জাতীয় বাজেট রাষ্ট্রীয় নীতি আদর্শকে ধারণ করে

প্রতি বছর বাজেট পেশ ও অনুমোদন একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই গতকাল তথ্যপ্রযুক্তির চমৎকার ব্যবহার করে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন। এবার করোনা দুর্যোগ ও তৎপ্রতিক্রয়ায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাজেট নিয়ে মানুষের আগ্রহ কিছুটা বেশি ছিলো। বরাবরের মতো এবারও টাকার হিসাবে বিশাল অংকের বাজেট পেশ করা হয়েছে। করোনার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি পুনরুদ্ধার করে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং একই সাথে প্রান্তিক জনসাধারণের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে অর্থমন্ত্রীর বয়ানে প্রাযুক্তিক কণ্ঠ থেকে। পাশাপাশি আগের বৃহদাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বেশ কিছু পণ্যের উপর থেকে কর হ্রাস ও আয়করের জন্য ন্যূনতম আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সিগারেটের উপর অধিক করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিগারেটের মূল্য বাড়লে ধূমপায়ীরা ধূমপান ছেড়ে দিবে এমন প্রত্যাশা থেকেই বছর বছর এই কর বাড়ানো হয়। দাম বাড়ার কারণে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমে গেছে এমন পরিসংখ্যান নেই। ধূমপান কমানোর এমন উদ্যোগ বরাবরই আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ, এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদকদের কর ফাঁকির মাধ্যমে মুনাফার স্ফীতি ছাড়া আর কোনো লাভ হয় বলে কেউই মনে করে না। ধূমপানের নামে বিষপান কমানোর উপায় এ ধরণের দ্রব্যাদির উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানো। প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল ইন্টারনেট ও কলের উপর আরও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও ব্যাপকতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। মোবাইল ফোন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো হয়ে উঠেছে। ধনি গরিব সকলেই মোবাইল ব্যবহার করেন। এই সর্বজন সেবার উপর কর না বাড়িয়ে আরও কমালে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথও প্রশস্ত হয়।
বাজেট নিছক এক বছরের আয়-ব্যয়ের একটি অগ্রিম পরিকল্পনা কেবল নয়। বরং বাজেটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও দর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠে। এবং এই নীতি ও দর্শন পূর্ববর্তী বছরগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণই হয়ে থাকে। হঠাৎ করে একটি বছরে এসে বাজেটের চরিত্র পালটে যাবে এমন হয় না। এবারের বাজেটও সরকারের পূর্ববর্তী বাজেটগুলোরই ধারাবাহিকতা। বলতে গেলে নতুন কোনো চমক নেই। নেই স্পষ্টভাবে পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত। অথচ বাজেট নিয়ে আবেগাক্রান্ত জনপ্রত্যাশা সবসময়ই একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকে।
বাজেটে কোন খাতে কতো টাকা বরাদ্দ করা হলো সেটি একটি প্রশ্ন বটে। তবে এর চাইতেও বড় প্রশ্ন হলো স্বচ্ছতার সাথে অর্থ খরচ করা। রাষ্ট্রীয় খাতে দুর্নীতির মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ আত্মসাত করা হয়। চলমান করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য বিভাগের ক্রয় কর্মসূচিতে প্রকৃত মূল্যের চাইতে অনেক বেশি দামে দ্রব্যাদি সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। বলাবাহুল্য এই ধরণের অভিযোগ সরকারি সকল ক্রয়ের ক্ষেত্রেই কম বেশি বাস্তব। যদি সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করা যেত তাহলে কথিত স্বল্প বরাদ্দ দিয়েই অনেক বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়। এবারের বাজেট বক্তৃতায়ও অর্থমন্ত্রী আগের মতই দুর্নীতির লাগাম টানার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যদিও ব্যাপকভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো সফলতা নেই। এরকম ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক নীতির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।
প্রস্তাবিত বাজেট বিস্তারিত আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত হয়ে ন্যূনতম জনপ্রত্যাশা পূরণ করুক এই আমাদের কামনা।