জীবন শেষ হয়ে যাবে।’ কষ্ট নাকি লেখককে তাতানো লোহায় পরিণত করে। আমরা কষ্টের ঠোঁটে বসত করা কবির কাছ থেকে সুখের না হোক কষ্টের উপাখ্যান একখানা আশা করতেই পারি।  
কবি ষাট অতিক্রম করছেন আজ। তাঁকে ঘিরে শহরের কোথাও ফুল্লমঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। নীরবে, ফেসবুকের কল্যাণে কয়েকটি তরঙ্গায়িত বার্তায় আর কড়ে আঙুলে গোনা যায় এমন ক’জন স্বজন-শুভানুধ্যায়ীর অভিনন্দনেই কবির দিন কাটবে। ঘুম থেকে উঠে কবি হয়তো নিজেও মনে করতে পারবেন না আজকের দিনটিই তাঁর কেতাবি জন্মদিন। বাজারের ব্যাগ আর জামার পকেট দু’টোই খালি থাকার কারণে আজও বোধ করি কবি মাসকালের না কাটা দাড়ির জঙ্গল নিয়ে পৌরবিপণির মধ্যবিত্তে এসে বসবেন, মেদহীন ছোট্ট শরীরের দুলকিতে কেউ বুঝতেও পারবে না আজ ছিল একজন কবির জন্মদিন। এভাবেই যায় দিন… এভাবেই যাবে দিন?