জামানত হারানো ও ডামি ক্যান্ডিডেট নির্বাচনী সংস্কৃতির দুর্বলতা

প্রতিটি নির্বাচনের পরই জামানত খোয়ানো বেশ কিছু প্রার্থীর নাম পাওয়া যায়। নির্বাচনী বিধিমালা অনুসারে কাস্টিং ভোটের এক অষ্টমাংশ পরিমাণ ভোট না পেলে ওই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। অর্থাৎ তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যে টাকা জামানত রেখেছিলেন সেই টাকা আর ফেরত পাবেন না। সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রতিটি ধাপের শেষে প্রায় সকল ইউনিয়নে এক বা একাধিক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ধর্মপাশায় ১৭ চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত খোয়ানোর উপর গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন উপজেলার জামানত হারানো প্রার্থীদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কোন কোন প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ এতই নগন্য যে ভাবতে অবাক লাগে, তিনি কেন নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যে যতগুলো অসঙ্গতি রয়েছে এই জামানত হারানো প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি অন্যতম। এটি প্রচলিত ব্যবস্থার একটি দুর্বলতাও বটে। যে প্রার্থী নির্বাচকম-লীর একটি ন্যুনতম অংশের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন বুঝতে হবে তিনি নিজের জনপ্রিয়তা নেই, এমনটি জেনেই ভোটে দাঁড়িয়েছেন। ডামি ক্যান্ডিডেট বলে একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় অবস্থানকারী মুখ্য প্রার্থীগণ নাকি প্রতিপক্ষের ভোট কমানোর জন্য এক বা একাধিক ডামি ক্যান্ডিডেটকে দাঁড় করান। ওই ডামির পারিশ্রমিকসহ যাবতীয় খরচ বহন করেন তিনি। ধরা যাক, একজন প্রার্থী যে গ্রামের অধিবাসী অথবা যে গোষ্ঠীর ভোট বেশি পাবেন বলে ধারণা করা হয়, প্রতিপক্ষ সেই গ্রামের অথবা গোষ্ঠীর একজন ব্যক্তিকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিবেন। ওই ডামি যৎসামান্য যাই ভোট পাবেন তাই লাভ। কারণ শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণে ওই অল্প পরিমাণ ভোটই নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের অপকৌশলের কারণে নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ে। আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর পর কিছু প্রার্থী এক পর্যায়ে কোন প্রার্থীর অনুকূলে সমর্থন ব্যক্ত করে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ান। আবর কিছু ব্যক্তি শুধুমাত্র হুজুগবশত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসেন নিজেন ন্যুনতম জনপ্রিয়তা না থাকা সত্বেও। এইসব কারণেই অজনপ্রিয় প্রার্থীর আধিক্য চোখে পড়ে যারা জামানত হারিয়ে সমাজে উপহাসের পাত্রে পরিণত হন।
প্রচলিত নির্বাচনী বিধিমালা অনুসারে এ ধরনের প্রার্থীদের আটকানোর কোন পথও নেই। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার রয়েছে সকল নাগরিকের। সুতরাং আইন সংশোধন নয় বরং নির্বাচনী সংস্কৃতির ব্যাপক সংস্কার ও মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ধরনের দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলার প্রয়াস নেয়াটাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দেয়ার জন্য বর্তমানে যত ধরনের অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয় তার সবগুলো বন্ধ করা গেলে ডামি ক্যান্ডিডেটের বিড়ম্বনা থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্ত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাচন মৌসুমে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অন্যসময়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে কমিশন নিজের শক্তি ব্যয় করলে এবং সরকার যদি আন্তরিক থাকেন তাহলে একটা সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা দেখার আকাক্সক্ষা আমাদের প্রবল। এইজন্য এই জাতি অতীতে বহুবার রক্ত ঝড়িয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবেশ আসেনি। তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় যতখানি ভাল করা যায় তার কিছুটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। এখন সেই সম্ভাবনায় ছেদ পড়েছে বলেই অন্তত বিশেষজ্ঞদের কথাবার্তা থেকে আঁচ পাওয়া যায়। আর চোখের দেখা দৃষ্টান্ত তো সকলেরই রয়েছে। কিন্তু মানুষের আকাক্সক্ষা একই জায়গায় স্থির এখনও। আমাদের সকলের প্রয়াস সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষপানেই হওয়া উচিত।