গোলাম সরোয়ার লিটন
তাহিরপুরে বৌলাই নদীর উপর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন স্থানে সেতু নির্মিত হয়েছে ২০০৯ সালে। সেতুটির দক্ষিণপ্রান্ত তাহিরপুর থানার (পুলিশ স্টেশন) পাশে আর উত্তর প্রান্ত মিলিত হয়েছে সদর ইউনিয়নের রতনশ্রী গ্রামের পূর্ব পাশে। কিন্তু রতনশ্রী গ্রামবাসী এই সেতু ব্যবহার করে যাতায়াত করতে পারেনা। তাই উপজেলা পরিষদের সন্নিকটে থেকেও রতনশ্রী গ্রামবাসীকে আজো যাতায়াত করতে হয় বর্ষায় নৌকাযোগে আর হেমন্তে পাঁেয় হেঁটে। গ্রামবাসীর দাবি দ্রুত গ্রামের সাথে বৌলাই সেতু পর্যন্ত একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার অন্যতম বৃহৎ গ্রাম রতনশ্রী দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার। গ্রামটিতে পাঁচশত পরিবারের প্রায় ৩ হাজার লোকের বাস। রতনশ্রী গ্রাম ও উপজেলা পরিষদের মধ্যে দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে বৌলাই নদী। এই নদী গ্রামটিকে উপজেলা সদর
থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ২০০৯ সালে বৌলাই নদীর উপর সেতু নির্মিত হয়েছে। সেতুটির দক্ষিণপ্রান্ত মিলিত হয়েছে রতনশ্রী গ্রামের পূর্বদিকে। তবুও হাওরপাড়ের ওই গ্রামের বাসিন্দারা সেতুটি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেনা। কারণ গ্রাম থেকে বাসিন্দাদের যাতায়াতের কোন সংযোগ সড়ক নেই। গ্রামটির বাসিন্দারা হেমন্তে আইলপথ দিয়ে হেঁটে উপজেলা সদরে আসতে পারলেও বর্ষার ছয়মাস যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা।
সদর ইউনিয়ন পরিষদ সুত্রে জানা যায়, উপজেলার ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাচীন গ্রাম রতনশ্রী। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় রাজনীতিতে গ্রামের বাসিন্দারা প্রভাবশালী। বৌলাই নদীর পাড় ধরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই গ্রামটির লোকসংখ্যা প্রায় তিন হাজার। গ্রামটিতে দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু উপজেলা সদরের সাথে সংযোগ সড়ক না থাকায় পার্শ^বর্তী গ্রামগুলোর চেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, শিক্ষা ও রাজনৈতিকভাবে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে গ্রামটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বৃহৎ মাটিয়ান হাওরের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত রতনশ্রী গ্রামের চারপাশ এই মুহর্তে কয়েক ফুট পানি দ্বারা বেষ্টিত। তাই গ্রামের সকল বাসিন্দা ও ছাত্রছাত্রীদের গ্রাম থেকে উপজেলা সদর, সদর বাজার ,কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়ে যাতায়াতে একমাত্র ভরসা নৌকা। গ্রামবাসী ভেবেছিল বৌলাই সেতুটি নির্মিত হলে তাদের এই যাতায়াত দুর্ভোগের অবসান ঘটবে। কিন্তু সে আশা আজো পূরণ হয়নি। বর্তমানে গ্রামের পাঁচশত পরিবারের মধ্যে মাত্র ১০টি পরিবারের লোকজন এই সেতুটি ব্যবহার করে উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু গ্রামের পাশ দিয়ে একটি সংযোগ সড়ক নির্মিত হলে পুরো গ্রামের লোকজন উপজেলা সদর, সদর বাজার, কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়ে খুব সহজেই যাতায়াত করতে পারবে। এতে করে সার্বিকভাবে গ্রামের বাসিন্দাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। উপজেলা সদরের নিকটে থেকেও শুধুমাত্র একটি গ্রামসংযোগ সড়কের কারণে উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা গ্রামটির বাসিন্দারা এ বছর নানাভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এজন্য তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করে গ্রামসংযোগ সড়কটি নির্মাণের দাবি সোচ্চার।
গ্রামের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সম্মানের ছাত্রী জুহি আক্তার বলেন, উপজেলার নিকটবর্তী হয়েও শুধুমাত্র গ্রাম সংযোগ সড়ক না থাকায় শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছি আমরা। বিশেষ করে গ্রামের নারীদের জীবনে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরুপ প্রভাব পড়ছে।
গ্রামের কর্মজীবী যুবক সৈকত হাসান বলেন, গ্রামকে উপজেলার সাথে সংযোগ করতে একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি বহু পুরনো। বর্তমানে একটি আবেদন মাননীয় এমপি মহোদয়ের কাছে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি।
গ্রামটির বাসিন্দা স্থানীয় সংগীত সংগঠন ‘টাঙ্গুয়া শিল্পীগোষ্ঠী’র সাধারণ সম্পাদক রুপম আখঞ্জি বলেন, উপজেলার সমৃদ্ধশালী এই গ্রামটি দিন দিন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে শুধুমাত্র একটি সড়কের অভাবে।
একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত আবু সুফিয়ান টিপু বলেন, এগার বছর আগে বৌলান নদীতে সেতু হয়েছে। সেতুর একপ্রান্ত আমাদের গ্রামে কিন্তু আমরা সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে পারিনা। বাপ দাদার মতোই আজো আমাদের যাতায়াতে ভরসা বর্ষায় নাও হেমন্তে পায়ে হাঁটা।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, উপজেলা সদরের পাশর্^বর্তী ঐতিহ্যবাহী রতনশ্রী গ্রামটি উপজেলার অন্যতম বৃহৎ গ্রাম। গ্রামটিকে উপজেলা সদরের সাথে সংযুক্ত করার দাবি খুবই ন্যায্য। অনেক আগেই এ কাজটি করা উচিত ছিল। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি গ্রামটিকে বৌলাই সেতুর সাথে সংযুক্ত করতে গ্রামের উত্তরপাশ দিয়ে একটি রাস্তা নির্মাণের।


