অবাধে নিধন পোনা মাছ

ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে হাওর, খাল-বিলে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে নতুন পানি। আর এই পানিতে মাছ ধরছেন জেলেরা। বিরামহীন ভাবে মাছ ধরতে হাওরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা। উপজেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে হাওরে আসছেন মাছ ধরতে। শিশু, কিশোর থেকে বৃদ্ধ বয়সী সবাই মাছ ধরতে ব্যস্ত।
কেউ মাছ ধরছেন জীবিকার তাগিদে, কেউ বা শখের বশে। প্রতিদিনই তাদের জালে ধরা পড়ছে বিভিন্ন ধরনের মাছ। ঝাকিজাল, ঠেলাজাল দিয়ে মাছ মারছেন তারা। আবার কেউ পাটি বাঁধ ও চাইয়ের মাধ্যমেও মাছ ধরছেন। ট্যাংরা, চিকরা, পুঁটি, বাতাসী মাছই বেশী ধরা পড়ছে। অনেকে দিনের বেলায় আবার কেউ রাতের বেলায় আঁধারে টর্চলাইট দিয়ে তেকাটা, কোচা দিয়ে বড় মাছ শিকার করছেন। রাতের বেলায় ধরা পড়ছে বোয়াল, শোল, গজার মাছ।
হাওরে নতুন পানির আগমন যেন আনন্দ নিয়ে এসেছে মাছ শিকারীদের চোখে, মুখে। হাওর ঘুরে দেখা যায়,-খাল বিলের পাশাপাশি কৃষি জমি থেকেও উঠে আসছে বিভিন্ন জাতের ছোট ছোট মাছ এবং মাছের পোনা। কিছুদিন পরই এই পোনাগুলো বড় হতো। এরই মাঝে এক শ্রেণির শিকারী মশারী জাল, বেড় জাল দিয়ে অবাধে পোনা মাছ মারছে। আবার সেগুলো প্রকাশ্যে বাজারে বিক্রি করছে। জেলেরা জানান, জীবিকার তাগিদে বিকল্প কোন উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই এসব মাছ মারছেন তারা।
মফিজনগর গ্রামের আবুল মিয়া বলেন, ‘মেঘের সময় বেশী মাছ ধরা পড়ে। ঠান্ডা পড়লে বজ্রপাতে মাছ সড়কের ধারে আইয়া পড়ে। তখন জালডা ফাতাইলেই আর মিস নাই। ভালা কইরা কয়েকটা খেউ দিলেই অয়।’
বজ্রপাতের সময় হাওরে মাছ মারতে ভয় হয় না. জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মরনের ভয় করলে কি আর মাছ মারন যাইবো। মাছ মারার শখ থাকলে মরনের চিন্তা করলে অইতনায়।’
আবুরহাটি গ্রামের পাশে নয়াহালট, চানপুর ব্রীজের নিচে একটি খালের মুখে পাটি বাঁধ দিয়েছেন দিন ইসলাম ও তার সহযোগী। এই বাঁধে পাঁচটি চাই পেতেছেন তিনি। দিন ইসলাম বললেন, ‘প্রতিদিন ভালো মাছ পড়তেছে চাইয়ে। তবে মাছের আকার ছোট। গত বছরের চেয়ে এবার মাছ অনেক কম। বৃষ্টি অইলে বেশী মাছ চাইয়ে লাগে।’
শখের বসে মাছ মারতে আসা স্কুল ছাত্র তামিম জানায়, ঠেলা জালি দিয়ে প্রায় ১ কেজির মতো ছোট মাছ পেয়েছে। মাছ ধরতে পেরে অনেক খুশী সে।
রাজাপুর গ্রামের জেলে মাসুক মিয়া বলেন, আমরা ছোট থাকতে এমন সময় এক ঘন্টা মাছ মারলে টুকরি ভইরা যাইতো। অনেকে মাথায় কইরা মাছ নিত। আর অহন সারা দিন ঘুইরা ১ কেজি মাছ অয় না। আমরা ছোড বেলায় যে মাছ দেখছি, তার ১০০ ভাগের ১ভাগও মাছ পাওয়া যায় না। আমরার কপাল আমরাই নষ্ট করছি।
তিনি বলেন, ‘মাছ কমনের কারণ অইছে ডিম ছাড়নের টাইমে মাইনষে মাছ মাইরালায়। আবার ভীম জাল নামে একটা জাল আছে, হেইডা দিয়া ¯্রােতের মধ্যে ধইরা সব মাছ মাইরালায়। এর লাইগা মাছ কইম্মা যাইতাছে।’
জামালগঞ্জ উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি হলে হাওরের মাছগুলো জমিতে উঠে বদ্ধ পানিতে ডিম ছাড়ে। আর এই সময় ডিমওয়ালা মাছগুলো ধরে ফেলার কারণে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। আমরা প্রতিটি হাটে বাজারে মাইকিং সহ বিভিন্ন ভাবে প্রচারের মাধ্যমে জেলেদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। কিছুদিন যদি জেলেরা এই পোনাগুলো না ধরতো তাহলে তাদেরই লাভ হতো। বেশীর ভাগ জেলে গরীব হওয়ায় তারা একদিনও বসে থাকতে পারে না। তবে কারেন্ট জাল, ভাসা জাল, বেড়জাল, ব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় এনে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।